ইরান, ট্রাম্প, খোমেনি
ইরানের ওপর সম্ভাব্য মার্কিন হামলার হুমকির মধ্যেই তেহরানের রাস্তায় দেয়ালচিত্রের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক পথচারী।   ছবি: সংগৃহীত

আমেরিকার ক্রমাগত সামরিক হামলার হুমকির মুখে নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ইরান। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত এড়াতে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও তেহরান পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, তারা আত্মরক্ষার প্রশ্নে বিন্দুমাত্র ছাড় দেবে না।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি শুক্রবার তুরস্কে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন। প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা থাকলেও সাগরে উত্তেজনার পারদ চড়ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যাকে ‘আরমাডা’ বা বিশাল নৌবহর বলে অভিহিত করেছেন, সেই ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নেতৃত্বে মার্কিন বাহিনী ইরানের জলসীমার কাছাকাছি অবস্থান নিচ্ছে।

আলোচনা নয়, প্রতিরক্ষাই অগ্রাধিকার
ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক শীর্ষ কর্মকর্তারা আলোচনার চেয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতিকেই এখন বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ইরানের সিনিয়র আলোচক কাজেম গারিবাবাদী রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে স্পষ্ট করেছেন, "তেহরানের অগ্রাধিকার এখন আমেরিকার সাথে আলোচনা করা নয়, বরং দেশকে রক্ষা করার জন্য ২০০ শতাংশ প্রস্তুত থাকা।" তিনি উল্লেখ করেন, গত জুনে আলোচনার পরিবেশ তৈরি হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তেই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছিল, তাই এবার আর কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না ইরান।

ড্রোন শক্তিতে বলীয়ান সেনাবাহিনী
যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে বৃহস্পতিবার ইরানি সেনাবাহিনী তাদের বহরে ১,০০০ নতুন ‘স্ট্র্যাটেজিক’ ড্রোন যুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আত্মঘাতী ড্রোন, যুদ্ধবিমান এবং নজরদারি ও সাইবার হামলায় সক্ষম বিশেষ আকাশযান। সেনাপ্রধান আমির হামাতি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, যেকোনো আগ্রাসনের দ্রুত ও কঠোর জবাব দিতে তাদের বাহিনী প্রস্তুত। রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) আগেই সতর্ক করেছে যে, প্রয়োজনে তারা ইসরায়েল এবং এ অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইল হামলা চালাবে।

জনগণের আতঙ্ক মিশ্র প্রতিক্রিয়া
ট্রাম্পের হুমকি নিয়ে ইরানিদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। সরকারের কট্টর সমর্থকরা আয়াতুল্লাহ খামেনির সুরে সুর মিলিয়ে বলছেন, "আমেরিকা কিছুই করতে পারবে না।" তারা মনে করেন, হামলা হলে ইরান মার্কিন ঘাঁটিগুলো মাটির সাথে মিশিয়ে দেবে।

তবে সাধারণ জনগণের মনে কাজ করছে চরম আতঙ্ক। সাম্প্রতিক বিক্ষোভে হাজারো মানুষের মৃত্যু এবং অস্থিরতার রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন যুদ্ধের আশঙ্কায় ভীত তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, "আরেকটি যুদ্ধ মানেই দুই দেশের ধ্বংস। আর এতে আমাদের মতো সাধারণ মানুষই মারা যাবে।"

বেসামরিক প্রস্তুতি ব্ল্যাকআউটের শঙ্কা
যুদ্ধের আশঙ্কায় সীমান্তবর্তী প্রদেশগুলোতে জরুরি পণ্য ও খাদ্য আমদানির বিশেষ ক্ষমতা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তেহরানের মেয়র মাটির নিচে আশ্রয়কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনার কথা জানালেও তা তাৎক্ষণিক কোনো কাজে আসবে না বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ এই প্রজেক্ট শেষ হতে বছর লেগে যাবে।

এদিকে যুদ্ধের ডামাডোলে আবারও ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের আশঙ্কা করছেন সাধারণ মানুষ। গত জানুয়ারি এবং জুনের সংঘাতের সময় যেভাবে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল, নতুন করে সংঘাত শুরু হলে আবারও তেমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইন্টারনেট ফিরলেও এখনও অনেক জায়গায় সংযোগে বিঘ্ন ঘটছে, আর যারা অনলাইনে আসতে পারছেন, তারা দেখছেন কেবল ধ্বংস আর মৃত্যুর ছবি।

সূত্র : আল জাজিরা

আরটিএনএন/এআই