স্বাস্থ্যসেবা, আইডিএ
জরুরি স্বাস্থ্যসেবা জোরদারের প্রকল্পে কেন পরামর্শক, প্রশিক্ষণ, সেমিনার, সার্ভে ও ভ্রমণেই এত বড় অংশ ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে?   ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে মহামারি–পরবর্তী বাস্তবতায় সক্ষমতা বাড়ানো নিঃসন্দেহে জরুরি। সেই লক্ষ্যেই ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইডিএ) ঋণ সহায়তায় ‘স্ট্রেনদেনিং হেলথ ইমার্জেন্সি প্রিভেনশন, প্রিপেয়ার্ডনেস, রেসপন্স অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স উইথ ওয়ান হেলথ অ্যাপ্রোচ’ শীর্ষক একটি প্রকল্প নিতে যাচ্ছে সরকার। মোট প্রস্তাবিত ব্যয় ২ হাজার ৯২৯ কোটি টাকা, যার মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা ঋণ দেবে বিশ্ব ব্যাংকের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান আইডিএ।

কিন্তু প্রকল্পের ব্যয়ের খাত বিশ্লেষণ করলে প্রশ্ন জাগে—জরুরি স্বাস্থ্যসেবা জোরদারের প্রকল্পে কেন পরামর্শক, প্রশিক্ষণ, সেমিনার, সার্ভে ও ভ্রমণেই এত বড় অংশ ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে?

প্রস্তাবিত প্রকল্পের ব্যয়ের খাত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিভিন্ন আনুষঙ্গিক খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। প্রকল্পে পরামর্শক খাতে ৩২২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে, যা মোট ব্যয়ের প্রায় ১১ শতাংশ। প্রশিক্ষণ খাতে প্রস্তাব করা হয়েছে ৩৯৭ কোটি ৫ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের ১৩ শতাংশের সমান।

এ ছাড়া সেমিনার ও ওয়ার্কশপ বাবদ ১২৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা (৪ দশমিক ২ শতাংশ) ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে। যানবাহন ভাড়া খাতে ৪০ কোটি টাকা এবং ভ্রমণ ব্যয় হিসেবে ১২০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এসব খাতে ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা চলছে।

অন্যদিকে ল্যাবরেটরি ইকুইপমেন্টে ২৬০ কোটি এবং ওষুধ ও ভ্যাকসিনে ১২৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। অর্থাৎ জরুরি সেবার বাস্তব অবকাঠামো ও সরঞ্জামের তুলনায় ‘সফট কম্পোনেন্ট’ বা ব্যবস্থাপনাগত খাতের অংশ তুলনামূলক বেশি।

পরিকল্পনা কমিশনের আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগ ইতোমধ্যে এসব খাতের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে ‘ওয়ান হেলথ অ্যাপ্রোচ’ বাস্তবায়নে পরামর্শক ও প্রশিক্ষণ ব্যয় কীভাবে সরাসরি দৃশ্যমান ফল দেবে—তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

আইডিএ ঋণ সাধারণত কম সুদে দেওয়া হয়—সার্ভিস চার্জ প্রায় ০.৭৫ শতাংশ, সুদ ১.২৫ শতাংশ, মোট প্রায় ২ শতাংশ। পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ড ও ৩০ বছর পরিশোধকাল সুবিধাজনক। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রস্তাবে সুদের হার ৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর আলোচনা প্রকল্প ব্যয়ের প্রকৃত চাপ বাড়াতে পারে। ঋণের অর্থ উত্তোলনে বিলম্ব হলেও ০.৫০ শতাংশ কমিটমেন্ট ফি দিতে হয়।

অর্থাৎ প্রকল্পের কার্যকারিতা যদি প্রত্যাশিত ফল না দেয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক দায় জনগণের কাঁধেই পড়বে।

‘ওয়ান হেলথ’ ধারণা: কাগজে শক্তিশালী, মাঠে কতটা?

