ইসলামী নেতারা
দেশের বিভিন্ন ইসলামী দল ও সংগঠনের শীর্ষ নেতারা খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেন।   ছবি: সংগৃহীত

যাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে বারবার গ্রেপ্তার, কারাবরণ ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া—সেই অগণিত মানুষের চোখের জল, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বিদায় নিলেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।

বুধবার (তারিখ উল্লেখযোগ্য) বেলা ৩টা ২ মিনিটে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে জনসমুদ্রের মধ্যে তার নামাজে জানাজা সম্পন্ন হয়। জানাজায় দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের পাশাপাশি বিভিন্ন ইসলামী দল ও সংগঠনের শীর্ষ নেতারাও অংশ নেন।

জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরের মাঠ, বাইরের অংশ এবং পুরো মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ছাড়িয়ে আশপাশের সড়ক ও অলিগলিতে লাখো মানুষ জানাজায় শরিক হন। নারীদের জন্য ছিল বিশেষ ব্যবস্থাও।

নামাজে জানাজা পড়ান বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব আবদুল মালেক এবং সঞ্চালনা করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।

ইসলামী নেতাদের উপস্থিতি

বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিসসহ বিভিন্ন ইসলামী রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের শীর্ষ নেতারা অংশ নেন।

জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে জানাজায় উপস্থিত ছিলেন— দলটির নায়েবে আমির ও সাবেক সংসদ সদস্য মাওলানা আনম শামসুল ইসলাম, সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মাছুম, মাওলানা আবদুল হালিম এবং অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।

এ ছাড়াও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মো. সেলিম উদ্দিন, মহানগরী উত্তরের নায়েবে আমির আবদুর রহমান মুসা, মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি ডা. ফখরুদ্দিন মানিক এবং মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি কামাল হোসেনসহ কেন্দ্রীয় ও মহানগরীর নেতৃবৃন্দ জানাজায় অংশ নেন।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পাঠানো প্রেস বিবৃতিতে জানানো হয়, দলটির সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করিম, মহাসচিব অধ্যক্ষ মাওলানা ইউনুস আহমাদ, প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক আশরাফ আলী আকন এবং দলের মুখপাত্র ও যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান নামাজে জানাজায় শরিক হন।

এ ছাড়া খেলাফত মজলিসের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন—নায়েবে আমির মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর হোসাইন এবং যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক আবদুল জলিল।

জানাজায় আরও দেখা যায়, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাবেক নেতা মামুনুল হক, আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে শামীম সাঈদী, আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহসহ বিভিন্ন ইসলামী চিন্তাবিদ ও আলেমকে।

এর আগে পরিবারের তরফে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান প্রয়াতের জন্য সবার কাছে দোয়া চান।

তিনি বলেন, “আমি মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার বড় সন্তান তারেক রহমান। আমি আজকে এখানে উপস্থিত সকল ভাইয়েরা এবং বোনেরা-যারা উপস্থিত আছেন, মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া জীবিত থাকাকালীন অবস্থায় যদি আপনাদের কারো কাছ থেকে কোনো ঋণ নিয়ে থাকেন, দয়া করে আমার সাথে যোগাযোগ করবেন। আমি সেটি পরিশোধের ব্যবস্থা করবো ইনশাআল্লাহ।

“একই সাথে উনি জীবিত থাকাকালীন অবস্থায় উনার কোনো ব্যবহারে, উনার কোনো কথায় যদি কেউ আঘাত পেয়ে থাকেন, তাহলে মরহুমার পক্ষ থেকে আমি আপনাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থী। দোয়া করবেন। আল্লাহ তাআলা যাতে উনাকে বেহেশত দান করেন।”

জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বাম পাশে দাঁড়ান তারেক রহমান, তারপরে এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং তারপরে দাঁড়ান নির্বাচন বিশেষজ্ঞ বদিউল আলম মজুমদার।

আর সরকারপ্রধানের ডান পাশে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, তারপরে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান এবং তারপরে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনীপ্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান ও বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন।

প্রধান উপদেষ্টার পাশাপাশি তার সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, আদিলুর রহমান, ফাওজুল কবির খান, আ ফ ম খালিদ হোসেন, আলী ইমাম মজুমদার, সি আর আবরার, এম সাখাওয়াত হোসেন। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমকেও জানাজায় দেখা গেছে।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ বিএনপির সর্বস্তরের নেতারকর্মীরা জানাজায় শরিক হোন। জানাজায় দেখা গেছে কবি ও তাত্ত্বিক ফরহাদ মজহারকে।

রাজনীতিকদের মধ্যে জামায়াত ইসলামীর মিয়া গোলাম পরওয়ার, আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে শামীম সাঈদী, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, এনসিপির নাহিদ ইসলাম ও হাসনাত আবদুল্লাহ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মামুনুল হক উপস্থিত ছিলেন, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান এবং গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুরকে দেখা গেছে। ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম, আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের আহমাদুল্লাহও বিএনপি নেত্রীর জানাজায় অংশ নেন।

বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এসেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাবিক, ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডি এন ধুঙ্গেল, মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতির উচ্চ শিক্ষা, শ্রম ও দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রী আলি হায়দার আহমেদ, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দা শর্মা, শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিজিতা হেরাথ।

চীন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন মিশনের প্রধানরাও তাদের দেশের পক্ষে খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধা জানাতে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে শেষ যাত্রায় অংশ নেন।

এর আগে মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, ‘আপসহীন নেত্রী’ খালেদা জিয়া।

তার মৃত্যুতে দেশে তিনদিনের রাষ্ট্রীয় শোক চলছে, বুধবার ঘোষণা করা হয়েছে সাধারণ ছুটি।

বুধবার সকালে এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে খালেদা জিয়ার কফিন নেওয়া হয় গুলশানে তার ছেলে তারেক রহমানের বাড়িতে।

পরে জাতীয় পতাকা শোভিত লাশবাহী গাড়ি বুধবার বেলা পৌনে ১২টার দিকে সংসদ ভবনের সামনে পৌঁছায়।

গাড়িবহরে একটি বাসে করে সেখানে পৌঁছান খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান ও তার পরিবারের সদস্যরা।

এই মানিক মিয়া অ্যাভেনিউতেই ১৯৮১ সালের ২ জুন তার স্বামী, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জানাজা হয়েছিল।

বিএনপি চেয়ারপারসনের জানাজার পর বেলা সাড়ে ৩টার দিকে তাকে জিয়া উদ্যানে জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হবে।

নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ‘আপসহীন নেত্রী’ অভিধা পাওয়া খালেদা জিয়া বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন ৪১ বছর। তিনি পাঁচবারের সংসদ সদস্য, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী; আর বিরোধী দলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেছেন দুইবার।