নির্বাচনী অর্থনীতি: চাঙা ক্ষুদ্র ব্যবসা, মন্দায় প্রিন্টিং খাত
নির্বাচনী অর্থনীতি: চাঙা ক্ষুদ্র ব্যবসা, মন্দায় প্রিন্টিং খাত।   ছবি: সংগৃহীত

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন গতি এসেছে। রাজনৈতিক সমাবেশ, প্রচারণা ও নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে চায়ের দোকান থেকে খাদ্যপণ্য, সাউন্ড সিস্টেম, পরিবহন ও ডিজিটাল প্রচারণা খাতে বাড়তি চাহিদা দেখা দিয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশনের বিধিনিষেধের কারণে কাগজ ও প্রিন্টিং শিল্পে মন্দাভাব লক্ষ্য করা গেছে।

রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, মতিঝিল, ফকিরাপুল, পল্টন, গুলিস্তান, কমলাপুর, ধানমন্ডি, মিরপুর, গুলশান ও উত্তরা এলাকার ভোটার, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ভ্রাম্যমাণ হকাররা স্থানীয় অর্থনীতির চাঙাভাবের কথা জানিয়েছেন।

তাদের মতে, সব রাজনৈতিক দলের সমর্থকরা প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে। সমাবেশ ও পথসভা, চা চক্র, উঠান বৈঠকসহ নানা কার্যক্রমে চায়ের দোকান, মুড়ি-বিস্কুট বিক্রেতা ও ফুটপাথের খাবার ব্যবসায়ীদের বিক্রি বেড়েছে। সমাবেশে অংশ নিতে আসা মানুষজনের কারণে পানি, নাশতা ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

ঢাকার বিভিন্ন নির্বাচনী কেন্দ্রের আশপাশে হোটেল, গেস্টহাউস ও পরিবহন খাতেও চাপ বেড়েছে। এতে অন্যান্য সময়ের তুলনায় ভাড়া বেড়ে গেছে।

পল্টন এলাকার ফল বিক্রেতা শামসুল আলম আরটিএনএনকে বলেন, ‘নির্বাচনের ইশতেহার ঘোষণার পর থেকে আমার বিক্রি বেড়েছে। সভা-সমাবেশের পাশাপাশি প্রার্থীদের পক্ষে নিয়মিতই প্রচারণা চালানো হচ্ছে। প্রচারণাকে কেন্দ্র করে বিক্রিও বেশি হচ্ছে।’

ব্যস্ততা বেড়েছে চায়ের দোকানগুলোতেও। মানিকনগর এলাকার চা বিক্রেতা আলী আজম বলেন, ‘প্রচারণা চলাকালীন দৈনিক বিক্রি ৪,৫০০ থেকে বেড়ে প্রায় ৬,০০০ টাকায় উঠেছে। নির্বাচন এলে চা, বিস্কুট ও মুড়ির চাহিদা সাধারণ সময়ের চেয়ে ২০–২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।’

যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকার চা বিক্রেতা মো. হারুন বলেন, ‘আগে সারাদিনে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকার চা-সিগারেট বিক্রি করতাম। গত এক সপ্তাহে বিক্রি কয়েকগুণ বেড়েছে।’

মাইক সার্ভিসের ব্যবসাও বেড়েছে কয়েকগুণ। আলাল হোসেন নামের একজন মাইক ব্যবসায়ী বলেন, ‘নির্বাচনী প্রচারণার জন্য মাইক ও লাউডস্পিকারের চাহিদা বেড়েছে। প্রতিটি সাউন্ড সিস্টেমে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে।’

সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল প্রচারণার দিকে ঝুঁকেছেন অনেক প্রার্থী। ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকে লাইভ সম্প্রচার, ফটোগ্রাফি ও ভিডিও কনটেন্টের জন্য খরচ বেড়েছে।

তবে সব খাত সমানভাবে লাভবান হয়নি। বড় পোস্টার ও প্লাস্টিক ব্যানার নিষিদ্ধ হওয়ায় ঢাকার কাগজ ও প্রিন্টিং শিল্পে ব্যবসা কমেছে।

ফকিরাপুলের সরকার প্রিন্টিং প্রেসের কর্মচারী হাসান বলেন, ‘নির্বাচনের সময় আমরা প্রচুর পরিমাণে পোস্টার ছাপাতাম। কিন্তু এ বছর কাজ নেই।’

পারটেক্স পেপার মিলসের নির্বাহী পরিচালক এম এম নুরুন নবী বলেন, ‘আগের নির্বাচনের তুলনায় কাগজের চাহিদা কম। এখন মূলত লিফলেট ছাপানোর কাজ হচ্ছে।’

বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সহসভাপতি মো. আনোয়ার হোসেন জানান, পোস্টারে আগে একজন প্রার্থী ১২ থেকে ২৫ লাখ টাকা ব্যয় করতেন। এবার লিফলেটে খরচ হচ্ছে মাত্র ৫–৬ লাখ টাকা। ফলে নির্বাচনী প্রিন্টিং খাতের বাজার প্রায় ৮০০ কোটি টাকা থেকে কমে ১০০ কোটি টাকায় নেমে আসতে পারে।

টিআইবি’র তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনী ব্যয়ের বড় অংশ প্রকাশিত হিসাবের বাইরে থাকে। কর্মীদের ভাতা, খাবার, অনুদান ও অনানুষ্ঠানিক ব্যয় এখানে অন্তর্ভুক্ত। প্রার্থীদের হলফনামা অনুযায়ী মোট ঘোষিত ব্যয় প্রায় ৪০০ কোটি টাকা হলেও প্রকৃত ব্যয় আরও বেশি হতে পারে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, নির্বাচনী ব্যয় ঢাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায় সাময়িক চাঙাভাব তৈরি করে। মাইক ভাড়া, চা ও নাশতার বিক্রি, সাজসজ্জা—সবখানেই ব্যবসা লাভবান হয়। তবে এটি দীর্ঘস্থায়ী নয়।

তিনি আরও বলেন, নির্বাচনী ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও তদারকি না থাকায় অপ্রকাশিত অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ কঠিন। ভোট শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সাময়িক অর্থনৈতিক গতি দ্রুত কমে যায়।