গকসু ভিপির বিরুদ্ধে ছাত্রী হয়রানির অভিযোগ, গবিসাস কার্যালয় বন্ধের হুমকি 
গকসু ভিপির বিরুদ্ধে ছাত্রী হয়রানির অভিযোগ, গবিসাস কার্যালয় বন্ধের হুমকি    ছবি: সংগৃহীত

সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে (গবি) সাংবাদিকদের সংগঠন গণ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (গবিসাস) কার্যালয় বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিয়েছেন গণ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (গকসু) নেতারা। গণধর্ষণের অভিযোগ তোলা এক শিক্ষার্থীকে নিরাপত্তা ও সহায়তা দেয়াকে কেন্দ্র করে এই হুমকি দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। 

গবিসাস সদস্যদের দাবি, গকসুর নেতারা নিজেদের প্রশাসনের অংশ দাবি করে কার্যালয় বন্ধের নির্দেশ দেন এবং সাংবাদিকদের কার্যালয় ছাড়তে চাপ প্রয়োগ করেন। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী জানিয়েছেন, এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার গকসুর নেই।

ঘটনাটি ঘটে বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) বিকেলে। প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থী ও গবিসাস সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, বেলা আড়াইটার দিকে গকসুর ভিপি ইয়াসিন আল মৃদুল দেওয়ান, জিএস রায়হান খান, এজিএস সামিউল হাসানসহ প্রায় ১৭-১৮ জন গকসু প্রতিনিধি এবং আরও ৮-১০ জন শিক্ষার্থীসহ মোট প্রায় ২৫-৩০ জন গবিসাস কার্যালয়ে উপস্থিত হন। তখন সেখানে গবিসাসের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকসহ চারজন সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

গবিসাস সদস্যদের অভিযোগ, কার্যালয়ে ঢুকেই গকসুর জিএস রায়হান খান সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের উদ্দেশে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কমে যাওয়া এবং বিভিন্ন নেতিবাচক প্রচারণার জন্য গবিসাস দায়ী। তিনি দাবি করেন, শিক্ষার্থীদের ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে ওই দিন থেকেই গবিসাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ সময় তিনি টেবিল চাপড়ে কথা বলেন এবং সংগঠনের সদস্যদের পাঁচ মিনিটের মধ্যে কার্যালয় ত্যাগ করার আল্টিমেটাম দেন।

এ সময় উপস্থিত এক শিক্ষার্থী কার্যালয়ের একটি বৈদ্যুতিক বাতি ভেঙে ফেলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পাশাপাশি আইন বিভাগের শিক্ষার্থী জুবায়ের সেখানে উপস্থিত গবিসাস সদস্যদের দিকে বই ছুঁড়ে মারেন বলেও জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে গবিসাসের নেতারা গকসু নেতাদের কাছে জানতে চান, তাদের এমন সিদ্ধান্ত নেয়ার আইনগত বা প্রশাসনিক ক্ষমতা আছে কি না। জবাবে গকসু নেতারা বলেন, তারা প্রশাসনের অংশ হিসেবে এই নির্দেশ দিতে পারেন।

গবিসাস সদস্যরা লিখিত নির্দেশনা চাইলে গকসুর নেতারা তা দিতে অস্বীকৃতি জানান। এমনকি ভিডিও বক্তব্য দেয়ার অনুরোধও প্রত্যাখ্যান করেন তারা। এ সময় কয়েক দফায় গকসুর ক্রীড়া সম্পাদক শীতল ও দপ্তর সম্পাদক শারমিন আক্তারসহ কয়েকজন গবিসাসের সাধারণ সম্পাদককে শারীরিকভাবে আক্রমণের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে গবিসাস সদস্যরা গকসুর সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে কথা বলতে চান। এ সময় গকসুর ভিপি নিজেই উপাচার্যকে ফোন করেন। ফোনে উপাচার্য আবুল হোসেন সবাইকে সেদিনের মতো চলে যেতে এবং পরদিন বিষয়টি দেখবেন বলে জানান। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ঘটনাস্থলে এসে জানান, আগামী রবিবার বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা হবে। প্রায় দেড় ঘণ্টা অবস্থানের পর বিকেল চারটার দিকে গকসু প্রতিনিধিরা গবিসাস কার্যালয় ত্যাগ করেন।

এই ঘটনার পেছনে সাম্প্রতিক একটি ধর্ষণ মামলার প্রেক্ষাপট রয়েছে বলে জানিয়েছে গবিসাস। সম্প্রতি গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে গণধর্ষণ ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগে চার শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করে আশুলিয়া থানা পুলিশ। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে একজন গকসু ভিপি মৃদুল দেওয়ানের চাচাতো ভাই অন্তু দেওয়ান।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী গত সপ্তাহে আশুলিয়া থানা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেন, গকসু ভিপি মৃদুল দেওয়ান এবং তার ঘনিষ্ঠরা তাকে নিয়মিতভাবে হয়রানি করছেন। এ ঘটনার প্রতিবাদে গত সোমবার তিনি গবিসাস কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করতে আসেন।

সেদিন গকসু ভিপির স্ত্রী পরিচয় দেয়া এক নারীসহ কয়েকজন ব্যক্তি গবিসাস কার্যালয়ে এসে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে জোরপূর্বক তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ সময় কার্যালয়ে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। পরে পরদিন এসে গকসু ভিপি ওই ঘটনার জন্য দুঃখপ্রকাশ করেন। বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়।

এরপর থেকেই গবিসাস কার্যালয়ে আবার হামলার আশঙ্কা তৈরি হয় বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির সদস্যরা। তাদের দাবি, বৃহস্পতিবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শেষ হয়ে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস ত্যাগ করার পর গকসুর নেতারা এসে গবিসাস কার্যালয় বন্ধের ঘোষণা দেন।

এ বিষয়ে গকসুর জিএস রায়হান খান বলেন, গণ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ শিক্ষার্থীদের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি সংগঠন। শিক্ষার্থীদের মতামতের প্রতিফলন ঘটানো তাদের দায়িত্ব। তিনি দাবি করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব ক্লাব, সংগঠন বা সমিতি রয়েছে, তাদের অবশ্যই শিক্ষার্থীবান্ধব হতে হবে। কোনো সংগঠন যদি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয় বা সঠিক পথ থেকে সরে যায়, তাহলে শিক্ষার্থীদের মতামতের প্রতি সম্মান রেখে গকসু সেই সংগঠনকে সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

তবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা গকসুর নেই বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, গকসুর এ ধরনের কোনো কার্যক্রম পরিচালনার এখতিয়ার নেই।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আবুল হোসেন বলেন, বিষয়টি তিনি শুনেছেন। তবে তিনি সেদিন ক্যাম্পাসে না থাকায় এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে চাননি।

গবিসাস সাধারণ সম্পাদক তাহমিদ হাসান এই ঘটনাকে গণমাধ্যমের ওপর হামলা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নদ্রষ্টা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর প্রণীত নীতিমালার আলোকে শিক্ষার্থীদের স্বার্থে কাজ করে আসছে গবিসাস। সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদের কারণে সংগঠনের সদস্যরা হুমকির মুখে পড়েছেন। নিজেদের প্রশাসনের অংশ দাবি করে গকসুর নেতারা গবিসাস বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন, যা বাকস্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পরিপন্থী।

তিনি বলেন, ছাত্র প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে গকসু নির্বাচনের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবেদন করেছে গবিসাস। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ দুঃখজনক। ভাঙচুর ও হামলার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে দেশের প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক সাংবাদিক সংগঠন হিসেবে যাত্রা শুরু করে গণ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (গবিসাস)।