ইরান, ট্রাম্প, খোমেনি
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই   ছবি: সংগৃহীত

ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু আলোচনা পুনরায় শুরুর রূপরেখা তৈরিতে তারা অগ্রগতির আশা করছে। এদিকে অসমর্থিত কিছু প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, দেশটির প্রেসিডেন্ট এই আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। সোমবার তেহরান জানায়, ওয়াশিংটনের সঙ্গে উত্তেজনা কমাতে আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রস্তাবিত বেশ কয়েকটি কূটনৈতিক প্রক্রিয়া তারা খতিয়ে দেখছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই আলোচনার একটি কাঠামো দাঁড়াবে বলে তারা আশাবাদী। এই ঘোষণা এমন সময়ে এল, যখন তেহরান ও ওয়াশিংটন উভয়েই সামরিক সংঘাতের হুমকি থেকে সরে আসছে বলে মনে হচ্ছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইরানি ও মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে জানিয়েছে, আগামী শুক্রবার ইস্তাম্বুলে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আলোচনা হতে পারে। এতে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি অংশ নেবেন। এএফপিও একজন আঞ্চলিক কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, কাতার, তুরস্ক, মিশর ও ওমানের মধ্যস্থতায় শুক্রবার তুরস্কে একটি ‘সম্ভাব্য বৈঠক’ হওয়ার কথা রয়েছে।

গত জানুয়ারিতে ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভে সহিংস দমন-পীড়নের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছিলেন। তবে পরবর্তীতে তিনি ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরুর আহ্বান জানান। উল্লেখ্য, গত জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালালে সেই আলোচনা ভেস্তে গিয়েছিল।

গত রোববার ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে কথা বলছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এখন নিশ্চিত করেছেন যে পরোক্ষ আলোচনা চলছে। তিনি বলেন, ‘আর্থিক ও বিস্তারিত বিষয় না জানালেও আঞ্চলিক দেশগুলো বার্তা আদান-প্রদানে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বেশ কিছু বিষয় উত্থাপিত হয়েছে এবং আমরা কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপের বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চূড়ান্ত করছি। আশা করি, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এটি শেষ হবে।’

ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাকচি সৌদি আরব, মিশর ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে টেলিফোনে সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন। অন্যদিকে ফারস নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান পরমাণু আলোচনা পুনরায় শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন।

ফারস জানায়, ‘ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু ফাইল নিয়ে আলোচনা করবে।’ তবে কোনো নির্দিষ্ট তারিখের কথা তারা উল্লেখ করেনি। সরকারি সংবাদপত্র ‘ইরান’ এবং দৈনিক ‘শার্গ’-এও একই প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ইরানি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, এই প্রেক্ষাপটে আরাকচি ও মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফের বৈঠকের কথা রয়েছে। তবে তেহরান বা ওয়াশিংটন কেউই এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। এদিকে রয়টার্স জানিয়েছে, হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে উইটকফ মঙ্গলবার ইসরায়েলে পৌঁছাবেন এবং সেখানে তিনি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে দেখা করবেন।

পরমাণু চুক্তির দাবি

আলোচনার এই সময়সূচি এমন এক মুহূর্তে সামনে এল যখন ইরান সম্ভাব্য মার্কিন হামলার আশঙ্কায় ছিল। ভারত মহাসাগরে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ও যুদ্ধবিমান অবস্থান করছে, যা যেকোনো মুহূর্তে হামলায় সহায়তা করতে সক্ষম।

জানুয়ারিতে ইরানে অর্থনৈতিক সংকট ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে মুদ্রার মান পড়ে যাওয়ায় সৃষ্ট বিক্ষোভে হাজারো মানুষ নিহত হওয়ার পর ট্রাম্প ইরানকে হুমকি দিয়েছিলেন। সেই বিক্ষোভ সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে ট্রাম্পের সেই হুমকি এখন পরমাণু চুক্তির দাবিতে রূপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন উদ্বিগ্ন যে ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। যদিও তেহরান দাবি করে আসছে, তাদের কর্মসূচি সম্পূর্ণ বেসামরিক।

সোমবার ইরান আলোচনা শুরুর ব্যাপারে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিলেও, জানা গেছে যে যুক্তরাষ্ট্র কিছু শর্ত জুড়ে দিয়েছে। ইরানি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, আলোচনা শুরুর জন্য ট্রাম্প ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন বন্ধ করার শর্ত দিয়েছেন।

অতীতে ইরান পরমাণু ইস্যুতে নমনীয়তা দেখালেও, ক্ষেপণাস্ত্র ও আঞ্চলিক মিত্রদের বিষয়টি দীর্ঘকাল ধরে আলোচনার অযোগ্য বা আপোষহীন হিসেবেই দেখেছে। অর্থনীতি বাঁচাতে ও ভবিষ্যৎ অস্থিরতা ঠেকাতে জরুরিভিত্তিতে নিষেধাজ্ঞার অবসান প্রয়োজন—এমন পরিস্থিতিতে ইরান তাদের অবস্থান পরিবর্তন করবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

গত জুনে ওমানে মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা শুরু হলেও ইসরায়েলের হামলা এবং পরবর্তীতে ইরানি পরমাণু স্থাপনায় মার্কিন বোমা বর্ষণের পর সেই প্রক্রিয়া থমকে যায়।

রোববার ট্রাম্প বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘গভীরভাবে আলোচনা’ করছে। তবে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘আমাদের বিশাল ও শক্তিশালী জাহাজগুলো সেই দিকেই যাচ্ছে।’ অন্যদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিও কড়া ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন, কোনো হামলা হলে তা ‘আঞ্চলিক যুদ্ধে’ রূপ নেবে।

সূত্র : আল জাজিরা

আরটিএনএন/এআই