নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ততই উত্তেজনা বাড়ছে। সেই উত্তেজনার একটি উদ্বেগজনক দিক হলো—রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার জেরে নারী কর্মীদের ওপর হামলা, হেনস্তা ও ভয়ভীতির অভিযোগ। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নারী কর্মীদের ওপর ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় দলটি সরাসরি অভিযোগের তির ছুড়েছে বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীদের দিকে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা পর্যায় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া এসব ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে—নির্বাচনের আগে আদৌ কি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বিদ্যমান থাকবে?
মিরপুরে সংঘর্ষ: নির্বাচনী সহিংসতার নগ্ন চিত্র
রাজধানীর মিরপুর ৬০ ফিট এলাকায় ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনাটি এই সংকটের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় পীরেরবাগ আল মোবারক মসজিদের সামনে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মাগরিবের নামাজ শেষে জামায়াতের মহিলা বিভাগের নেতাকর্মীদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। এতে অন্তত ১৬ জন আহত হন।
ঘটনার ভয়াবহতা এখানেই শেষ নয়। অভিযোগ রয়েছে, কয়েকজন জামায়াত ও শিবির কর্মীকে একটি মসজিদের ভেতরে আটকে রাখা হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে সেনাবাহিনী মোতায়েনের পর। এমনকি পুলিশের উপস্থিতিতেও হামলাকারীদের মারমুখী আচরণ অব্যাহত থাকার অভিযোগ জামায়াতের পক্ষ থেকে তোলা হয়েছে, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্নের জন্ম দেয়।
অবরুদ্ধ নারী কর্মী ও দীর্ঘ সময়ের হেনস্তা
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ারের বিবৃতিতে উঠে এসেছে আরও গুরুতর অভিযোগ। তার ভাষ্যমতে, পীরেরবাগ এলাকায় একটি বাসায় মহিলা জামায়াতের বৈঠক চলাকালে বিকেল ৩টা থেকে রাত সাড়ে ৭টা পর্যন্ত নারী নেত্রীদের অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। পরে তাদের উদ্ধার করতে গেলে হামলার শিকার হন জামায়াত ও শিবিরের কর্মীরা। আহতদের হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়।
এই ঘটনাকে তিনি ‘পরিকল্পিত সন্ত্রাস’ আখ্যা দিয়ে দাবি করেন, জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-১৫ আসনে নির্বাচনকে প্রভাবিত করতেই এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে। নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করা এবং সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানোই এর মূল উদ্দেশ্য বলে অভিযোগ করেন তিনি।
প্রতিবাদ ও পাল্টা হুঁশিয়ারি
মিরপুরের ঘটনার পরপরই জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে বিক্ষোভ শুরু হয়। রাতেই এবং পরদিন সকালে রাজধানীতে একাধিক বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। জামায়াতের কেন্দ্রীয় ও মহানগর নেতারা এসব কর্মসূচিতে বক্তব্য দিয়ে দাবি করেন—তারা শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চান, কিন্তু হামলা হলে প্রতিরোধ করা হবে।
ঢাকা মহানগরী উত্তরের কর্মপরিষদ সদস্য শাহ আলম তুহিন অভিযোগ করেন, পরাজয় নিশ্চিত জেনেই বিএনপি ও যুবদলের নেতাকর্মীরা সন্ত্রাসের পথ বেছে নিয়েছে। তার দাবি, সেনা সদস্যদের সামনেই হামলা হয়েছে, অথচ প্রশাসন কার্যকর ও নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। এই বক্তব্য রাজনৈতিক সংঘাতের পাশাপাশি প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়েও বিতর্ককে উসকে দেয়।
এ দিকে কয়েকটি সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। যেখানে দেখা যায়, মসজিদের পাশের গলিতে নিয়ে এক শিবিরকে বেধড়ক মারধর করা হচ্ছে।
যদিও এসব ঘটনা অস্বীকার করে বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য মিথ্যা অভিযোগ করছে জামায়াত। তাদের দাবি, জামায়াত নেতাকর্মীরাই বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়ে উল্টো দোষ তাদের দিকে চাপিয়ে দিচ্ছে।
রাজধানীর বাইরে একই চিত্র
শুধু মিরপুর নয়, দেশের বিভিন্ন জেলাতেও নারী জামায়াত কর্মীদের ওপর হামলা ও হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে। ফেনীর সোনাগাজীতে মহিলা জামায়াতের একটি কোরআন ক্লাসে বাধা দেওয়া, অশালীন ভাষা ব্যবহার ও মোবাইল ফোন ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে যুবদল নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত পক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করলেও ঘটনাস্থলে পুলিশের হস্তক্ষেপ ও ‘তাৎক্ষণিক সমাধান’-এর মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকে।
এর আগে গত বছর ঝিনাইদহের মহেশপুরে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় জামায়াতের নারী নেত্রীদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। সেখানে শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি ওড়না টেনে খুলে নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ সামনে আসে, যা সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়।
গণতান্ত্রিক সংকট
এই ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা বহন করে—নির্বাচনী মাঠে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এখনো যে নিরাপদ নয় সেই চিত্র তুলে ধরে। রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতার কারণে নারী কর্মীদের টার্গেট করা হলে তা শুধু একটি দলের সমস্যা থাকে না; এটি সরাসরি গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ওপর আঘাত হানে।
জামায়াতের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন এখনো কার্যকরভাবে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে পারেনি। অপরদিকে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের শাস্তি না হলে সহিংসতার এই ধারা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
নির্বাচন গণতন্ত্রের উৎসব হওয়ার কথা। কিন্তু নারী কর্মীদের ওপর হামলা, অবরুদ্ধ করা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ যদি অব্যাহত থাকে, তবে সেই নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হবে—সে প্রশ্ন থেকেই যায়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আদর্শিকভাবে মোকাবিলা করার পরিবর্তে পেশিশক্তির ব্যবহার কেবল সংঘাতই বাড়ায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব হলো—সহিংসতার ঊর্ধ্বে উঠে সকলের জন্য নিরাপদ ও সমান রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা।
অন্যথায়, এই সংকট শুধু একটি দলের নয়, পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপরই ভারী হয়ে উঠবে।
এমকে/আরটিএনএন
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!