বীমা খাত
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ)।   ছবি: সংগৃহীত

দেশের নন–লাইফ বীমা খাতে বকেয়া দাবির পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে উত্থাপিত মোট দাবির বিপরীতে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ। ফলে বিপুল পরিমাণ দাবি এখনো অনিষ্পন্ন রয়েছে, যা খাতটিতে গ্রাহকের আস্থার ওপর চাপ তৈরি করছে।

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়ে দেশের ৪৬টি নন–লাইফ বীমা কোম্পানির কাছে মোট ৩ হাজার ৯৭১ কোটি ১৩ লাখ টাকার দাবি উত্থাপিত হয়। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ৩৭২ কোটি ১৯ লাখ টাকা। বাকি ৩ হাজার ৫৯৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা দাবি এখনো পরিশোধ হয়নি।

পরিসংখ্যান বলছে, আগের বছরের তুলনায় দাবি নিষ্পত্তির হারও কমেছে। ২০২৪ সালে নন–লাইফ বীমা খাতে প্রায় ১ হাজার ২৩৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা দাবি নিষ্পত্তি করা হয়েছিল, যা মোট দাবির প্রায় ৩২ শতাংশ।

রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের (এসবিসি) কাছেই সবচেয়ে বেশি দাবি জমা হয়েছে। আলোচ্য সময়ে প্রতিষ্ঠানটির কাছে ২ হাজার ২৬৩ কোটি ৮২ লাখ টাকার দাবি উত্থাপিত হয়। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ৭৭ কোটি ১৯ লাখ টাকা, যা মোট দাবির ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ।

বর্তমানে দেশে মোট ৪৬টি নন–লাইফ বীমা কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

আইডিআরএ’র তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিভিন্ন কোম্পানির দাবি নিষ্পত্তির হারে বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। কিছু কোম্পানি তুলনামূলক ভালো পারফরম্যান্স করলেও অনেক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে দাবি নিষ্পত্তির হার খুবই কম। অগ্রণী ইন্স্যুরেন্স ৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকার দাবির বিপরীতে মাত্র ৪৫ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে। এশিয়া ইন্স্যুরেন্স ২৭ কোটি ১১ লাখ টাকার দাবির বিপরীতে ১০ কোটি ৯৪ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে।

এশিয়া প্যাসিফিক জেনারেল ইন্স্যুরেন্স ৯ কোটি ৪২ লাখ টাকার দাবির বিপরীতে প্রায় ৩ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ কোঅপারেটিভ ইন্স্যুরেন্স ৭ কোটি ২২ লাখ টাকার দাবির বিপরীতে মাত্র ৫ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে, যা মোট দাবির ১ শতাংশেরও কম।

তবে কয়েকটি কোম্পানি তুলনামূলক ভালো হারে দাবি নিষ্পত্তি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স, ইসলামী কমার্শিয়াল ইন্স্যুরেন্স, জনতা ইন্স্যুরেন্স, সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স ও ফেডারেল ইন্স্যুরেন্স।

খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অনিষ্পন্ন দাবি বাড়তে থাকায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ নজরদারি আরও জোরদার করতে পারে। এ ক্ষেত্রে দাবি নিষ্পত্তির সময়সীমা কঠোর করা, কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা পর্যবেক্ষণ বাড়ানো এবং নিয়ম না মানলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিপুল পরিমাণ বকেয়া দাবি বীমা খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সময়মতো দাবি পরিশোধ না হলে গ্রাহকের মধ্যে বীমা সম্পর্কে অনাস্থা তৈরি হতে পারে। এতে দীর্ঘমেয়াদে দেশের বীমা শিল্পের প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দাবি নিষ্পত্তি দ্রুততর করা এবং করপোরেট গভর্ন্যান্স শক্তিশালী না হলে বীমা খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।

এক নজরে সবগুলো কোম্পানির দাবি পরিশোধের চিত্র

আইডিআরএর তথ্যানুযায়ী, ৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকার মধ্যে অগ্রণী ইন্স্যুরেন্স বীমা দাবি বাবদ পরিশোধ করেছে ৪৫ লাখ টাকা, নিষ্পত্তির হার ৪.৭০ শতাংশ। ২৭ কোটি ১১ লাখ টাকার মধ্যে এশিয়া ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ১০ কোটি ৯৪ লাখ টাকা বা ৪০.৩৫ শতাংশ।

এশিয়া প্যাসিফিক জেনারেল ইন্স্যুরেন্স ৯ কোটি ৪২ লাখ টাকার মধ্যে পরিশোধ করেছে তিন কোটি চার লাখ টাকা বা ৩২.২৭ শতাংশ। ৭ কোটি ২২ লাখ টাকার মধ্যে বাংলাদেশ কোঅপারেটিভ ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ৫ লাখ টাকা, যা মোট দাবির মাত্র ০.৬৯ শতাংশ।

২৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকার মধ্যে বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ১২ কোটি ৩২ লাখ টাকা বা ৪৪.৫৪ শতাংশ। ৪৭ কোটি ১৭ লাখ টাকার মধ্যে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ৬ কোটি ২০ লাখ টাকা বা ১৩.১৪ শতাংশ বীমা দাবি।

২ হাজার ২৬৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা বীমা দাবির মধ্যে বাংলাদেশ সাধারণ বীমা কর্পোরেশন পরিশোধ করেছে ৭৭ কোটি ১৯ লাখ টাকা বা ৩.৪১ শতাংশ।
১০ কোটি ১৯ লাখ টাকার মধ্যে সেন্ট্রাল ইন্স্যুরেন্স বীমা দাবি বাবদ পরিশোধ করেছে ৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা বা ৩৬.৫১ শতাংশ। ৭ কোটি ৯৯ লাখ টাকার মধ্যে সিটি জেনারেল ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা বা ৩১.৭৯ শতাংশ।

কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা বা ৬৫.৪০ শতাংশ। ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ১২ কোটি ৩১ লাখ টাকা বা ৫৫.১০ শতাংশ। দেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ৩৬ লাখ টাকা বা ৩.০৪ শতাংশ। ঢাকা ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা বা ৩১.৪১ শতাংশ।

ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ৭ কোটি ২২ লাখ টাকা বা ১২.৭১ শতাংশ। ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ১৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা বা ৮৭.২২ শতাংশ। এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বা ১১.৯৭ শতাংশ।

ফেডারেল ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ১১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা বা ৭৪.২৮ শতাংশ। গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ১১ কোটি ২২ লাখ টাকা বা ৩.৫৩ শতাংশ। গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ১২ কোটি ৫৬ লাখ টাকা বা ৩.৬৭ শতাংশ।

ইসলামি কমার্শিয়াল ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ২৩ কোটি ৪২ লাখ টাকা বা ৮৮.১৪ শতাংশ। ইসলামি ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ পরিশোধ করেছে ২২ লাখ টাকা বা ০.৭৭ শতাংশ। জনতা ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা বা ৮০.৬৯ শতাংশ।

কর্ণফুলি ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ২ কোটি ৫৬ লাখ টাকা বা ১৫.৩২ শতাংশ। মেঘনা ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ৮৭ লাখ টাকা বা ৪.০২ শতাংশ। মার্কেন্টাইল ইসলামি ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ২৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা বা ২৮.৯৪ শতাংশ।

নিটল ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ৮৬ লাখ টাকা বা ৪০.৯৫ শতাংশ। নর্দার্ন ইসলামি ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা বা ২.৪০ শতাংশ। প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা বা ১২.৩২ শতাংশ।

পিপলস ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ৫২ লাখ টাকা বা ০.৫৯ শতাংশ। ফিনিক্স ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি পরিশোধ করেছে ১৭ কোটি ৯১ লাখ টাকা বা ৬০.৬৩ শতাংশ। পাইওনিয়ার ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ১৭ কোটি ১৮ লাখ টাকা বা ৩১.০৬ শতাংশ।

প্রগতি ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ১৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা বা ৮.৩৭ শতাংশ। প্রাইম ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বা ৩৪.৩৫ শতাংশ। প্রভাতী ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকা বা ১৪.৫৫ শতাংশ।

পূরবী জেনারেল ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ৫ লাখ টাকা বা ০.১৯ শতাংশ। রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ২০ কোটি ৪১ লাখ টাকা বা ১২.৬৭ শতাংশ। রিপাবলিক ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বা ৫.১৭ শতাংশ।

রূপালী ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ৬ কোটি টাকা বা ৪৯.৪৬ শতাংশ। সেনা কল্যাণ ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ১২ কোটি ৫ লাখ টাকা বা ২৫.৬৫ শতাংশ। কদার ইন্স্যুরেন্স কোনো দাবি পরিশোধ করেনি।

সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ৭ কোটি ৫১ লাখ টাকা বা ৮১.৫৪ শতাংশ। সাউথ এশিয়া ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা বা ২৬.০৭ শতাংশ। স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ২৭ লাখ টাকা বা ১.৫৪ শতাংশ।

তাকাফুল ইসলামি ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ৭০ লাখ টাকা বা ২০.৯৫ শতাংশ। ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা বা ৪৬.৮৩ শতাংশ। ইউনাইটেড ইন্স্যুরেন্স পরিশোধ করেছে ১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা বা ৫৪.৫২ শতাংশ বীমা দাবি নিষ্পত্তি করেছে।