শ্রীলঙ্কা, নিউজিল্যান্ড, টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ
দাসুন শানাকা   ছবি: সংগৃহীত

কলম্বোতে নিউজিল্যান্ডের কাছে ৬১ রানের শোচনীয় হারে সেমিফাইনালের স্বপ্নভঙ্গ হওয়ার পর শ্রীলঙ্কার অধিনায়ক দাসুন শানাকা দলের কাঠামোগত আমূল পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, বিশ্বমঞ্চে ধারাবাহিকভাবে লড়াই করতে হলে ফিটনেসের মান এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অবশ্যই উন্নতি ঘটাতে হবে।

শানাকা বলেন, "দেশের হয়ে খেলার সময় ফিটনেস সবার আগে থাকা উচিত। কারণ এ নিয়ে কোনো আপস করা যায় না। আমরা যদি চোট-সমস্যার দিকে তাকাই, তবে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া খুবই কঠিন। ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গা কতটা ভালো, কিংবা মাথিশা পাথিরানা ও এশান মালিঙ্গা কতটা গুরুত্বপূর্ণ—তা সবাই জানে। এই খেলোয়াড়দের না পাওয়াটা অজুহাত নয়, কিন্তু অধিকাংশ চোটই ফিটনেসের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফিটনেস সমস্যার কারণে কিছু খেলোয়াড় দলে জায়গা পায়নি। আমরা এটা নিয়ে সবসময় কথা বলি। আমি মনে করি, এই নিয়ম সবার জন্যই সমান হওয়া উচিত।"

তিনি উল্লেখ করেন যে, একাধিক বিশ্ব আসরে বারবার চোট-সমস্যা শ্রীলঙ্কা দলকে ভুগিয়েছে। "আমি গত পাঁচটি বিশ্বকাপের সবকটিতেই খেলেছি, একটি বাদে। প্রতিবারই এই একই বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে—চোট, চোট এবং আরও চোট। কীভাবে আমরা এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারি, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।"

শানাকার মতে, সমস্যাটি শুধু ফিটনেসে সীমাবদ্ধ নয়; বরং পরিকল্পনার চক্র এবং নির্দেশনার স্বচ্ছতার অভাবও রয়েছে। তিনি বলেন, "আমরা যদি বিশ্বকাপের জন্য কোনো পরিকল্পনা করি, তবে তা দীর্ঘমেয়াদি হওয়া উচিত। স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে এমন বড় টুর্নামেন্ট খেলা কঠিন।"

অধিনায়ক হিসেবে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা বলেন তিনি। "আমি কতদিন অধিনায়ক থাকব, তা আমার জানা নেই। এটা নির্বাচক এবং শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের সিদ্ধান্ত। তবে আমি খুশি যে এতদিন এই দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পেয়েছি। আমি অনেক ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আবার ভুলও করেছি। সত্যি বলতে, অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপ খেলতে পেরে আমি আনন্দিত।"

শানাকা জানান, ভালো ব্যাটিং উইকেটের প্রত্যাশা করেই দল সাজানো হয়েছিল, কিন্তু কন্ডিশন, বিশেষ করে প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামের উইকেট প্রত্যাশা অনুযায়ী আচরণ করেনি। তিনি বলেন, "টুর্নামেন্ট শুরুর আগে আমি বলেছিলাম যে উইকেট ভালো হবে বলে আশা করছি। শ্রীলঙ্কার সেরা ব্যাটসম্যানরা এখানে আছে। ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে ভালো স্ট্রাইক রেট ও দক্ষতার ভিত্তিতেই খেলোয়াড়দের নেওয়া হয়েছে। কেউ এখানে জোর করে খেলতে আসেনি। আমরাও দেশের জন্য কিছু করতে চাই।"

তিনি আরও যোগ করেন, "সত্যি বলতে, যা হয়েছে তার জন্য আমরা খুবই দুঃখিত। কেউ ব্যর্থ হতে মাঠে নামে না। সবাই ভালো খেলার এবং দলের জন্য জেতার উদ্দেশ্য নিয়েই নামে। দুর্ভাগ্যবশত, আমরা সবসময় আমাদের চাওয়ামতো কন্ডিশন পাই না। কখনো কখনো ছোটখাটো পরিবর্তনের কারণে আমরা ম্যাচ হেরে যাই, যা আমরা ভাবি না। খেলোয়াড় হিসেবে আমরা এতে খুবই মর্মাহত।" পাওয়ার হিটিং বা গায়ের জোরে বল পেটানোর অভাবের কথা স্বীকার করলেও শানাকা বলেন, শ্রীলঙ্কায় সাফল্যের জন্য কেবল পেশিশক্তি নয়, বরং উইকেটের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াটাও জরুরি।

