তারেক রহমান, বিএনপি
গত ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশে রাজকীয়ভাবে ফিরে আসেন তারেক রহমান।   ছবি: আরটিএনএন

তারেক রহমানের ছোটবেলা ছিল সাধারণ। শীর্ষ সেনা কর্মকর্তা, সেনাপ্রধান এবং রাষ্ট্রপতির সন্তান হিসেবে কোনো বাড়তি সুবিধা পাননি। জিয়াউর রহমান এই মানদণ্ড ঠিক করে দিয়েছিলেন।

প্রয়াত মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরীর একটি বর্ণনা উল্লেখ করা যেতে পারে। ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান তখন বন্দী। তাঁর সঙ্গে মইনুল হোসেন চৌধুরীসহ কয়েকজন সেনাকর্মকর্তা দেখা করেন। এ সময় তিনি তাঁদের প্রধানত দুটি বিষয় উল্লেখ করেন। এক. তাঁর জন্য যেন কম ভাড়ায় একটি বাসা দেখা হয়। দুই. তাঁর পেনশেনের বিষয়টি যেন নিশ্চিত করা হয়। পুরোটা জীবন জিয়াউর রহমান এই সততা ধরে রেখেছিলেন। এটাও নিশ্চিত করেছিলেন, তাঁর পরিবারের কোনো সদস্য যেন সেনাপ্রধান কিংবা রাষ্ট্রপতির পরিচয় ব্যবহার করে কোনো সুযোগ না পায়।

জিয়াউর রহমানের আকস্মিক শাহাদাতের পর পরিবারের ওপর নেমে আসে বিপর্যয়। খালেদা জিয়ার দীর্ঘ সংগ্রামমুখর জীবনে তাঁর সঙ্গী ছিলেন দুই সন্তান—তারেক রহমান (পিনু) ও আরাফাত রহমান (কোকো)। প্রয়াত কোকো কখনও রাজনীতিতে সক্রিয় হননি। জিয়াউর রহমান গ্রাম থেকে রাজনীতি শুরু করেছিলেন। তারেক রহমানও পিতার পদাঙ্কই অনুসরণ করেন। তিনিও শুরু করেন তৃণমূল থেকে। প্রায় চার দশক আগে হন বগুড়া জেলা বিএনপির সদস্য।

২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোটের জয়ের নেপথ্য কৌশল প্রণয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তারেক রহমান। বিএনপির রাজনীতি বদলাতে চেয়েছিলেন তিনি। গুলশান, পল্টন থেকে দলটির রাজনীতি নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন গ্রামে। একের পর এক ইউনিয়ন সম্মেলনে যোগ দেন। বিএনপিকে সাংগঠনিকভাবে সুসংগঠিত করেন। তবে তরুণ নেতৃত্বকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে কখনও কখনও দলের ভেতরেও প্রশ্নের মুখে পড়েন। জোট আমলে হাওয়া ভবনকেন্দ্রিক নানা প্রচার-অপপ্রচারের শিকার হন তারেক রহমান। তাঁকে নিয়ে নানামুখী সমালোচনা তৈরি হয়। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন তিনি। ঢাকার মিডিয়ার বড় অংশ তাঁর বিরুদ্ধে প্রচারণায় শামিল হয়।

এক-এগারো তারেক রহমানের জীবনে নিয়ে আসে চরম বিপর্যয়। তাঁকে সে সময় গ্রেপ্তার করা হয়। কারাগারে যেতে হয় বেগম খালেদা জিয়া এবং আরাফাত রহমান কোকোকেও। তবে তারেক রহমানের সঙ্গে নির্মমতার কাহিনী সেখানেই শেষ হয়নি। যৌথ বাহিনীর হেফাজতে থাকার সময় তাঁর ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। পরে সুপ্রিম কোর্টের জামিনে চিকিৎসার জন্য তিনি ব্রিটেন যান। নেপথ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা ছিল।

এর মধ্যে দুটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। এক. লন্ডনে থেকে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে তিনি দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রাখা তাঁর এ সময়ের সবচেয়ে বড় সফলতা। দুই. শেখ হাসিনার আমলে একাধিক মামলায় তারেক রহমানের সাজার রায় হয়। কিন্তু শুরুর দিকে একটি দুর্নীতির মামলায় খালাস পান তিনি। সেজন্য ওই বিচারককে অবশ্য বড় মূল্য চুকাতে হয়। দেশ থেকে পালিয়ে যেতে হয় তাঁকে। 

সে রায়ের পর ২০১৩ সালের নভেম্বরে মানবজমিন পত্রিকায় লিখেছিলাম, “তৃণমূলের রাজনীতিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন তারেক রহমান। ঘুরে বেড়িয়েছেন ইউনিয়ন থেকে ইউনিয়নে, গ্রাম থেকে গ্রামে। তাঁর বিরুদ্ধে চলা দিনের পর দিন প্রচারণা কিছুটা হলেও আঁচড় কেটেছিল তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মনে। তবে একটি রায়ে বদলে গেছে দৃশ্যপট। বিরুদ্ধ শক্তি ক্ষমতায় থাকতেও আদালতের রায়ে নির্দোষ প্রমাণিত হলেন তিনি। বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও এ রায়ে তারেক রহমান ফিরে গেছেন আবার তৃণমূলে—যে তৃণমূলই তাঁর রাজনীতির ধ্যান-জ্ঞান। এ এক রাজনীতিবিদের পুনরুত্থানের কাহিনি।”

আমি এক যুগ আগে তারেক রহমানের ফেরার কথা লিখলেও গত ২৫ ডিসেম্বর সত্যি সত্যি বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন তারেক রহমান। লাখ লাখ মানুষ তাঁকে বরণ করে নিয়েছে। পাঁচ দিন পরই অবশ্য তাঁর জীবনে আবার বিয়োগান্তক ঘটনা ঘটে। তিনি হারিয়েছেন তাঁর মা বেগম খালেদা জিয়াকে। বাংলাদেশ হারিয়েছে তার ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিবিদদের একজনকে।

গত কয়েক দিনে তারেক রহমানের নির্বাচনী প্রচারণা নিয়ে এ লেখকের প্রতিক্রিয়া অবশ্য মিশ্র। সভা-সমাবেশে তিনি নতুনত্ব এনেছেন। কিন্তু খুব সম্ভবত এমন কিছু কথা তিনি বলেছেন, যা না বললে রাজনীতিবিদ হিসেবে মুন্সিয়ানার পরিচয় দিতেন।

এটা ঠিকই, জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার পতাকা এখন তারেক রহমানের হাতে। কিন্তু প্রতিটি মানুষ, বিশেষত একজন রাজনীতিবিদের চিন্তা ও দর্শনে পার্থক্য থাকে—একই পরিবারের হলেও।

নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে তারেক রহমান ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছেন। আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার—তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। জনমত জরিপ ইঙ্গিত দিচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে তিনি এগিয়ে। বিদেশি মিডিয়াও তাই বলছে।
দুটি প্রশ্ন। তারেক রহমান কি প্রধানমন্ত্রী হবেন? তিনি কি হিংসা-হানাহানির পরিবর্তে নতুন বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেবেন?

প্রথম প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে কালই। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর পেতে সময় লাগবে।