দুই দেশের সীমান্তে সংঘাত বৃদ্ধির মধ্যেই আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল ও অন্যান্য শহরে বিমান হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। শুক্রবার পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ জানান, আফগানিস্তানের তালেবান কর্তৃপক্ষের ওপর ইসলামাবাদের ধৈর্য শেষ হয়ে গেছে। তিনি ঘোষণা দেন যে, দুই দেশ এখন "প্রকাশ্য যুদ্ধে" লিপ্ত।
এদিকে তালেবান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ এক বিবৃতিতে জানান যে, আফগানিস্তান দুই দেশের সীমানা নির্ধারণকারী ডুরান্ড লাইন বরাবর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে "বড় আকারের আক্রমণাত্মক অভিযান" চালাচ্ছে। এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পরেই পাকিস্তানের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা আসে।
সীমান্তে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা লড়াইয়ের ধারাবাহিকতায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। উভয় পক্ষই দাবি করছে যে, এই সংঘাতে ডজনখানেক মানুষ নিহত হয়েছে। ২০২১ সালে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ফিরে আসার পর থেকেই পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। বর্তমান সংঘাত সেই উত্তেজনারই বহিঃপ্রকাশ।
কি ঘটেছে?
শুক্রবার পাকিস্তানি কর্মকর্তারা জানান, আফগান বাহিনী সীমান্তের কাছে পাকিস্তানি সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এর জবাবে ইসলামাবাদ আফগানিস্তানের ভেতরে, রাজধানী কাবুলসহ অন্যান্য শহরে বিমান হামলা শুরু করে। আল জাজিরার প্রতিনিধি নাসের শাদিদ জানান, স্থানীয় সময় শুক্রবার রাত ১টা ৫০ মিনিটে (বৃহস্পতিবার ২১:২০ জিএমটি) পাকিস্তান প্রথম হামলা চালায়। আফগান বাহিনী বিমানভাণ্ডি ফায়ার দিয়ে এর জবাব দেয়। সামাজিক মাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ লেখেন, "আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। এখন আমাদের এবং তোমাদের মধ্যে প্রকাশ্য যুদ্ধ।"
আফগানিস্তানের কোন কোন এলাকায় পাকিস্তান হামলা চালিয়েছে?
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার এক্সে লিখেছেন, কাবুল, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় পাক্তিয়া প্রদেশ এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় কান্দাহারে "আফগান তালেবানের প্রতিরক্ষা লক্ষ্যবস্তুগুলোতে" আঘাত হানা হয়েছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ একে তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে "প্রকাশ্য যুদ্ধ" হিসেবে অভিহিত করেছেন।
আফগান সরকারের মুখপাত্র মুজাহিদও এক্সে এক পোস্টে এই তিনটি প্রদেশে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাকিস্তানের দুই জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তার বরাতে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, হামলায় আফগানিস্তানের দুটি ব্রিগেড ঘাঁটি ধ্বংস হয়েছে।
পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম পাকিস্তান টিভি দাবি করেছে, তাদের বাহিনী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তালেবানের বেশ কিছু অবস্থান "ধ্বংস" করে দিয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আফগানিস্তানে হামলার লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে ছিল কান্দাহারে তালেবানের একটি ব্রিগেড সদর দপ্তর ও অস্ত্রাগার এবং ওয়ালি খান সেক্টর, শাওয়াল সেক্টরের কাছে, বাজৌর সেক্টর ও আঙ্গুর আড্ডায় তালেবানের বিভিন্ন পোস্ট।
পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের চিত্রাল, খাইবার, মোহমান্দ, কুররাম এবং বাজৌর জেলার বিভিন্ন স্থানেও আফগান তালেবান বাহিনীকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। শুক্রবার দিনের শেষভাগে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ তোরখাম সীমান্ত ক্রসিংয়ের কাছে গোলাগুলি ও গোলাবর্ষণের খবর পাওয়া যায়। আল জাজিরার কামাল হায়দার এবং এএফপি জানিয়েছে, সকালে ক্রসিংয়ের কাছে গোলার শব্দ শোনা গেছে।
এএফপি আরও জানিয়েছে, আফগান সেনারা সীমান্তের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। অক্টোবরে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে লড়াইয়ের পর থেকে স্থল সীমান্ত মূলত বন্ধ থাকলেও, পাকিস্তান থেকে দলে দলে ফিরে আসা আফগানদের জন্য তোরখাম ক্রসিংটি খোলা রয়েছে।
হতাহতের খবর কী?
