শবে বরাতেও আল্লাহ যাদের ক্ষমা করেন না।
শবে বরাতেও আল্লাহ যাদের ক্ষমা করেন না।   ছবি: সংগৃহীত

শবে বরাত ইসলামী বর্ষপঞ্জির শাবান মাসের মধ্যরাতে পালিত একটি গুরুত্বপূর্ন। রাত এই রাতকে ক্ষমা লাভ ও মুক্তি লাভের রাত হিসেবে গণ্য করেন মুসলিমরা। এই রাতে আল্লাহ তায়ালা হিংসা ও বিদ্বেষপোষণকারী ও মুশরিক ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করেন। 

শাবান মাসের ১৪ তারিখ সন্ধ্যার পর শুরু হয়ে ১৫ তারিখ ভোর পর্যন্ত সময়কে শবে বরাত বা নিসফে শাবান বলা হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় এটি শবে বরাত নামে পরিচিত হলেও আরব বিশ্বে একে বলা হয় লাইলাতুল বরাত। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় পরিচিত নিসফু শাবান নামে এবং তুরস্কে একে বলা হয় বেরাত কান্দিলি।

শবেবরাতে আল্লাহ তাআলার রহমত, মাগফিরাত ও অনুগ্রহ লাভের এক বিশেষ সুযোগ। এ রাতে আল্লাহ তাআলা তার অনুগত বান্দাদের গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেন।

হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, বান্দা আল্লাহ তাআলার কাছে যা চায়- আল্লাহ তাকে তা দান করেন। কিন্তু এত ব্যাপক ক্ষমা ও দয়ার মধ্যেও কিছু মানুষ রয়েছে, যাদের জন্য এ রাতে ক্ষমার কোনো অংশ থাকে না। বেশিরভাগ ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা রাত জেগে নামাজ, দোয়া ও কোরআন তিলাওয়াতে মশগুল থাকেন। এক হাদিসে মুয়াজ বিন জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) ইরশাদ করেছেন—

আল্লাহ তাআলা অর্ধ-শাবানের রাতে অর্থাৎ শাবানের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে তার সৃষ্টির দিকে রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন। (সহিহ ইবনে হিব্বান: ৫৬৬৫)

আরেক হাদিসে আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন—‘একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) রাতে নামাজে দাঁড়ান এবং এত দীর্ঘ সিজদা করেন যে, আমার ধারণা হলো, তিনি হয়ত মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি তখন উঠে তার বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিলাম। তার বৃদ্ধাঙ্গুলি নড়ল। যখন তিনি সিজদা থেকে উঠলেন এবং নামাজ শেষ করলেন, তখন আমাকে লক্ষ্য করে বললেন—
হে আয়েশা তোমার কি এই আশঙ্কা হয়েছে যে, আল্লাহর রাসুল তোমার হক নষ্ট করবেন? আমি উত্তরে বললাম, না, হে আল্লাহর রাসুল। আপনার দীর্ঘ সেজদা থেকে আমার এই আশঙ্কা হয়েছিল, আপনি মৃত্যুবরণ করেছেন কি না। 

তখন নবী (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি জানো এটা কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তার রাসুলই ভালো জানেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন ইরশাদ করলেন, ‘এটা হলো অর্ধ শাবানের রাত (শবে বরাত)। আল্লাহ তায়ালা অর্ধ-শাবানের রাতে তার বান্দার প্রতি মনোযোগ দেন এবং ক্ষমাপ্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করেন এবং অনুগ্রহপ্রার্থীদের অনুগ্রহ করেন আর বিদ্বেষ পোষণকারীদের ছেড়ে দেন তাদের অবস্থাতেই।’ (শুআবুল ঈমান, বায়হাকি: ৩/৩৮২-৩৮৩; তাবারানি: ১৯৪)

হাদিসের আলোকে যেসব শ্রেণির মানুষ শবেবরাতের ক্ষমা থেকে বঞ্চিত থাকে, তারা হলো—

১. জাদুকর

২. মদ্যপ বা নেশাকারী 

৩. ব্যভিচারী 

৪. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী 

৫. পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান 

৬. হিংসুক ও সম্পর্কচ্ছেদকারী ব্যক্তি -বিশেষ করে যে ব্যক্তি তিন দিনের বেশি কোনো মুসলমান ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ রাখে। এ ধরনের লোকদের জন্য এ রাতে ক্ষমা বা কল্যাণের কোনো অংশ থাকে না।

বিশেষ করে মুসনাদে আহমদ–এ বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে- হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- ‘১৫ শাবানের রাতে মহান আল্লাহ তাআলা তার সৃষ্টিজীবের প্রতি বিশেষ (রহমতের) দৃষ্টি দেন এবং হিংসুক ও খুনি ছাড়া অন্যান্য বান্দাদের ক্ষমা করে দেন।’ (মুসনাদে আহমদ)

শবেবরাত কেবল আনুষ্ঠানিক ইবাদতের রাত নয়; বরং এটি আত্মশুদ্ধি, সম্পর্ক সংশোধন ও গুনাহ পরিত্যাগের রাত। আল্লাহ তাআলা যেন মুসলিম উম্মাহকে উপরোক্ত নিন্দনীয় চরিত্রগুলো থেকে হেফাজত করেন। শবেবরাতের কল্যাণ ও ক্ষমা লাভের উদ্দেশ্যে প্রত্যেককে নিজ নিজ ঘরে নফল ইবাদত-বন্দেগি, তাওবা-ইস্তিগফার, কোরআন তিলাওয়াত ও জিকির-আজকারে রাত জাগরণ করার এবং পরদিন রোজা রাখার তৌফিক দান করেন।

এমআর/আরটিএনএন