১৯৮০ সালে ভারত চীনের চেয়ে ধনী ছিল। ২০২৫ সালে এসে চীন মাথাপিছু আয়ে ভারতের প্রায় পাঁচ গুণ এগিয়ে। চার দশকে এমন নাটকীয় উল্টো চিত্র কীভাবে তৈরি হলো? এই প্রশ্ন শুধু দুই দেশের তুলনা নয়; এটি উন্নয়নের প্রকৃতি নিয়ে এক মৌলিক প্রশ্ন। একই সময়ে বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়া দুটি দরিদ্র দেশ কেন এত ভিন্ন ফল পেল?
১৯৮০ সালে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি ছিল প্রায় ২৭০ ডলার, আর চীনের ছিল প্রায় ১৯৫ ডলার। অর্থাৎ ভারত তখন প্রায় ২৭ শতাংশ এগিয়ে ছিল। দুই দেশই দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ও অন্তর্মুখী অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে বৈশ্বিক বাজারে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানকেন্দ্রিক বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন ছিল তাদের অভিন্ন লক্ষ্য। কিন্তু পথ ছিল আলাদা। ভারতের দৃশ্যমান সুবিধা ছিল ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা ও শিক্ষিত মানবসম্পদ। ১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক সংস্কারের পর ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি ও সফটওয়্যার খাত দ্রুত বিস্তার লাভ করে। ১৯৯০ সালে সফটওয়্যার রপ্তানি ছিল মাত্র ১৩১ মিলিয়ন ডলার; ২০০১–০২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৭.৮ বিলিয়ন ডলারে। আউটসোর্সিং, সফটওয়্যার উন্নয়ন ও ব্যবসা প্রক্রিয়া সেবায় ভারত দ্রুত হয়ে ওঠে জ্ঞাননির্ভর সেবার বৈশ্বিক কেন্দ্র। অনেকেই তখন মনে করেছিলেন, ভবিষ্যৎ ভারতের। কারণ ভারত রপ্তানি করছে উচ্চমূল্যের দক্ষ সেবা, আর চীন করছে শ্রমনির্ভর উৎপাদন—খেলনা, পোশাক, ইলেকট্রনিক্স, যন্ত্রাংশ।
কিন্তু বাস্তবতা অন্য গল্প বলেছে। ২০২৫ সালে এসে চীনের মাথাপিছু আয় প্রায় ১৩,৮০০ ডলার, আর ভারতের প্রায় ২,৮০০ ডলার। অর্থাৎ চীন প্রায় পাঁচ গুণ এগিয়ে। এই পার্থক্যের কারণ সেবা বনাম উৎপাদন নয়; বরং মূল্য সৃষ্টির ধরন। প্রথম পর্যায়ে দুই দেশই শ্রমঘণ্টা বিক্রি করছিল। ভারত বিক্রি করছিল প্রকৌশলী, প্রোগ্রামার ও সেবা পেশাজীবীদের সময়—ঘণ্টাভিত্তিক বিলিংয়ের মাধ্যমে। চীন বিক্রি করছিল কারখানার শ্রমিকদের সময়- উৎপাদন লাইনে কাজের মাধ্যমে। ভারতীয় শ্রমঘণ্টার দাম বেশি ছিল, কিন্তু সময়ের একটি সীমা আছে। দিনে ২৪ ঘণ্টার বেশি কাজ করা যায় না। সময়কে বহুগুণে বাড়ানো যায় না।
চীন এখানেই পথ বদলায়। তারা শ্রম বিক্রিতে থেমে থাকেনি। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য উৎপাদন করতে করতে তারা প্রযুক্তি অনুকরণ করেছে, পরিবর্তন করেছে, উন্নত করেছে। উৎপাদনকে তারা কর্মসংস্থান নয়, শেখার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখেছে। কারখানা হয়ে উঠেছে পরীক্ষাগার। বিদেশি প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা নিজস্ব প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করেছে, অটোমেশন ও উৎপাদন দক্ষতায় বিনিয়োগ করেছে। ধীরে ধীরে তারা মূল্যশৃঙ্খলে উপরে উঠেছে। আজ বৈদ্যুতিক যান, ব্যাটারি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তিতে চীন নেতৃত্বের দাবিদার। এখানে কেবল সংযোজন নয়; রয়েছে নকশা, প্রকৌশল, সফটওয়্যার ও সরবরাহব্যবস্থার সমন্বিত উদ্ভাবন। অর্থাৎ চীন এখন ঘণ্টা নয়, ধারণা বেচছে।