ওয়ান হেলথ অ্যাপ্রোচের মূল দর্শন—মানব, প্রাণী ও পরিবেশগত স্বাস্থ্যের সমন্বিত নজরদারি। কোভিড-১৯–এর মতো জুনোটিক সংক্রমণের অভিজ্ঞতায় এটি সময়োপযোগী ধারণা। প্রকল্পে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও বন বিভাগের সমন্বয়ে ল্যাবরেটরি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে প্রশ্ন হলো, প্রস্তাবিত বিপুল প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও বিদেশ ভ্রমণ ব্যয় এই সমন্বিত কাঠামোকে কতটা বাস্তবায়নযোগ্য করবে? অতীতে বহু প্রকল্পে দেখা গেছে, পরামর্শক-নির্ভর কাঠামো কাগজে উন্নত হলেও মাঠপর্যায়ে প্রভাব সীমিত থেকেছে।

বাংলাদেশে উন্নয়ন প্রকল্পে একটি প্রচলিত প্রবণতা হলো—মূল অবকাঠামো বা সেবার চেয়ে ব্যবস্থাপনা, পরামর্শক ও প্রশিক্ষণ খাতে বড় অঙ্ক বরাদ্দ। এতে স্বল্পমেয়াদি দক্ষতা বৃদ্ধি ঘটলেও দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার হয় না।

যদি প্রকল্পের বড় অংশ পিএমইউ (প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট ইউনিট)–কেন্দ্রিক হয়, তবে প্রকল্প শেষ হলে সেই সক্ষমতা টেকসই থাকবে কি না—সেটিই মূল প্রশ্ন। স্বাস্থ্য জরুরি সেবায় স্থায়ী উন্নয়ন চাইলে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ল্যাব, জনবল ও সরঞ্জাম শক্তিশালী করা জরুরি।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা: প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন

প্রস্তাবিত প্রকল্পটি নিয়ে পরিকল্পনা কমিশন সমীক্ষা প্রতিবেদন, তুলনামূলক বিশ্লেষণ এবং আঞ্চলিক অভিজ্ঞতার তথ্য চেয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, উন্নয়ন ঋণ কেবল অর্থের বিষয় নয়; এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন জড়িত। তাই প্রকল্প অনুমোদনের আগে ব্যয়ের যৌক্তিকতা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

কমিশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, পরামর্শক ও প্রশিক্ষণ খাতে বিপুল ব্যয়ের বিপরীতে কী ধরনের সুনির্দিষ্ট আউটপুট পাওয়া যাবে, তা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করতে হবে। একই সঙ্গে চার বছর মেয়াদি প্রকল্প শেষে কী পরিমাপযোগ্য ফলাফল অর্জিত হবে, তারও স্পষ্ট রূপরেখা চাওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নের পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব সক্ষমতা কতটা বৃদ্ধি পাবে এবং ব্যয়ের তুলনায় জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কী ধরনের প্রত্যক্ষ সুফল মিলবে—এসব বিষয়েও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাবের ভিত্তিতেই প্রকল্পের পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

জরুরি স্বাস্থ্য সেবার এই প্রস্তুতি জোরদার করা সময়ের দাবি। কিন্তু উন্নয়ন প্রকল্পে ‘খরচের আকার’ নয়, ‘ফলাফলের মান’ই হওয়া উচিত মূল সূচক। পরামর্শক ও সেমিনার–কেন্দ্রিক ব্যয়ের পরিবর্তে যদি ল্যাব সক্ষমতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সেবা পৌঁছানোর কাঠামো শক্তিশালী করা যায়, তবেই প্রকল্পটি টেকসই হবে।

অন্যথায়, কয়েক বছর পর আরেকটি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে হয়তো দেখা যাবে—অসংখ্য কর্মশালা হয়েছে, প্রতিবেদন লেখা হয়েছে, বিদেশ সফর হয়েছে; কিন্তু জরুরি স্বাস্থ্যসেবার বাস্তব চিত্রে পরিবর্তন সীমিত। উন্নয়ন তখন কাগজে থাকবে, মাঠে নয়।