চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক এস এম নসরুল কদির।   ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি শামীম উদ্দিন খানের মেয়ের নিয়োগ স্বচ্ছতার সাথে নিয়োগ হয়েছে বলে দাবি করেছেন বোর্ডের বিশেষজ্ঞ সদস্য প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ও জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক এস এম নসরুল কদির। ৫৬৫তম সিন্ডিকেট সভায় মাহিরা শামীম ফাইন্যান্স বিভাগে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ অনুমোদন পেয়েছেন। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৬৫তম সিন্ডিকেট সভায় প্রোভিসি শামীম উদ্দিন খানের মেয়ের নিয়োগ অনুমোদন পাওয়ার পরপরই এটা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়। পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করে বিএনপিপন্থী অধ্যাপক নসরুল কদির।

তিনি বলেন, ‘‘ উপ-উপাচার্য শামীম উদ্দিন খানের মেয়ের বোর্ডে যাঁরা পরীক্ষা দিয়েছেন তাদের মধ্যে ৪ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে ২জন স্থায়ী ও ২ জন অস্থায়ী। শামীম উদ্দিন খানের মেয়েকে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ পেয়েছে। যাঁরা সর্বোচ্চ ভালো করেছে তাদের মধ্যে ২জনকে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।’’

নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘‘আমি যতটুকু দেখেছি নিয়োগ স্বচ্ছ হয়েছে। যোগ্যতার ভিত্তিতে এই নিয়োগ হয়েছে।’’

নিয়োগের বিষয়ে বোর্ডের অন্য সদস্য অধ্যাপক ড. হাসমত আলী বলেন, ‘‘উপ-উপাচার্যের মেয়ে বলে সবাই ধারণা থেকে এগুলো বলছে। উপ-উপাচার্যের মেয়ে স্বচ্ছভাবে এবং নিজের যোগ্যতায় নিয়োগ পেয়েছে। কিন্তু বিষয়টিকে অন্য দিকে প্রবাহিত করা হচ্ছে। বিভিন্ন পত্রিকায় বলা হচ্ছে মাহিরা শামীম ডিপার্টমেন্টে ৮ম। তবে মূল বিষয়টি হচ্ছে মাহিরা শামীমের ব্যাচ থেকে মাত্র ২-৩ জন শিক্ষার্থী নিয়োগের জন্য আবেদন করেছেন।’’

নিয়োগ বোর্ডের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘‘প্রথমে তাদেরকে লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয়। যেখানে ৩ টি প্রশ্নে ৫০ নাম্বার নির্ধারণ করা হয়েছিল। আমার প্রশ্নে ছিল ১০ নাম্বার, অধ্যাপক নসরুল কদির স্যারের প্রশ্নে ২০ নাম্বার এবং অধ্যাপক ড. নেছারুল করিম স্যারের প্রশ্নে ২০ নাম্বার। তিনজনই স্ব-স্ব ভাবে প্রশ্নগুলো মূল্যায়ন করে নাম্বার দিয়েছেন। এছাড়া লিখিত পরীক্ষায় ভিসিসহ আমরা তিনজনই উপস্থিত থেকে পরীক্ষা নিয়েছি।’’

নিয়োগ বোর্ডের স্বচ্ছতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘‘এককভাবে ফলাফল প্রস্তুত করা হয়নি। ৪ জনই মূল্যায়ন করে এই ফলাফল প্রস্তুত করা হয়েছে। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি ছিল স্বচ্ছ।’’

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণ করে। দায়িত্ব গ্রহণের পর শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা ফেরানোর লক্ষ্যে নতুন নিয়োগ নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় শিক্ষক নিয়োগের নতুন নীতিমালা অনুমোদনের পরপরই কার্যকর করা হয়। নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, একজন শিক্ষক প্রার্থীকে ক্রমান্বয়ে তিনটি ধাপে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হবে। প্রথমত লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে প্রার্থীর প্রেসেন্টেশন নিবে নিয়োগ বোর্ড। প্রেজেন্টেশনে উত্তীর্ণ প্রার্থীকে ভাইবা বোর্ডে বসতে হবে। এই তিন ধাপের পরীক্ষায় সর্বাধিক নাম্বার পেয়ে যেই প্রার্থী উত্তীর্ণ হবেন তাকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হবে বলে নীতিমালায় বলা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, এই নীতিমালার আওতায় বর্তমান প্রশাসনের সময়ে এ পর্যন্ত মোট ৭৮ জন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ ৫৬৫তম সিন্ডিকেটে বিভিন্ন বিভাগে ১৮ জন এবং তার আগের ৫৬৪তম সিন্ডিকেটে ৩৮ জন শিক্ষক নিয়োগ পান। অর্থাৎ দুই সিন্ডিকেট মিলিয়ে ৫৬ জন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়।

