পাঁচটি ইসলামি ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের প্রশাসনিক কার্যক্রম ধীরগতিতে এগোচ্ছে। গত ১ জানুয়ারি ব্যাংকটির লেনদেন শুরু হলেও এখনো প্রধান কার্যালয়ের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম, উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা নিয়োগ এবং সাংগঠনিক কাঠামো সম্পন্ন হয়নি।
এ অবস্থায় ব্যাংকের স্থায়ী আমানতকারীদের ওপর আরোপিত মুনাফার তথাকথিত ‘হেয়ারকাট’ সিদ্ধান্ত ঘিরে অসন্তোষ বাড়ছে। এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবিতে গত রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে মানববন্ধন করেছেন ভুক্তভোগী আমানতকারীরা।
লেনদেন শুরুর প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেলেও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হয়নি। মতিঝিলের সেনা কল্যাণ ভবনে অবস্থিত প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ইন্টেরিয়র ডিজাইনের কাজ চলছে, শেষ হতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে।
ব্যাংকটির কার্যক্রমের ধীরগতির বিষয়ে জানতে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ও সাবেক সচিব আইয়ুব মিয়াকে ফোন করা হলেও পাওয়া যায়নি।
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক নিয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় চলতি সপ্তাহের প্রথম দুই কার্যদিবসে ঘুরে স্বল্প পরিসরে লেনদেন চলতে দেখা গেছে। তবে গ্রাহকের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম।
ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, গ্রাহকেরা টাকা জমা দেওয়ার পাশাপাশি আমানত সুরক্ষা আইনের আওতায় দুই লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলন করতে পারছেন। দীর্ঘদিন পর আটকে থাকা আমানতের অংশবিশেষ তুলতে পেরে কিছু গ্রাহক স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।
তবে মুনাফায় ‘হেয়ারকাট’ আরোপের সিদ্ধান্তকে শরিয়াহবিরোধী, চুক্তিভঙ্গ ও প্রতারণা আখ্যা দিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন আমানতকারীরা। তারা মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধনও করেছেন।
তারা ২০২৪ ও ২০২৫ সালের মুনাফায় হেয়ারকাট বাতিল, সব ধরনের হিসাবের টাকা মুনাফাসহ ফেরত এবং ব্যাংকের স্বাভাবিক লেনদেন কার্যক্রম দ্রুত চালুর দাবি জানান।
জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক গত ১৪ জানুয়ারি এক প্রজ্ঞাপনে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের আমানতের ওপর কোনো মুনাফা না দেওয়ার ঘোষণা দেয়। পরে ২১ জানুয়ারি জারি করা আরেকটি প্রজ্ঞাপনে আগের সিদ্ধান্ত সংশোধন করে মাত্র ৪ শতাংশ মুনাফা নির্ধারণ করা হয়। হঠাৎ করে চুক্তির শর্ত পরিবর্তন আইন, নৈতিকতা ও ব্যাংকিং রীতিনীতির পরিপন্থী বলে দাবি আমানতকারীদের।
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ফেনী শাখার গ্রাহক ইকবাল হোসেন বলেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের ঘোষিত মুনাফা হেয়ারকাটের নামে মুনাফা কেটে নেওয়া হচ্ছে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আবার ২০১২ সালে করা ডিপিএসের মেয়াদ শেষ হলেও টাকা দিচ্ছে না।
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকের চট্টগ্রামের তিন শাখার গ্রাহক মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, আমার এফডিআর ও ডিপিএসে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা জমা আছে। কিন্তু ব্যাংক কোনো টাকা দিচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে কবে টাকা মিলবে তার কোনো নিশ্চয়তা পাচ্ছি না।
আরেফ হোসেন নামের আরেক আমানতকারী বলেন, পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে সরকার আসল অপরাধীকে দায়মুক্তি দিয়েছে। যিনি বা যারা অর্থ লুট করেছেন তাদের শাস্তির আওতায় না এনে উল্টো আমানতকারীদের অর্থ আটকে রাখা হয়েছে; যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
মুনাফা কর্তনের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন বলেন, ইসলামী ব্যাংকে মুনাফা নির্দিষ্ট করে দিলে তা সুদের শামিল হয়। অর্জিত মুনাফার ভিত্তিতেই তা নির্ধারণ করা হয়।
তিনি বলেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে এসব ব্যাংকের কোনো অপারেটিং প্রফিট হয়নি। ফলে ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী মুনাফা দেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে ৪ শতাংশ মুনাফার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমানতকারীরা জানেন যে গত দুই বছরে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়েছে এবং ভালো ব্যবসা হয়নি। সে কারণে আগের মতো মুনাফা পাওয়া সম্ভব নয়।
রোববারের মানববন্ধনে অংশ নেওয়া এক নারী আমানতকারী বলেন, তার স্বামীর পেনশনের টাকা এফডিআরে রাখা ছিল এবং সেই মুনাফায় সংসার চলত। এখন দুই বছরের মুনাফা কেটে নেওয়ার সিদ্ধান্ত তাদের জন্য বড় সংকট তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র জানান, এফডিআরের গ্রাহক নিজে অসুস্থ হলে টাকা দেওয়া হচ্ছে, তবে আত্মীয়-স্বজন অসুস্থ হলে তা দেওয়া যাচ্ছে না। ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা উন্নত হলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
গ্রাহকদের অভিযোগ, ৫ আগস্টের পর প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধ না করে এফডিআরে রেখে দিয়েছে ব্যাংকগুলো। ফলে সেই টাকাও তুলতে পারছেন না তারা।
এ বিষয়ে আরিফ হোসেন বলেন, প্রশাসক নিয়োগের পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে এবং বর্তমানে রেমিট্যান্স আসার পর গ্রাহকেরা তা উত্তোলন করতে পারছেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে চারটি ব্যাংকের মালিকানা ছিল এস আলম গ্রুপের হাতে এবং একটি ব্যাংকের মালিক ছিলেন নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময়ে বিভিন্ন নামে-বেনামে ঋণের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করা হয়, যার ফলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি ভেঙে পড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ ব্যাংকে বর্তমানে ৭৫ লাখ আমানতকারীর প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে। বিপরীতে ঋণ রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশই খেলাপি।
সারাদেশে এসব ব্যাংকের ৭৬০টি শাখা, ৬৯৮টি উপশাখা, ৫১১টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট এবং ৯৭৫টি এটিএম বুথ রয়েছে। পরিচালন ব্যয় কমাতে কর্মীদের বেতন-ভাতা ইতোমধ্যে ২০ শতাংশ কমানো হয়েছে।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!