দৌলতদিয়ায় বাসডুবি
দুই বছরের সাবিহা মায়ের গলা ধরে ভেসে উঠলেও তলিয়ে যায় ভাই ও বোন   ছবি: সংগৃহীত

দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাস নদীতে নিমজ্জিত হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনায় অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে গেছে দুই বছরের শিশু সাবিহা। তবে একই দুর্ঘটনায় তার সাত বছর বয়সী ভাই সাবিত এবং ফুফাতো বোন সোহানা (১১) প্রাণ হারিয়েছে।

সাবিহা ও নিহত সাবিতের বাবা শরিফ মল্লিক। তাদের বাড়ি রাজবাড়ী সদর উপজেলার দাদশী বাজার এলাকায়। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ঈদের ছুটিতে সোহানা তার মায়ের সঙ্গে মামার বাড়ি বেড়াতে এসেছিল। তারা ঢাকায় বসবাস করতেন।

নিহত সাবিতকে দেখানোর জন্য ঢাকা নেয়া হচ্ছিল। গত বুধবার বিকেলে সাবিত, তার মা শাকিলা, ছোট বোন সাবিহা এবং তাদের ফুফু নিশি ও নিশির মেয়ে সোহানা এই পাঁচজন একসঙ্গে রাজবাড়ী শহরের বাস মালিক সমিতি এলাকা থেকে সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসে ওঠেন। তাদের বাসে তুলে দিতে এসেছিলেন সাবিহার দাদা নবীজ উদ্দিন মল্লিক।

বাসটি দৌলতদিয়া ঘাটে পৌঁছে পন্টুনে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে তলিয়ে যায়। দুর্ঘটনার মুহূর্তে বাসের ভেতরে এই পাঁচজনই ছিলেন। বাস ডুবে যাওয়ার পর সাবিহা ও তার মা পানির ওপর ভেসে উঠতে সক্ষম হন। স্থানীয়রা দ্রুত তাদের পন্টুনে তুলে উদ্ধার করেন। একইভাবে সাবিহার ফুফু নিশিও ভেসে উঠে প্রাণে বেঁচে যান।

কিন্তু সাবিহার ভাই সাবিত ও ফুফাতো বোন সোহানা নিখোঁজ হয়ে যায়। পরে রাতেই ডুবুরি দল তাদের মরদেহ উদ্ধার করে।

বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) দুপুরে দাদশী এলাকায় তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, নিহত সাবিত ও সোহানার মরদেহ জানাজার প্রস্তুতি চলছে। স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। শোকাহত পরিবেশের মধ্যেও ছোট্ট সাবিহা এক চাচার কোলে বসে রয়েছে। কিছু বুঝে উঠতে না পারলেও তার চারপাশে জড়ো হওয়া মানুষের আদর-সান্ত্বনা পাচ্ছে।

সাবিহার দাদা নবীজ উদ্দিন মল্লিক ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, আমার নাতি সাবিতের পেটে একটা চর্মরোগ হয়েছিল। এজন্য আমার মেয়ের সঙ্গে নাতি-নাতনিদের নিয়ে আমার বউমা ঢাকায় যাচ্ছিল ডাক্তার দেখাতে। সঙ্গে আমার মেয়ে আর মেয়ের মেয়েও ছিল। আমি নিজেই তাদের বাসে তুলে দিয়ে আসি। কিছুক্ষণ পর একজন ফোন করে জানায়, বাস নদীতে পড়ে গেছে। তখন পরিবারের সবাইকে নিয়ে দ্রুত ঘাটে যাই। গিয়ে দেখি আমার মেয়ে, বউমা আর ছোট নাতনি সাবিহাকে পেয়েছি। কিন্তু আমার আর দুই নাতি-নাতনিকে হারিয়ে ফেলেছি।

তিনি আরও বলেন, আমার মেয়ে আমাকে বলেছে, বাস যখন নদীর দিকে যেতে শুরু করে তখনই সাবিহা তার মায়ের গলা শক্ত করে ধরে ছিল। বাস ডুবে যাওয়ার পর তারা একসঙ্গে ভেসে ওঠে। একইভাবে আমার মেয়েও ভেসে উঠে বেঁচে যায়। কিন্তু আমার দুই নাতি-নাতনিকে জীবিত আর পেলাম না।

এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় একদিকে ছোট্ট সাবিহার বেঁচে ফেরার গল্প, অন্যদিকে তার ভাই ও ফুফাতো বোনকে হারানোর বেদনা দুটি বিপরীত চিত্র একসঙ্গে সবাইকে নাড়া দিচ্ছে। এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।