প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এনসিপির ইফতার মাহফিল
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এনসিপির ইফতার মাহফিল   ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ইফতার মাহফিলের আয়োজন করেছে দলটি। শনিবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর আবাহনী ক্রীড়া মাঠে এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে দলের কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, এক বছরে এনসিপি নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। তার ভাষায়, শুধু এনসিপি নয়, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে পুরো বাংলাদেশই বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গেছে। সেই সময়কে ধারণ করে দেশকে এগিয়ে নিতে যে নেতৃত্ব প্রয়োজন, এনসিপি তার অবস্থান থেকে সেই দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছে।

তিনি বলেন, এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রতিপাদ্য—দেশ আর যাবে নতুন পথে, ফিরবে না আর ফ্যাসিবাদে। তাদের বিশ্বাস, দেশ ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে বেরিয়ে এসেছে; এখন লক্ষ্য গণতন্ত্রকে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠা করা। এজন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং গণভোটের রায় কার্যকর করার আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, ফ্যাসিবাদ বিলোপের ক্ষেত্রে বিচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণহত্যা, গুম ও খুনের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের দাবিতে এনসিপি সোচ্চার রয়েছে এবং থাকবে। তিনি আরও বলেন, দলের আরেকটি মূল প্রতিপাদ্য হলো—বিপ্লব, বিকল্প ও বিনির্মাণ। তার মতে, বিপ্লবের শক্তি থেকেই বিকল্প নেতৃত্বের জন্ম হয়েছে, যা বাংলাদেশকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে চায়।

দলটির পেছনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি ২০১৩ সালের হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন, ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন, পিলখানা হত্যাকাণ্ড এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতার কথা উল্লেখ করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এসব ঘটনার প্রেক্ষাপট থেকেই ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি এনসিপির জন্ম। গণঅভ্যুত্থানই তাদের শেকড়।

আগামী কর্মসূচি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের প্রত্যাশা জানিয়ে দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তৃণমূল সংগঠনকে শক্তিশালী করে আগামী দিনে রাজনৈতিক অর্জন বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন।

তিনি জানান, সর্বশেষ নির্বাচনে ছয়টি আসনে বিজয় অর্জন করলেও দলটি এতে সন্তুষ্ট নয়; ভবিষ্যতে আরও বড় সাফল্যের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করবে। পাশাপাশি সংস্কার পরিষদ গঠন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা আইন ও অধ্যাদেশ সংসদে অনুমোদনের প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন।

বক্তব্যের শেষে তিনি নির্বাচনে সমর্থন দেওয়া সাধারণ ভোটারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান এবং বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনে সবার সহযোগিতা কামনা করেন।

অনুষ্ঠানে এনসিপির পক্ষ থেকে ৩ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডের একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। এতে জুলাই আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা, সংস্কার কমিশনে ভূমিকা এবং জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণসহ দলটির পথচলার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।

এরআগে অনুষ্ঠানে অতিথি হিসাবে যোগ দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ এনসিপির প্রথম বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, গণতন্ত্রের মাঠে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান দেশের রাজনীতিকে আরও গতিশীল ও সমৃদ্ধ করবে। তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে শুভেচ্ছা জানান এবং এনসিপির যাত্রার শুরু থেকেই দলটির প্রতি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

তিনি বলেন, এনসিপি যখন রাজনৈতিক দল হিসেবে যাত্রা শুরু করে, সেদিন ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত থাকতে না পারলেও টেলিভিশনে অনুষ্ঠানটি দেখেছেন এবং তা তাকে অনুপ্রাণিত করেছে। তার মতে, তরুণদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে মর্যাদাবান করবে এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

মন্ত্রী উল্লেখ করেন, নির্বাচনী সমঝোতার মাধ্যমে জাতীয় সংসদে এনসিপির ছয়টি আসন পাওয়া দলটির জন্য বড় অর্জন। ভবিষ্যতে এই সংখ্যা বাড়তে পারে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন। তবে তিনি বলেন, রাজনীতিতে সাফল্য রাতারাতি আসে না; উত্থান-পতন মেনে নিয়েই এগোতে হয়।

সালাউদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, বর্তমান ও আগামী প্রজন্ম এমন রাজনীতি চায়, যা জনগণের প্রত্যাশা ও চাহিদাকে ধারণ করে। অতীতের ইতিহাসে সীমাবদ্ধ না থেকে ভবিষ্যৎ নির্মাণের রাজনীতি করতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এনসিপি ২০২৪ সালের জুলাই ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

দলটির ঘোষণাপত্র ও ইশতেহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সময়ের চাহিদা অনুযায়ী রাজনৈতিক কর্মসূচি, গঠনতন্ত্র ও ইশতেহারে পরিবর্তন আনতে হবে। রাজনীতি স্থির নয়, এটি একটি গতিশীল প্রক্রিয়া—এ কথা মনে রেখে এগোতে হবে।

জাতীয় সংসদ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এখন থেকে সংসদই হবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে তর্ক-বিতর্ক ও বহুমতের মধ্য দিয়ে জাতীয় স্বার্থে ঐকমত্য গড়ে তোলা হবে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো সংসদেই আলোচিত হবে এবং সেখান থেকেই জাতির জন্য দিকনির্দেশনা আসবে—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।

ইফতার আয়োজনে আরো উপস্থিত ছিলেন কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু এবং নৌ, রেল, সেতু ও সড়ক পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।

এছাড়া এনসিপির সদস্য সচিব ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন, প্রধান সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, প্রধান সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ, মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব, সিনিয়র যুগ্ম প্রধান সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসুদসহ কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন জেলার নেতারা অংশ নেন।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দলীয় নেতারা ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন এবং ঐক্যবদ্ধভাবে গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।