উভয় পক্ষের দেওয়া তথ্যে গড়মিল রয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র মোশাররফ জাইদি শুক্রবার সকালে এক্সে লেখেন, সকালের হামলায় ১৩৩ জন আফগান তালেবান সেনা নিহত এবং ২০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, ২৭টি আফগান তালেবান পোস্ট ধ্বংস করা হয়েছে এবং ৯টি দখল করা হয়েছে। এছাড়াও ৮০টিরও বেশি "ট্যাংক, আর্টিলারি এবং সশস্ত্র যান ধ্বংস করা হয়েছে"।
পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম ডন জানিয়েছে, চলমান সংঘর্ষে দুজন পাকিস্তানি সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। আল জাজিরা স্বাধীনভাবে পাকিস্তানের দেওয়া হতাহতের সংখ্যা যাচাই করতে পারেনি। তবে তালেবান সরকার জানিয়েছে, তাদের মাত্র ৮ জন যোদ্ধা নিহত এবং ১১ জন আহত হয়েছে।
আফগানিস্তান জানিয়েছে, রোববার আফগান সীমান্তে পাকিস্তানের বিমান হামলার প্রতিশোধ হিসেবে শুক্রবার ভোরে তাদের সেনাবাহিনী সীমান্তে পাকিস্তানি সামরিক ঘাঁটি ও আউটপোস্টে হামলা চালায়। তাদের দাবি, এতে ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছে এবং দুটি সামরিক ঘাঁটি ও ১৯টি সামরিক পোস্ট দখল করা হয়েছে। পাকিস্তান এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
অন্যদিকে পাকিস্তান দাবি করেছে, গত রোববারের বিমান হামলায় অন্তত ৭০ জন বিচ্ছিন্নতাবাদী নিহত হয়েছে। তবে তালেবান মুখপাত্র মুজাহিদ এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে এক্সে লিখেছেন, ওই হামলায় নারী ও শিশুসহ ডজনখানেক মানুষ হতাহত হয়েছে। আফগান রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির নানগারহার প্রদেশের পরিচালক মৌলভি ফজল রহমান ফাইয়াজ জানান, রোববারের হামলায় ১৮ জন নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে।
আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই বলেছেন, দেশটি "যেকোনো পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ ঐক্যের সাথে তাদের প্রিয় মাতৃভূমি রক্ষা করবে এবং সাহসের সাথে আগ্রাসনের জবাব দেবে।" এক্সে এক পোস্টে তিনি লেখেন, "পাকিস্তান সহিংসতা ও বোমা হামলা—যা তাদের নিজেদেরই সৃষ্টি—থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারবে না। বরং তাদের উচিত নিজেদের নীতি পরিবর্তন করা এবং আফগানিস্তানের সঙ্গে সুসম্পর্ক, শ্রদ্ধা ও সভ্য আচরণের পথ বেছে নেওয়া।"
কেন লড়ছে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান?
দুই দেশের মধ্যে বর্তমান সংঘাত কয়েক মাসের উত্তেজনার চরম পরিণতি। ২০২৫ সালের অক্টোবরে সীমান্তে এক সপ্তাহব্যাপী মারাত্মক সংঘর্ষের পর কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় দুই দেশ তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে ২,৬১১ কিলোমিটার (১,৬২২ মাইল) দীর্ঘ সীমান্তটি 'ডুরান্ড লাইন' নামে পরিচিত। আফগানিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে এই সীমান্তকে স্বীকৃতি দেয় না। তাদের যুক্তি, এটি একটি ঔপনিবেশিক সীমানা যা অবৈধভাবে পশতু অধ্যুষিত এলাকাকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে।
২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর থেকে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে প্রায়ই সংঘর্ষ হচ্ছে। দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার নিরাপত্তা বিশ্লেষক সামি ওমারি আল জাজিরাকে জানান, ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনী প্রত্যাহারের পর থেকে এখন পর্যন্ত আফগান ও পাকিস্তানি বাহিনীর মধ্যে ৭৫ বার সংঘর্ষ হয়েছে।
পাকিস্তান মূলত চায়, আফগানিস্তান যেন পাকিস্তান তালেবান বা টিটিপি (TTP)-র মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে। পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগানিস্তান টিটিপিকে আশ্রয় দিচ্ছে। ২০০৭ সালে পাকিস্তানে টিটিপির উত্থান হয়। তারা আফগান তালেবান থেকে আলাদা হলেও দুই গোষ্ঠীর মধ্যে গভীর আদর্শিক, সামাজিক ও ভাষাগত সম্পর্ক রয়েছে।
