টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, ‘হাইব্রিড মডেল’, ভারত, পাকিস্তান, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব,
আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ।   ছবি: সংগৃহীত

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দশম আসর মাঠে গড়ানোর আগেই পরিণত হয়েছে বিতর্ক, নজির আর রাজনৈতিক টানাপোড়েনের এক অনন্য অধ্যায়ে। ২০০৭ সালে এই ফরম্যাটে বিশ্বকাপ শুরুর পর থেকে প্রতিটি আসরেই অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ। এবারও খেলার কথা ছিল লাল-সবুজের প্রতিনিধিদের। কিন্তু নিরাপত্তা শঙ্কার কথা তুলে ধরে ভারতে খেলতে অস্বীকৃতি জানানোর পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ইতিহাসে একাধিক ‘প্রথম’ ঘটনার সূচনা হয়।

বিশ্ব যত বড় হচ্ছে, ক্রিকেটের বিশ্বায়ন নিয়ে প্রশ্ন ততটাই ঘনীভূত হচ্ছে এমনটাই মনে করেন সমালোচকরা। এখন পর্যন্ত মোট ২৪টি দেশ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নিলেও ক্রিকেট এখনও পুরোপুরি বৈশ্বিক হয়ে উঠতে পারেনি বলেই মত অনেকের। এবার অবশ্য অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা প্রথমবারের মতো বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০-এ। কিন্তু এই বিস্তৃতির মাঝেও আয়োজন ঘিরে বিতর্কের ঘাটতি নেই। ক্রীড়াজগতের ইতিহাসেই বিরল একটি বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই এত আলোচনা, সমালোচনা আর রাজনৈতিক উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে।

যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন নতুন কিছু নয়। তবে এবারই প্রথম দেখা গেল তথাকথিত ‘হাইব্রিড মডেল’ বিশ্বকাপ। ভারত ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের জেরে ভারতে পাকিস্তানের ম্যাচ আয়োজন অসম্ভব হয়ে পড়লে বাধ্য হয়ে শ্রীলঙ্কাকে সহ-আয়োজক করা হয়। মূল আয়োজক দেশ ভারত হলেও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ গড়াচ্ছে শ্রীলঙ্কার মাঠে যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে এক নতুন নজির।

এই বিশ্বকাপে অংশ না নিয়েও সবচেয়ে বেশি আলোচনায় বাংলাদেশ। একটি ক্রিকেটারকে ঘিরেই পুরো টুর্নামেন্টের গতিপথ বদলে গেছে এমন উদাহরণ ক্রিকেটে বিরল। আইপিএল থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার মাধ্যমে ক্রিকেট রাজনীতির প্রথম চাল দেয় ভারত এমনটাই মনে করছে বাংলাদেশ ক্রিকেট মহল। এর প্রতিবাদে ভারতে খেলতে অস্বীকৃতি জানায় বাংলাদেশ। পরিস্থিতি সামাল দিতে শ্রীলঙ্কায় টাইগারদের ম্যাচ আয়োজনের প্রস্তাব দিলেও সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে উল্টো বাংলাদেশকেই বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেয় আইসিসি। ফলে প্রথমবারের মতো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে দেখা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশের জায়গায় বিশ্বকাপে সুযোগ পেয়েছে স্কটল্যান্ড। বাছাইপর্ব পেরোতে ব্যর্থ হলেও র‌্যাঙ্কিংয়ের ভিত্তিতে টাইগারদের পরিবর্তে মূল পর্বে খেলছে স্কটিশরা। ক্রিকেট ইতিহাসে এই প্রথম কোনো দল বাছাইপর্বে ব্যর্থ হয়েও সরাসরি বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে। একই সঙ্গে এটি প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, যেখানে লাল-সবুজের দল অনুপস্থিত।

বাংলাদেশ-ভারত দ্বন্দ্বে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে পাকিস্তানও। টাইগারদের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়ে পাকিস্তান সরকার বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কটের ঘোষণা দিয়েছে। নজিরবিহীন এই সিদ্ধান্ত শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেই নয়, নাড়িয়ে দিয়েছে আইসিসির কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রশাসনিক ভারসাম্যকে। আলোচনায় উঠে এসেছে ক্রিকেটে ভারতীয় আধিপত্য ও ক্ষমতার প্রশ্নও।

এই বিশ্বকাপ যে আরও বড় বিতর্কের জন্ম দিতে পারে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে সম্ভাব্য পাকিস্তান-ভারত ফাইনাল হলে কী ঘটবে সে বিষয়ে এখনো কোনো পরিষ্কার অবস্থান দেয়নি পাকিস্তান। টুর্নামেন্টের ভাগ্য তখন কোন দিকে মোড় নেবে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে আয়োজক ও আইসিসি মহলে।

ক্রিকেটের বিশ্বায়নের আরেকটি বড় নিদর্শন হিসেবে এবার প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে দেখা যাবে ইতালিকে। ফুটবল ও হকির পর ক্রিকেট বিশ্বকাপেও নাম লেখাচ্ছে ইউরোপের এই দেশটি। বাছাইপর্ব পেরিয়ে আইসিসির সহযোগী দেশ হিসেবে মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছে ইতালি। দলটির হয়ে খেলছেন ওয়েইন মেডসন যিনি গড়তে যাচ্ছেন এক ব্যতিক্রমী কীর্তি। ৪২ বছর বয়সী এই ক্রীড়াবিদ এর আগে দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে হকি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিলেন। এবার তিনি নামছেন ক্রিকেট বিশ্বকাপের মঞ্চে দুটি ভিন্ন খেলায় বিশ্বকাপ খেলার বিরল কৃতিত্ব নিয়ে।

সব মিলিয়ে, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের এই আসর শুধু ক্রিকেটীয় লড়াই নয়; এটি রাজনীতি, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, বৈশ্বিক বিস্তার আর বিতর্কের এক বহুমাত্রিক প্রতিচ্ছবি। মাঠের ফলাফলের বাইরেও এই বিশ্বকাপ দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকবে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।