ক্ষুদ্রঋণকে ব্যাংকিং কাঠামোয় নিলে প্রান্তিক মানুষ ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ক্ষুদ্রঋণকে ব্যাংকিং কাঠামোয় নিলে প্রান্তিক মানুষ ঝুঁকিতে পড়তে পারে।   ছবি: আরটিএনএন

প্রস্তাবিত ‘ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ ২০২৫’ বাস্তবায়ন হলে দেশের কোটি কোটি প্রান্তিক মানুষ এবং বিদ্যমান ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থার মানবিক কাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে মনে করেন কোস্ট ফাউন্ডেশনসহ নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠন। 

মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) জাতীয় প্রেসক্লাবে কোস্ট ফাউন্ডেশনসহ নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠন ক্ষুদ্রঋণ খাতকে ব্যাংকিং কাঠামোর আওতায় আনার প্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন। 

একটি অবস্থানপত্রে তারা বলেছে, ক্ষুদ্রঋণ শুধু একটি আর্থিক কার্যক্রম নয়; বরং এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির একটি শক্তিশালী সামাজিক উন্নয়ন কাঠামো, যা নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তারা বলছেন, ক্ষুদ্রঋণ শুধু টাকা দেওয়া-নেওয়ার বিষয় নয়; এটি একটি মানুষকেন্দ্রিক উন্নয়ন ব্যবস্থা, যা ঋণ, প্রশিক্ষণ, সামাজিক সংগঠন ও সহায়তার মাধ্যমে মানুষের জীবনমান ও সক্ষমতা একসঙ্গে উন্নত করে।

বর্তমানে দেশে শত শত এনজিওর মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৬৮৩টি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং এ খাতের সঙ্গে যুক্ত সদস্য সংখ্যা ৩ কোটিরও বেশি। 
ক্ষুদ্রঋণ খাতের সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী—সদস্য ২.৭ কোটি, ঋণগ্রহীতা ১.৫৮ কোটিরও বেশি।  এ বিশাল কাঠামোকে তারা দেশের “তৃণমূল অর্থনীতির মেরুদণ্ড” হিসেবে উল্লেখ করেছে।

এদিকে সরকার নতুন অধ্যাদেশে প্রথমবারের মতো দেশে ‘ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের প্রস্তাব অনুযায়ী—বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে লাইসেন্স দেওয়া হবে, ন্যূনতম মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে, ব্যাংক কোম্পানি আইনের আওতায় পরিচালিত এবং সামাজিক ব্যবসার ধারণায় পরিচালনার কথা বলা হয়েছে।  নীতিনির্ধারকদের মতে, এটি ক্ষুদ্রঋণ খাতকে আরও আধুনিক ও সম্প্রসারিত করবে।

এনিয়ে  ক্ষুদ্রঋণ খাতের অনেক প্রতিষ্ঠান ও বিশেষজ্ঞরা এই উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে— ক্ষুদ্রঋণ মূলত উন্নয়নভিত্তিক ও অলাভজনক কাঠামো, ব্যাংকে রূপান্তর হলে এটি মুনাফাকেন্দ্রিক হয়ে পড়তে পারে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সেবায় সীমাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে। 
এর আগে গত চার জানুয়ারি এবিষয়ে দেশের ১৭টি ক্ষুদ্রঋণ সংস্থার পক্ষ থেকে এক যৌথ দেওয়া হয়। বিবৃতিতে তারা বলেছে, প্রস্তাবিত অধ্যাদেশ খাতটির বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এতে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে। 

এছাড়াও তারা কিছু মৌলিক বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, লক্ষ্যচ্যুতি (Mission Drift), আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সামাজিক কার্যক্রমে ভাটা যেমন-শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়নের মতো কার্যক্রম কমে যাওয়া। এবং দুর্যোগে মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন। তাছাড়া বর্তমানে বন্যা বা দুর্যোগে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি সহায়তা দেয়—যা ব্যাংকিং কাঠামোয় সীমিত হতে পারে বলেও মনে করেন তারা। 

অন্যদিকে, ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (CDF) বলছে, প্রস্তাবিত আইনটি ইতিবাচক পদক্ষেপ এবং এটি সামাজিক ব্যবসার ভিত্তিতেই পরিচালিত হবে। 
তাদের মতে, এই ব্যাংক দারিদ্র্য নিরসন, কর্মসংস্থান এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়নে নতুন সুযোগ তৈরি করবে।


তারা ক্ষুদ্রঋণ খাতের সংস্কার চেয়ে কয়েকটি দাবি ও সুপারিশ প্রস্তাব করে বলেন, 


• ক্ষুদ্রঋণের মানবিক কাঠামো বজায় রাখা। 
•  পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (PKSF), MRA, NGO Bureau শক্তিশালী করা। 
• সামাজিক নিরীক্ষা চালু করা।
• অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে নীতি নির্ধারণ। 

ক্ষুদ্রঋণ খাত বাংলাদেশের উন্নয়নের একটি সফল মডেল হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। তবে এটিকে ব্যাংকিং কাঠামোয় রূপান্তরের উদ্যোগ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিতর্কে পরিণত হয়েছে বলে তারা মনে করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, “সঠিক ভারসাম্য” না হলে এই উদ্যোগ উন্নয়নের পরিবর্তে বিদ্যমান সফল ব্যবস্থাকেই দুর্বল করে দিতে পারে।