ডিএসই, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন, অর্থনৈতিক গতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ,
ব্লু-চিপ ও ব্যাংক শেয়ারে ভর করে চাঙা পুঁজিবাজার।   ছবি সংগৃহীত

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক টানা তৃতীয় সপ্তাহেও ঊর্ধ্বমুখী ধারা ধরে রেখেছে। জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী সম্ভাব্য অর্থনৈতিক গতি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রত্যাশায় ব্যাংক খাতে বিনিয়োগকারীদের বাড়তি আগ্রহ বাজারকে চাঙা করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং তুলনামূলকভাবে অবমূল্যায়িত ব্লু-চিপ শেয়ারে কেনাকাটা বাড়ায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরছে। একই সঙ্গে চলমান আয় ঘোষণার মৌসুমও বাজারে ইতিবাচক মনোভাব তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। চলতি সপ্তাহে তালিকাভুক্ত ২০টি কোম্পানি তাদের ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যা বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।

ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহসানুর রহমান বলেন, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথে গেলে ব্যাংক খাত সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ধীরগতির কারণে রপ্তানি ও আমদানি খাতে প্রত্যাশিত সুবিধা পায়নি ব্যাংকগুলো। তবে নির্বাচনের পর অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়লে ব্যাংকগুলোর আয়ও বাড়তে পারে বলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রত্যাশা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ব্যাংকিং খাতে চলমান সংস্কার কার্যক্রম শক্তিশালী ব্যাংকগুলোর ভবিষ্যৎ মুনাফা নিয়ে আশাবাদ তৈরি করেছে। এ কারণে ব্র্যাক ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেড়েছে।

চলতি সপ্তাহে মোট বাজার লেনদেনের প্রায় ১৯ শতাংশই হয়েছে ব্যাংক খাতে। সপ্তাহজুড়ে খাতটি প্রায় ৪ শতাংশ বেড়েছে, যা সামগ্রিক বাজার বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

চার কার্যদিবসের এই সপ্তাহে প্রথম তিন দিন বাজারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেলেও শেষ দিনে মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতায় কিছুটা চাপ তৈরি হয়। সপ্তাহ শেষে ডিএসইএক্স সূচক ৮০ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৫৫ শতাংশ বেড়ে ৫,২৩৪ পয়েন্টে অবস্থান নেয়। গত তিন সপ্তাহে সূচক মোট ২১৫ পয়েন্ট বেড়েছে। একই সময়ে বাজার মূলধন ১৫২ বিলিয়ন টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৯৯ ট্রিলিয়ন টাকায়।

ইবিএল সিকিউরিটিজ তাদের সাপ্তাহিক বাজার বিশ্লেষণে জানিয়েছে, জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা পরিষ্কার হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেড়েছে। এর ফলে অবমূল্যায়িত ব্লু-চিপ শেয়ারে বিনিয়োগ বাড়ছে এবং বাজার ঊর্ধ্বমুখী ধারা বজায় রেখেছে।

৩০টি শীর্ষ কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএস৩০ সূচক ১৫ পয়েন্ট বেড়ে ২,০০২ পয়েন্টে এবং শরিয়াভিত্তিক ডিএসইএস সূচক ৩৮ পয়েন্ট বেড়ে ১,০৭২ পয়েন্টে পৌঁছেছে।

বৃহৎ মূলধনী কয়েকটি শেয়ারের দরবৃদ্ধি বাজারে বড় ভূমিকা রেখেছে। ইসলামী ব্যাংক, ওয়ালটন, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক ও রেনাটা—এই পাঁচ কোম্পানি মিলেই ডিএসইএক্স সূচকে ১০৭ পয়েন্ট যোগ করেছে। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারদর সপ্তাহে ২১ শতাংশ বেড়ে সূচকে একাই ৫৭ দশমিক ৬ পয়েন্ট যুক্ত করেছে। ওয়ালটন ও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকও সূচক বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে।

মোট লেনদেন কমে ২৬ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন টাকায় নামলেও লেনদেনের দিন কম থাকায় দৈনিক গড় লেনদেন বেড়েছে। দৈনিক গড় লেনদেন দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন টাকা, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি।

তবে ‘জেড’ ক্যাটাগরির শেয়ারের অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সাপ্তাহিক শীর্ষ ১০ দরবৃদ্ধির মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, প্রিমিয়ার লিজিং, এফএএস ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং, জিএসপি ফাইন্যান্স, বিআইএফসি, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, উত্তরা ফাইন্যান্স ও প্রাইম ফাইন্যান্সসহ নয়টি কোম্পানি ছিল, যাদের দর ২৬ দশমিক ৮ থেকে ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বিশ্লেষকেরা এটিকে সম্ভাব্য কারসাজির ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।

ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৩৮৯টি কোম্পানির মধ্যে ২৩১টির দর বেড়েছে, ১৪১টির কমেছে এবং ১৭টি অপরিবর্তিত ছিল। খাতভিত্তিক হিসাবে ইঞ্জিনিয়ারিং খাত সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ বেড়েছে। এরপর ব্যাংকিং, ওষুধ, খাদ্য ও বিদ্যুৎ খাত ভালো করেছে।

লেনদেনে শীর্ষে ছিল ব্র্যাক ব্যাংক—৮৫৬ মিলিয়ন টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে। এরপর রয়েছে এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, ইসলামী ব্যাংক, ডমিনেজ স্টিল ও সিটি ব্যাংক।

চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। অল শেয়ার্স প্রাইস ইনডেক্স ২৬২ পয়েন্ট বেড়ে ১৪,৭৩১ পয়েন্টে এবং সিলেকটিভ ক্যাটাগরিজ ইনডেক্স (সিএসসিএক্স) ১৫৮ পয়েন্ট বেড়ে ৯,১২২ পয়েন্টে পৌঁছেছে। সেখানে ৭ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন শেয়ার ও মিউচ্যুয়াল ফান্ড ইউনিট লেনদেন হয়েছে, যার মূল্য ছিল ২৯৩ মিলিয়ন টাকা।