তিনি বলেন, "পাওয়ার হিটিংয়ের কথা বললে, হ্যাঁ, পুরো শ্রীলঙ্কাতেই এর অভাব রয়েছে। কিন্তু আমাদের এখানকার কন্ডিশন অনুযায়ী খেলতে হবে। পাল্লেকেলেতে কখনো কখনো ভালো উইকেট পাওয়া যায়, সেখানে পাওয়ার হিটিং কাজে লাগে। কিন্তু আজকের মতো উইকেটে পাওয়ার হিটিং খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। এখানে রিভার্স সুইপ এবং সুইপ বেশি কার্যকর। কামিন্দু মেন্ডিস কঠিন সময়ে এসে তার রিভার্স সুইপ ও সুইপগুলো দারুণভাবে ব্যবহার করেছে। দুনিথ ভেল্লালাগের ক্ষেত্রেও তাই। শ্রীলঙ্কায় আমাদের প্রায়ই এমন পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করতে হয়, এবং এটাই স্বাভাবিক। এমন কন্ডিশনে বোলাররা ভুল করলে অন্য দলকে থামানো কঠিন হয়ে পড়ে। পাওয়ার হিটিং থাকা উচিত, কিন্তু এই কন্ডিশনে টিম ম্যানেজমেন্ট কীভাবে একাদশ সাজাচ্ছে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।"

সহ-আয়োজক হিসেবে সুপার এইটের একটি ম্যাচ বাকি থাকতেই বিদায় নেওয়ার হতাশায় শানাকা স্বীকার করেন যে দল প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি এবং বিপুল সংখ্যক দর্শকের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি বলেন, "আমরা এর জন্য খুবই লজ্জিত। ইংল্যান্ড ম্যাচটি আমরা জিততে পারতাম। আমি বলছি না যে জিততামই, কিন্তু আমরা যদি আরও বিচক্ষণ হতাম, তবে জিততে পারতাম। আজকের ম্যাচটি একপেশে ছিল, যদিও বোলিং ভালো হয়েছে। দর্শকদের বলার মতো আমার কিছু নেই। আমরা তাদের আনন্দ করার মতো কোনো জয় উপহার দিতে পারিনি।"

তিনি দলের ওপর বাইরের চাপ এবং খেলোয়াড়দের ওপর নেতিবাচকতার প্রভাব নিয়েও কথা বলেন। শানাকা বলেন, "সবাই চেয়েছিল আমরা সেমিফাইনালে যাই। আমার মনে হয়, নেতিবাচকতা কমানোর জন্য আমরা যথেষ্ট কিছু করতে পারিনি। তাদের নেতিবাচক মনোভাব থাকাটা স্বাভাবিক, কিন্তু মানুষ হিসেবে আমরাও তো খেলোয়াড়। আমরাও সবসময় জিততে চাই এবং দেশকে ভালো ফলাফল দিতে চাই। দুর্ভাগ্যবশত, এই মুহূর্তে আমাদের পক্ষে কিছুই কাজ করেনি। আমরা এর জন্য খুবই দুঃখিত।"

"প্যাডি আপটন আমাদের সঙ্গে কাজ করেছেন এবং বিশাল সমর্থন দিয়েছেন। কিন্তু খেলোয়াড় হিসেবে বাইরের কোলাহল নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন। আমরা বেশিরভাগ সময় নেতিবাচক কথাই শুনি। আমরা যতই ইতিবাচক থাকি না কেন, বাইরে থেকে একটি নেতিবাচক পরিবেশ তৈরি করা হয়। এটি শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের জন্য একটি বড় অসুবিধা। আমরা বিশ্বকাপ হেরেছি এবং এর কারণগুলো জানি। আমাদের সবারই উদ্বেগ আছে। কিন্তু সমস্যা সমাধানের চেয়ে নেতিবাচকতাই বেশি সামনে এসেছে। পরবর্তী প্রজন্মের খেলোয়াড়দের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য সরকার যদি হস্তক্ষেপ করে এসব বন্ধ করতে পারে, তবে তা বিশাল সাহায্য হবে।"

বিদায় নিশ্চিত হলেও শানাকা বলেন, টুর্নামেন্টটি ইতিবাচকভাবে শেষ করতে হবে। "আমাদের সমস্যা যাই থাকুক না কেন, দল হিসেবে আমাদের ইতিবাচক থাকতে হবে। একটি বিশ্বকাপ ভালোভাবে শেষ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি পরবর্তী টুর্নামেন্টের জন্য মোমেন্টাম তৈরি করে দেয়।"

সূত্র : ক্রিকবাজ

আরটিএনএন/এআই