হত্যাকাণ্ড
গ্রেপ্তারকৃত শরিফুল ইসলাম। রোববার বিকেলে পাবনা ডিবি পুলিশ কার্যালয়ে।   ছবি: আরটিএনএন

বাড়িতে যাতায়াতের সুবাদে মাদ্রাসা ছাত্রী জামিলা আক্তার সেতু (১৫) এর উপর কু-দৃষ্টি পড়েছিল তার চাচা শরিফুল ইসলাম (৩০) এর। ঘটনার রাতে শরিফুল ওই বাড়িতে গেলে দাদি সুফিয়া বেগম তাকে বেরিয়ে যেতে বলে। প্রথমে কাঠের বাটাম দিয়ে দাদিকে মাথায় আঘাত করলে তিনি লুটিয়ে পড়ে সেখানেই মারা যান। পরে জামিলাকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করলে বাধা দেয়। তাকেও বাঁশের খাটি ও হাতুরী দিয়ে আঘাত করলে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায় সে। পরে তাকে টেন হিঁচড়ে বাড়ির বাইরে নিয়ে সরিষা ক্ষেতের পাশে ধর্ষণ করে মৃত্যু নিশ্চিত করে পালিয়ে যায় শরিফুল।

তদন্ত শুরু ২৪ ঘন্টার মধ্যে চাঞ্চল্যকর পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার দাদি-নাতনি হত্যার রহস্য উদঘাটন করে এসব তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। 

রোববার (০১ মার্চ) বিকেল সাড়ে চারটার দিকে পাবনা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে এক প্রেসব্রিফিংয়ে হত্যাকান্ডের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন পুলিশ সুপার আনোয়ার জাহিদ।

এর আগে শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে শরিফুলকে তার বাড়ি থেকে আটক করে পুলিশ। তিনি ঈশ্বরদী উপজেলার দাশুড়িয়া ইউনিয়নের কালিকাপুর গ্রামের মো. মোফাজ্জল হোসেনের ছেলে। পেশায় তিনি কখনও গাড়ির চালক, কখনও হেলপার হিসেবে কাজ করতেন। তিনি পুলিশের কাছে হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত থাকা ও হত্যার কারণ সহ বিস্তারিত স্বীকারোক্তিমুলক জবানিবন্দি দিয়েছেন। আর সন্দেহভাজন হিসেবে আটক রাব্বি মন্ডল নামের অপরজনকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

পুলিশ সুপার জানান, স্বামীর মৃৃত্যুর পর সুফিয়া বেগম (৬৫) তার ছেলে জয়নাল আবেদীন এর বাড়িতে বসবাস করতেন। জয়নাল এর স্ত্রী না থাকায় তার মেয়ে জামিলা আক্তার সেতু (১৫) একই বাড়িতে বসবাস করে। জামিলা কালিকাপুর দাখিল মাদ্রাসার দশম শ্রেণীর ছাত্রী ছিল। তার পিতা ঢাকাতে কাজ করেন। তিনি বাড়িতে না থাকায় জামিলা ও তার দাদি সুফিয়া বেগম সেখানে বসবাস করে।

গত শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) রাত ৯টার দিকে জামিলা ও তার দাদি প্রতিদিনের ন্যায় ঘুমিয়ে পড়েন। মধ্যরাতের পর যেকোন সময় অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তরা সুফিয়া বেগম কে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যার করে মরদেহ বাড়ির প্রবেশমুখে ফেলে রাখে। এছাড়া তার নাতনি জামিলাকে অপহরণের পর ধর্ষণ করে নৃশংসভাবে হত্যা করে বাড়ির পেছনে গম ক্ষেতের আইলের উপর বিবস্ত্র অবস্থায় লাশ ফেলে রেখে পালিয়ে যায় দূর্বৃত্তরা। পরদিন শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে তাদের মরদেহ উদ্ধারে করে পুলিশ।

এ ঘটনায় নিহত সুফিয়া বেগমের মেয়ে মর্জিনা খাতুন বাদি হয়ে অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে শনিবার মধ্যরাতে ঈশ্বরদী থানার মামলা দায়ের করেন। মামলা নম্বর ০১, তাং- ০১/০৩/২০২৬। আর ঘটনার পর হত্যার রহস্য উদঘাটনে মাঠে নামে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক টিম। পরবর্তীতে স্থানীয় সোর্স এবং তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনায় জড়িত আসামী সনাক্ত করে শরিফুল ইসলাম কে তার নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। মুলত তাদের তৎপরতায় শনিবার দুপুর থেকে তদন্ত শুরুর ২৪ ঘন্টার মধ্যে হত্যার রহস্য উদঘাটন সম্ভব হয়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শরিফুল গোয়েন্দা পুলিশকে জানায়, সুফিয়া বেগম তার আপন খালা। সে তার খালা সুফিয়ার বাড়িতে মাঝে-মধ্যে যাতায়াত করতো। যাতায়াতের সুবাদে সুফিয়ার নাতনি জামিযলা আক্তার সেতুর প্রতি তার কু-দৃষ্টি পড়ে। কু-প্রস্তাব দিয়েছিল সে। ঘটনার দিন শরিফুল রাত আনুমানিক ১১টার দিকে ওই বাড়িতে প্রবেশ করলে দাদি সুফিয়া বেগম বুঝতে পেরে তাকে বাড়ি থেকে বের হতে যেতে বলেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে শরিফুল কাঠের বাটাম দিয়ে সুফিয়া বেগমের মাথায় আঘাত করলে তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তিনি সেখানেই মারা যান।

তারপর শরিফুল ঘরের ভিতরে গিয়ে জামিলাকে জড়িয়ে ধরলে সে চিৎকার করে। এ সময় শরিফুল বাঁশের খাটিয়া ও হাতুরী দিয়ে জামিলার মাথায় আঘাত করলে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। রক্তাক্ত অবস্থায় জামিলাকে ঘর থেকে বের করে নিয়ে যেতে থাকে। বাড়ির পেছনে পুকুরের পাড় দিয়ে যাওয়ার সময় দু্’জনেই পুকুরে পড়ে যায়। তারপর জামিলাকে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার সময় তার পড়নের পায়জামা খুলে যায়।

জামিলাকে গম ক্ষেতের দিকে নেওয়ার পথিমধ্যে (নির্মিনাধীন বাড়ি পাশে) জ্ঞান ফিরলে সে চিৎকার করলে শরিফুল আবারো হাতুড়ী দিয়ে পুনরায় আঘাত করে। এরপর জামিলাকে টেনে হিঁচড়ে গম ক্ষেতের আইলে নিয়ে গিয়ে পড়নের জামা খুলে তাকে ধর্ষণ করে সরিষা ক্ষেতে বিবস্ত্র অবস্থায় ফেলে চলে যায়। সেখানেই মৃত্যু হয় জামিলা আক্তার সেতুর।

রোববার (১ মার্চ) দুপুরে আটককৃত শরিফুলকে নিয়ে তার দেখানো তথ্য মতে ঘটনাস্থল থেকে হত্যায় ব্যবহৃত একটি হাতুড়ি, একটি বাঁশের খাঁটিয়া, একটি কাঠের বাটাম ও শরিফুলের ব্যবহৃত একটি বাটন মোবাইল ফোন জব্দ করে পুলিশ।

দায়েরকৃত মামলায় শরিফুলকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে আদালতেক সোপর্দ করা হবে বলে জানান পুলিশ সুপার।