সর্বশেষ ৫৬৫তম সিন্ডিকেট সভায় ফাইন্যান্স বিভাগে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন উপ-উপাচার্য শামীম উদ্দিন খানের মেয়ে মাহিরা শামীম। এর আগে গত বছরের ১৯ আগস্ট ফাইন্যান্স বিভাগে চারটি প্রভাষক পদে শিক্ষক নিয়োগের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিজ্ঞপ্তিতে প্রভাষক পদে চারজন শিক্ষক নিয়োগের কথা উল্লেখ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে ১৯ ডিসেম্বর নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার তারিখ নির্ধারণ করা হয় এবং উপাচার্যের কার্যালয়ে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে বলেও উল্লেখ ছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ফাইন্যান্স বিভাগের চারটি প্রভাষক পদের বিপরীতে শিক্ষক হিসেবে আবেদন করেন মোট ৫১ জন প্রার্থী। এই চার পদের মধ্যে একটি সহকারী অধ্যাপক পদের বিপরীতে এবং আরেকটি সহযোগী অধ্যাপক পদের বিপরীতে প্রভাষক নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় ছিল। সর্বমোট ৪ পদের মধ্যে দুটি স্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ এবং দুটি অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।

রেজিস্টার দপ্তর থেকে প্রকাশিত আবেদনকারীদের তালিকা পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৫১ জন প্রার্থীর মধ্যে উপ-উপাচার্য শামীম উদ্দিন খানের কন্যা মাহিরা শামীমের নাম তালিকাভুক্ত ছিল ৪৩ নম্বরে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী ফাইন্যান্স বিভাগে লিখিত পরীক্ষার আয়োজন করা হয়। আবেদনকারী ৫১ জন প্রার্থীর মধ্যে এতে উত্তীর্ণ হন মাত্র ৮ জন প্রার্থী। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীরা পরবর্তী ধাপে নিয়োগ বোর্ডের সামনে প্রেজেন্টেশন দেন এবং এরপর অনুষ্ঠিত হয় মৌখিক পরীক্ষা। লিখিত পরীক্ষা, প্রেজেন্টেশন ও ভাইবা এই তিন ধাপের মূল্যায়নের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত চারজন প্রার্থীকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের জন্য চূড়ান্ত করা হয়। এই চারজনের মধ্য থেকেই অস্থায়ী ভিত্তিতে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগের জন্য মাহিরা শামীমকে সুপারিশ করে নিয়োগ বোর্ড। বিভাগীয় একাডেমিক ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মাহিরা শামীম স্নাতক (অনার্স) পর্যায়ে সিজিপিএ ৩.৮০ অর্জন করেছেন। তবে মাহিরা শামীম শিক্ষক নীতিমালার অধীনে আয়োজিত তিন ধাপের পরীক্ষায় অন্যান্য প্রার্থীদের তুলনায় সর্বাধিক নাম্বার পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন বলে নিয়োগ বোর্ড সূত্রে জানা গেছে।

প্রো-ভিসি শামীম খানের মেয়ের নিয়োগ বোর্ডে সভাপতি হিসেবে ছিলেন চবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার। জানতে চাইলে চবি উপাচার্য বলেন, আমরা কয়েক ধাপে প্রার্থীদের যাচাই-বাছাই এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিচ্ছি। এখানে স্বজনপ্রীতি কিংবা পক্ষপাতিত্বের কোনো সুযোগ নেই। আমাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হচ্ছে কিনা এজন্য আমরা সবাইকে আহ্বান করেছি যে আপনারা এসে আমাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া দেখে যান। কিন্তু কেউই আমাদের কথা কর্ণপাত করেননি।"

তিনি বলেন, "আমরা প্রথমে লিখিত পরীক্ষা নিই। এরপর লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে প্রার্থীকে ডেমনস্ট্রেশনের মাধ্যমে যাচাই করা হয়। সেখানে উত্তীর্ণ হলে প্রার্থীকে চূড়ান্তভাবে মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। এই তিন পরীক্ষায় যারা ভালো ফলাফল করে তাদের মধ্যে সেরা প্রার্থীকে নিয়োগের জন্য বেছে নেওয়া হয়। প্রো-ভিসি শামীম খানের মেয়ের নিয়োগ প্রক্রিয়া খুব স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়েছে।