ভারত, বিপরীতে, সেবা রপ্তানিতে সাফল্য পেলেও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় আটকে গেছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাত বৈদেশিক মুদ্রা এনেছে, আন্তর্জাতিক সুনাম অর্জন করেছে। কিন্তু এই সাফল্য বড় পরিসরে শিল্পভিত্তিক সক্ষমতা বা পণ্য উদ্ভাবনে একইভাবে বিস্তার ঘটাতে পারেনি। শ্রমঘণ্টাভিত্তিক সেবা মডেলের একটি স্বাভাবিক সীমা রয়েছে—দক্ষ শ্রমশক্তির প্রাপ্যতা ও মজুরির ওপর তা নির্ভরশীল। ফলে উচ্চমূল্যের সেবা থাকা সত্ত্বেও বিস্তৃত অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতায় তার প্রভাব সীমিত থাকে।
এখানে মূল শিক্ষা স্পষ্ট: সেবা ভালো না উৎপাদন ভালো—এ প্রশ্ন আসল নয়। আসল প্রশ্ন হলো, আপনি সময় বিক্রি করছেন, নাকি ধারণা তৈরি করছেন। সময় বিক্রি স্কেল করা যায় না। ধারণা স্কেল করা যায়। একটি উদ্ভাবিত পণ্য বা প্রক্রিয়া বারবার ব্যবহার করা যায়, বহুগুণে বাড়ানো যায়, বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। সেখানেই বড় সম্পদ সৃষ্টি হয়। চীনের সাফল্য এসেছে শ্রম থেকে ধারণায় উত্তরণ, অনুকরণ থেকে উদ্ভাবন, উৎপাদন থেকে পুনঃআবিষ্কারে রূপান্তরের মাধ্যমে। তারা বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, কিন্তু সংযোগকে ব্যবহার করেছে শেখার সুযোগ হিসেবে।
এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্যও গভীর শিক্ষা বহন করে। বাংলাদেশ আজ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ। তৈরি পোশাকশিল্প আমাদের রপ্তানির প্রধান চালিকাশক্তি। আমরা বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলে যুক্ত হয়েছি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছি, দারিদ্র্য কমিয়েছি। কিন্তু আমরা কি শ্রমঘণ্টা বিক্রির পর্যায়ে আটকে আছি? স্বল্প মজুরিভিত্তিক উৎপাদন আমাদের এগিয়ে দিয়েছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি যথেষ্ট নয়। মজুরি বাড়লে প্রতিযোগিতা কমে, বাজার সরে যেতে পারে। তাই বাংলাদেশকে দ্বিতীয় ধাপে যেতে হবে—অনুকরণ থেকে উন্নয়ন, উন্নয়ন থেকে উদ্ভাবনে। তৈরি পোশাক খাতে নিজস্ব নকশা, নিজস্ব ব্র্যান্ড ও নিজস্ব প্রযুক্তি উন্নয়ন জরুরি। শুধু অন্যের ব্র্যান্ডের জন্য উৎপাদন করলে সীমা থাকবে। একইভাবে ওষুধশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, হালকা প্রকৌশল ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ—সব খাতেই ধারণানির্ভর মূল্য সংযোজন বাড়াতে হবে।
উৎপাদনকে কেবল কর্মসংস্থানের উৎস নয়, শেখার ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানার মধ্যে বাস্তব সংযোগ তৈরি করতে হবে। প্রযুক্তি আত্মস্থ ও উন্নত করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের গবেষণা ও উদ্ভাবনে উৎসাহ দিতে হবে। উন্নয়নকে কেবল জিডিপি বৃদ্ধির হিসাব নয়, সক্ষমতা বৃদ্ধির ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে হবে।
ভারত ও চীনের অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়- বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে সংযোগ শুরু, শেষ নয়। আসল প্রশ্ন হলো, সেই সংযোগকে আমরা কীভাবে ব্যবহার করছি। সময় বিক্রি করলে আয় হয়; ধারণা তৈরি করলে সম্পদ গড়ে ওঠে। বাংলাদেশের সামনে এখন সেই রূপান্তরের সময়।
লেখক :
স্থপতি
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!