সম্প্রতি পাকিস্তানে টিটিপি এবং বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (BLA)-র সশস্ত্র হামলা বেড়েছে। আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী খাইবার পfখতুনখোয়া এবং বেলুচিস্তান প্রদেশ এই সহিংসতার সবচেয়ে বড় শিকার। শুক্রবার পাকিস্তানের সাবেক অর্থমন্ত্রী মিফতাহ ইসমাইল বলেন, "আফগানিস্তানের গর্বিত ও দরিদ্র নাগরিকদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের কোনো ক্ষোভ নেই।" তিনি এক্সে লেখেন, "কিন্তু তালেবানই (আফগান ও পাকিস্তান) পাকিস্তানকে এই সংঘাতে বাধ্য করেছে।"
বিশ্লেষকরা মনে করেন, আফগানিস্তান সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনা কম। যুক্তরাষ্ট্রের 'আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটা' (ACLED)-এর দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক পার্ল পান্ডিয়া আল জাজিরাকে বলেন, "আফগান তালেবান টিটিপিকে কঠোরভাবে দমন করতে অনিচ্ছুক। এর কারণ তাদের মধ্যকার পূর্বের সখ্য এবং টিটিপি যোদ্ধাদের তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রভিন্স (ISKP)-এ যোগ দেওয়ার ভয়।"
পান্ডিয়া সতর্ক করেন, আফগান তালেবান যদি টিটিপিকে দমন না করে তবে বড় ধরনের সংঘাত "অনিবার্য"। ওয়াশিংটন ডিসির স্টিমসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া কর্মসূচির পরিচালক এলিজাবেথ থ্রেলকেল্ড আল জাজিরাকে বলেন, সাম্প্রতিক সংঘর্ষ অবাক করার মতো কিছু নয়, কারণ এটি কয়েক মাসের উত্তেজনার ফল। তবে পাকিস্তানের "আরও আক্রমণাত্মক ও ধ্বংসাত্মক হামলা" কৌশলে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
দুই দেশের মধ্যে সশস্ত্র যুদ্ধ আফগানিস্তানের জন্য সুবিধাজনক হবে না, কারণ পাকিস্তানের মুখোমুখি হওয়ার মতো পর্যাপ্ত সামরিক সরঞ্জাম তাদের নেই। সিঙ্গাপুরের এস রাজারত্নম স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক আব্দুল বাসিত আল জাজিরাকে বলেন, "আফগান তালেবানের পাকিস্তানের মতো প্রথাগত সেনাবাহিনী নেই, তাই তারা অপ্রচলিত হামলার পদ্ধতি ব্যবহার করছে। তাদের কাছে আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী এবং কামিকাজে ড্রোন রয়েছে, যা তারা ব্যাপকভাবে ব্যবহার করবে বলে আমার ধারণা।"
আল জাজিরার কামাল হায়দার জানান, "আফগানদের বিমান বাহিনী নেই, তাই আন্তঃসীমান্ত হামলায় পাকিস্তান সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তারা কাবুল, কান্দাহার এবং অন্যান্য জায়গায় হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, মূল লক্ষ্যবস্তু হলো অস্ত্রাগার এবং সামরিক অবকাঠামো।"
বিশ্বের প্রতিক্রিয়া কী?
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, "ভারত আফগান ভূখণ্ডে পাকিস্তানের বিমান হামলার তীব্র নিন্দা জানায়, যার ফলে পবিত্র রমজান মাসে নারী ও শিশুসহ বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়েছে।" তিনি আরও বলেন, "এটি পাকিস্তানের নিজেদের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা ঢাকার আরেকটি প্রচেষ্টা।"
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস উভয় পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে আলোচনার মাধ্যমে এবং প্রতিবেশীসুলভ আচরণের মধ্য দিয়ে মতপার্থক্য সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি এক্সে লেখেন, "পবিত্র রমজান মাসে... আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের উচিত প্রতিবেশীসুলভ কাঠামোর মধ্যে এবং আলোচনার মাধ্যমে তাদের বিদ্যমান মতপার্থক্য নিরসন করা।"
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবদমান পক্ষগুলোকে অবিলম্বে সীমান্ত হামলা বন্ধ করে কূটনৈতিক উপায়ে মতপার্থক্য সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে এবং প্রয়োজনে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দিয়েছে।
সূত্র : আল জাজিরা
আরটিএনএন/এআই
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!