বিএনপি, ধানের শীষ
বিএনপি ৮–১২টি আসন জোটের শরিকদের ছেড়ে দিলেও সেসব আসনেই বিদ্রোহীরা সবচেয়ে বেশি সক্রিয়।   ছবি: আরটিএনএন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, তার নাম বিরোধী দল বা রাষ্ট্রীয় বাধা নয়—বরং দলীয় বিদ্রোহ। ৩০০ আসনের মধ্যে প্রায় ৭৮–৭৯টি আসনে বিএনপির সাবেক, বহিষ্কৃত কিংবা মনোনয়নবঞ্চিত নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকায় ‘ধানের শীষ’-এর নির্বাচনী অঙ্ক জটিল হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতা দলটির হাইকমান্ডকে যেমন দুশ্চিন্তায় ফেলেছে, তেমনি পুরো নির্বাচনী সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, বিএনপি যেসব আসনে প্রার্থী দিয়েছে কিংবা জোটের শরিকদের ছেড়ে দিয়েছে—প্রায় সবখানেই কোনো না কোনোভাবে বিদ্রোহী প্রার্থী সক্রিয়। নারী প্রার্থী মাত্র ১০ জন হলেও ৯২ জন নেতা স্বতন্ত্র হয়ে মাঠে থাকা নিছক পরিসংখ্যান নয়; এটি দলীয় শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলে।

এই বিদ্রোহীরা প্রান্তিক কেউ নন। সাবেক সংসদ সদস্য, কেন্দ্রীয় নেতা, জেলা সভাপতি, আহ্বায়ক, এমনকি তারেক রহমানের ব্যক্তিগত অনুরোধ উপেক্ষা করা হেভিওয়েট নেতারাও এতে রয়েছেন। ফলে বিষয়টি আর ‘ব্যক্তিগত অভিমান’ বা ‘মনোনয়ন না পাওয়া’র মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি পরিণত হয়েছে একটি কাঠামোগত সংকটে।

জোট রাজনীতিতে ফাটল

বিএনপি ৮–১২টি আসন জোটের শরিকদের ছেড়ে দিলেও সেসব আসনেই বিদ্রোহীরা সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। এতে শরিক দলগুলোর মধ্যে অস্বস্তি বাড়ছে। গণঅধিকার পরিষদ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বা বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থীরা অভিযোগ করছেন—ধানের শীষের বিদ্রোহীরাই তাদের জন্য প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জোট রাজনীতির মূল দর্শন হলো পারস্পরিক আস্থা ও ভোট স্থানান্তর। কিন্তু যখন একই রাজনৈতিক পরিবারের দুই প্রার্থী মুখোমুখি হন, তখন ভোট বিভাজন অনিবার্য হয়ে পড়ে। এতে শুধু বিএনপির নয়, পুরো জোটের আসন সমঝোতার যৌক্তিকতাই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

ইতোমধ্যেই ঢাকা-১২ আসনে বিএনপির জোটের প্রার্থী বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক দাবি করেছেন, বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর লোকজন তার কর্মী ও জোটের ভাইদের হুমকি দিচ্ছে। এটা বন্ধ করতে হবে। গণমাধ্যমে তিনি বলেছেন, ‘বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাকে এ আসনের জন্য মনোনীত করেছেন। জোটের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে যে সিদ্ধান্ত এসেছে, তা সবাইকে মেনে নিতে হবে এবং ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।’

ভোট বিভাজন ও জামায়াতের সুযোগ

এই অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সুবিধাভোগী হয়ে উঠেছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে থাকায় যেসব আসনে বিএনপির জয় তুলনামূলক সহজ ছিল, সেখানে বিদ্রোহী প্রার্থীরা সেই সমীকরণ ভেঙে দিচ্ছেন।

বিশেষ করে ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা ও উত্তরবঙ্গের বহু আসনে বিএনপির ভোট ভাগ হয়ে জামায়াত বা তাদের শরিকদের জন্য অপ্রত্যাশিত সুযোগ তৈরি হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি-সংশ্লিষ্ট বিদ্রোহী থাকা ৭৯ আসনের মধ্যে অন্তত ৪৯টিতে জামায়াত সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছে। এটি নিছক কাকতালীয় নয়, বরং নির্বাচনী মাঠের পরিসংখ্যান তাই বলছে।

বিদ্রোহীদের সামাজিক ভিত্তি

বিদ্রোহীরা নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করছেন ‘জনপ্রিয়তা’ ও ‘ত্যাগী রাজনীতি’র ভাষায়। তাদের অভিযোগ—মনোনয়ন বণ্টনে প্রবাসী, সুবিধাভোগী কিংবা আন্দোলনে নিষ্ক্রিয়দের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়ভাবে পরিচিত ও জনপ্রিয় নেতারা বঞ্চিত হয়েছেন।

এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কারণ, অনেক আসনেই দেখা যাচ্ছে বিদ্রোহীরা তৃণমূল নেতাকর্মীদের বড় অংশকে সঙ্গে নিয়ে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। এতে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীরা ঘরে-বাইরে বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়ছেন।

হাইকমান্ডের সীমাবদ্ধতা

বিএনপি ইতোমধ্যে প্রায় ৮০ জন নেতাকে বহিষ্কার করেছে। কিন্তু বহিষ্কার যে সব সময় রাজনৈতিক সমাধান আনে না, এই নির্বাচন সেটির বড় উদাহরণ। বরং অনেক ক্ষেত্রে বহিষ্কার বিদ্রোহীদের ‘স্বতন্ত্র পরিচয়’ আরও দৃঢ় করেছে।

তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে চেষ্টা করেও যাদের সরাতে পারেননি, তারা এখন প্রতীকের বাইরে গিয়ে ভোটারকেই শেষ ভরসা হিসেবে দেখছেন। এতে দলের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

এই নির্বাচনে বিএনপির সামনে প্রশ্ন একটাই—সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ কে? মাঠের বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, অনেক আসনে সেই প্রতিপক্ষ বাইরের দল নয়, নিজেদেরই বিদ্রোহী প্রার্থী। ভোট ভাগের এই রাজনীতি বিএনপিকে কতটা মূল্য দিতে হবে, তা ১২ ফেব্রুয়ারির ফলাফলই বলবে।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—যদি দলীয় সংহতি পুনর্গঠন ও মনোনয়ন রাজনীতিতে কাঠামোগত সংস্কার না আসে, তাহলে ভবিষ্যতেও ‘ধানের শীষ’-এর সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা থাকবে নিজের ঘরেই।