বেলুচিস্তান, বিচ্ছিন্নতাবাদী, পাকিস্তান
বেলুচিস্তানে হামলার জবাবে নিরাপত্তা বাহিনীর পরিচালিত অভিযানে অন্তত ১৪৫ জন সশস্ত্র বিদ্রোহী নিহত হয়েছে   ছবি: সংগৃহীত

পাকিস্তানের অস্থির প্রদেশ বেলুচিস্তানে সমন্বিত বন্দুক ও বোমা হামলার জবাবে নিরাপত্তা বাহিনীর পরিচালিত অভিযানে অন্তত ১৪৫ জন সশস্ত্র বিদ্রোহী নিহত হয়েছে। গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া ওই সিরিজ হামলায় নিরাপত্তা বাহিনীর ১৭ সদস্য ও ৫ নারীসহ প্রায় ৫০ জন প্রাণ হারান।

অভিযানের বিস্তারিত হতাহত

রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বেলুচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী সরফরাজ বুগতি জানান, গত দুই দশকের মধ্যে এটিই বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সামরিক সাফল্য। তিনি বলেন, “নিহত ১৪৫ সন্ত্রাসীর মরদেহ আমাদের হেফাজতে রয়েছে, যাদের মধ্যে কয়েকজন আফগান নাগরিকও আছে।”

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর তথ্যমতে, শুক্রবার ৪১ জন এবং শনিবার ৯২ জন বিদ্রোহী নিহত হয়। মুখ্যমন্ত্রী বুগতি বিদ্রোহীদের ‘ফিতনা আল-হিন্দুস্তান’ (বিএলএ-র সরকারি তকমা) হিসেবে অভিহিত করে দাবি করেন, ভারতীয় মদতপুষ্ট এই সন্ত্রাসীরা জিম্মি নাটক সাজাতে চেয়েছিল কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতায় তা ব্যর্থ হয়।

কঠোর নিরাপত্তা বিধিনিষেধ

নিষিদ্ধ ঘোষিত বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। হামলার পর পুরো প্রদেশে কয়েক মাসের জন্য কঠোর নিরাপত্তা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এর আওতায় জনসমাগম, বিক্ষোভ এবং যান চলাচলে সীমাবদ্ধতা আনা হয়েছে। ডন পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, জনসমক্ষে মুখ ঢেকে রাখা বা মুখোশ পরাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক টানাপোড়েন

পাকিস্তান সরকার এই হামলার পেছনে ভারত ও আফগানিস্তানের মদত রয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে। তবে নয়াদিল্লি ও কাবুল উভয়ই এই অভিযোগ কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, “পাকিস্তানের এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকে দৃষ্টি সরাতেই তারা এমনটা করছে।” তিনি ইসলামাবাদকে আঞ্চলিক মানুষের দীর্ঘদিনের দাবিগুলো পূরণের পরামর্শ দেন।

হামলার ধরন প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা

আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদ্রোহীরা কোয়েটা, গোয়াদর, মাস্তুং এবং নশকি জেলাসহ অন্তত ১২টি স্থানে একযোগে হামলা চালায়। তারা নিরাপত্তা চৌকি ও ফ্রন্টিয়ার কোর সদর দপ্তর লক্ষ্য করে গুলি বর্ষণ করে এবং আত্মঘাতী হামলার চেষ্টা চালায়।

পাকিস্তানের কনিষ্ঠ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তালাল চৌধুরী জানান, হামলাকারীরা সাধারণ বেসামরিক পোশাকে হাসপাতাল, স্কুল এবং বাজারে ঢুকে পড়ে নির্বিচারে গুলি চালায়। এমনকি তারা সাধারণ মানুষকে ‘হিউম্যান শিল্ড’ বা মানবঢাল হিসেবেও ব্যবহার করেছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ জানান, অন্তত দুটি হামলায় নারী যোদ্ধারা অংশ নিয়েছিল।

বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া

যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন চার্জ ডি'অ্যাফেয়ার্স নাটালি বেকার একে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে অভিহিত করে পাকিস্তানের পাশে থাকার ঘোষণা দেন। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র বিএলএ-কে একটি বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।

প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা বেলুচিস্তানে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে এই সশস্ত্র বিদ্রোহ চলছে। বিএলএ নিয়মিতভাবে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী এবং সেখানে কর্মরত চীনা নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আসছে।

 

সূত্র : আল জাজিরা

আরটিএনএন/এআই