রোজার প্রস্তুতি, রমজান
রোজার মাসের আগমন ঘিরে দেশব্যাপী ক্রেতারা বাজারে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন।   ছবি: আরটিএনএন

রমজান মাসে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর সময়েও বাজারে দাম বৃদ্ধির চিত্র দেখা যাচ্ছে না। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জসহ প্রধান পাইকারি বাজারে ছোলা, মসুর, মটর ডাল, খেজুর, চিনি ও ভোজ্যতেলের মজুত স্বাভাবিক থাকায় ব্যবসায়ীরা আশাবাদী—এ বছর রোজার সময়ে দাম নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

সাধারণত রোজার মাসের আগমন ঘিরে দেশব্যাপী ক্রেতারা বাজারে ব্যস্ত হয়ে উঠেন। দীর্ঘ দিন ধরে ক্রেতাদের মধ্যে ভোগ্যপণ্যের দাম নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও, এই বছর রোজার আগে বাজারে স্বস্তির হাওয়া বইছে। খাদ্যপণ্য, তেল, ডাল, চিনি এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কিছুটা কমায় ক্রেতারা স্বস্তি পাচ্ছেন।

বাজারে বিক্রেতারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক আমদানি ও স্থানীয় উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে ক্রেতাদের বোঝা হালকা হচ্ছে এবং রোজার খরচ সামলানো সহজ হচ্ছে।

একাধিক ক্রেতা খুশি মনে বলছেন, বাজারে দাম কিছুটা কমেছে, তাই আমাদের রোজার মাসের প্রস্তুতি সহজ হচ্ছে। ভোগ্যপণ্যের দাম বেশি থাকলে ক্রয় করতে কষ্ট হতো।

ছোলা-মসুর-মটর: দাম স্বাভাবিক ও মজুত পর্যাপ্ত

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত ছোলা খালাস হয়েছে ২ লাখ ৩ হাজার টনের বেশি, যা গত বছরের একই সময়ে আমদানির তুলনায় ৭০ হাজার টন বেশি। মসুর ডালের আমদানিতে সামান্য হ্রাস হলেও চট্টগ্রাম বন্দরে চারটি জাহাজ থেকে একযোগে খালাস হচ্ছে। মটর ডালের আমদানিও গত বছরের তুলনায় বেড়েছে। এসব মজুত বাজারে সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করছে।

ছোলার দাম সাম্প্রতিক এক মাসে কমেছে; মটর ডালের দাম সামান্য বেড়েছে। অস্ট্রেলিয়ান মোটা দানার মসুর ডাল পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি ৭৫ টাকা, যা গত নভেম্বরের তুলনায় কম। তবে ভারতীয় চিকন মসুর ডালের দাম বেড়েছে, বর্তমানে পাইকারিতে ১৫৫ টাকা প্রতি কেজি।

তেল ও চিনি: পর্যাপ্ত মজুত

চলতি অর্থবছরের ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত পরিশোধিত মিলের চিনি ১০ লাখ ৫৫ হাজার টনের বেশি আমদানি হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৩ লাখ টন বেশি। অপরিশোধিত সয়াবিন তেল ও পরিশোধিত পাম অয়েলের আমদানিও স্বাভাবিক। যদিও চট্টগ্রাম বন্দরে লাইটারেজ সংকটের কারণে খালাসে বিলম্ব হচ্ছে, দেশের গুদামে পর্যাপ্ত মজুত থাকায় সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে না।

রোজার মৌসুমি চাহিদা

ফ্রেশ খেজুরের আমদানিতে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে। জাহেদি ও মাশরুক খেজুরের দাম গত রমজানের তুলনায় কম। বিশেষ করে ১০ কেজির জাহেদি খেজুর এখন ১,৮৫০–১,৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যেখানে গত রমজানে দাম ছিল ২,২০০ টাকা। ফল ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে খেজুর নিয়মিত খাদ্যতালিকায় যুক্ত হওয়ায় রোজার সময় চাহিদার উপর অতিরিক্ত চাপ নেই। সরকারিভাবে ডিউটি কমানো হলে আরও খেজুর আমদানির সম্ভাবনা রয়েছে, যা রমজান মাসে দাম স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করবে।

বাজারে পর্যাপ্ত মজুত, আমদানির ধারাবাহিকতা ও দাম নিয়ন্ত্রণ এই রমজানকে ক্রেতাদের জন্য স্বস্তিদায়ক করবে। বিশেষ করে ছোলা, মসুর, মটর, খেজুর, চিনি ও তেলের মজুত স্বাভাবিক থাকায় সাধারণ মানুষ দরদরকারের সময়ে দাম বাড়ার ঝুঁকি থেকে মুক্ত। তবে পাইকারি বাজারে ভারতীয় চিকন মসুর ডালের দাম বৃদ্ধি ভবিষ্যতে খুচরা দামে প্রভাব ফেলতে পারে।

সরকার ও আমদানিকারকদের সমন্বিত উদ্যোগ, যথাযথ ডিউটি নীতি ও বন্দরে খালাস প্রক্রিয়ার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন বজায় রাখলে, রমজান মাসে ভোগ্যপণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে। এটি প্রমাণ করে—যথাযথ পরিকল্পনা ও পর্যাপ্ত আমদানির মাধ্যমে মৌসুমি চাহিদার চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই দাম হ্রাস সাময়িক হলেও ক্রেতাদের জন্য বড় স্বস্তি। তবে সতর্ক থাকতে হবে যাতে মূল্য নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে এবং চাহিদা পূরণের জন্য পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকে।