শিশু, স্ক্রিন
মোবাইলে মজে আছে ছোট ছোট শিশুরা।   ছবি: সংগৃহীত

আজকের পৃথিবীতে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে আমরা বেঁচে আছি। একদিকে আমরা চাই আমাদের সন্তানরা সুস্থ, স্বাভাবিক ও আনন্দময় শৈশব কাটাক—মাঠে দৌড়াক, বইয়ের পাতায় ডুবে থাকুক, বন্ধুদের সঙ্গে খেলায় মেতে উঠুক। অন্যদিকে আমাদের নিজেদের জীবন এমনভাবে প্রযুক্তির সঙ্গে জড়িয়ে গেছে যে আমরা নিজেরাই স্ক্রিনের জগৎ থেকে বেরিয়ে আসতে পারি না। এই দ্বৈত অবস্থান থেকেই শুরু হয় আমাদের সন্তানের সঙ্গে সম্পর্কের এক নিঃশব্দ সংকট।

আমরা প্রায়ই বলি—“বাচ্চারা যেন মোবাইল না ধরে।” কিন্তু বাস্তবতা হলো, ঘরের ভেতরে বসেই তারা প্রতিদিন দেখে বাবা-মা ঘন্টার পর ঘন্টা ফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখছেন। কথোপকথনের সময়ও আমরা বারবার ফোনে ফিরে যাই, পারিবারিক সময়ের মধ্যেও নোটিফিকেশনের টানে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। শিশুরা খুব সূক্ষ্মভাবে শেখে; তারা আমাদের বলা কথা নয়, বরং দেখা আচরণ অনুসরণ করে। ফলে মোবাইলের প্রতি তাদের আকর্ষণ তৈরি হয় নিষেধাজ্ঞা ভাঙার ইচ্ছা থেকে নয়, বরং আমাদের জীবনযাপনের প্রতিচ্ছবি হিসেবে।

একইভাবে সোশ্যাল মিডিয়াকে ঘিরে আমাদের উদ্বেগও একধরনের দ্বিধা তৈরি করে। আমরা বলি—১৮ বছরের আগে শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়ায় থাকা উচিত নয়। সত্যিই কি এই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবসম্মত? প্রযুক্তি এখন এমন এক বাস্তবতা, যা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। শিশুদের সামনে এই জগৎ প্রতিনিয়ত উপস্থিত—স্কুলের পড়াশোনা, বন্ধুদের যোগাযোগ, এমনকি বিনোদনের মাধ্যমেও। তাই প্রশ্নটি নিষেধের নয়, বরং দিকনির্দেশনার। যদি আমরা তাদের সঠিক ব্যবহার শেখাতে না পারি, তবে তারা অজানার মধ্যে নিজেরাই পথ খুঁজতে গিয়ে ভুল পথে চলে যেতে পারে।

প্রযুক্তি নিয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো—এটি হয় সম্পূর্ণ ভালো, নয়তো সম্পূর্ণ খারাপ। অথচ প্রযুক্তি নিজে নিরপেক্ষ; এর প্রভাব নির্ভর করে আমরা কীভাবে তা ব্যবহার করি। এই প্রযুক্তিই আজ পৃথিবীর অগ্রযাত্রার অন্যতম চালিকাশক্তি। শিক্ষা, চিকিৎসা, গবেষণা, যোগাযোগ—সবক্ষেত্রেই প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। শিশুদের ভবিষ্যৎও এই প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই তাদের প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখার চেষ্টা নয়, বরং প্রযুক্তিকে সৃজনশীল ও মানবিক কাজে ব্যবহারের দক্ষতা শেখানোই আমাদের দায়িত্ব।

একজন শিশুর জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা আসে পরিবার থেকে। যদি আমরা নিজেরাই স্ক্রিনের বাইরে এসে তাদের সঙ্গে সময় কাটাই, বই পড়ি, গল্প করি, খেলি—তবে প্রযুক্তির ব্যবহার স্বাভাবিকভাবেই একটি ভারসাম্যের মধ্যে আসবে। শিশুকে বোঝাতে হবে, প্রযুক্তি কোনো বিকল্প জীবন নয়; এটি জীবনের একটি সহায়ক মাধ্যম মাত্র। সোশ্যাল মিডিয়া হতে পারে জ্ঞান ও সৃজনশীলতার ক্ষেত্র, যদি সেখানে সচেতনতা ও নৈতিকতার আলো থাকে।

আজকের চ্যালেঞ্জ তাই প্রযুক্তিকে অস্বীকার করা নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে তাকে যুক্ত করা। আমাদের সন্তানদের এমনভাবে বড় করে তুলতে হবে, যাতে তারা স্ক্রিনের ভেতর নয়, বাস্তব পৃথিবীতেই নিজের পরিচয় খুঁজে পায়। প্রযুক্তি তাদের সহায়ক হবে, নিয়ন্ত্রক নয়। এই ভারসাম্য গড়ে তোলার দায়িত্ব শুধু শিশুদের নয়—প্রথমে আমাদের নিজেদেরই। কারণ শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে আমাদের বর্তমানের আয়নায়।