ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভেনেজুয়েলা, গুস্তাভো পেত্রো
অপহরণের পর, ট্রাম্পই কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে হোয়াইট হাউসে স্বাগত জানালেন!   ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘদিন ধরে তাকে ‘অসুস্থ মানুষ’ এবং ‘অবৈধ মাদক নেতা’ বলে আক্রমণ করে এসেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু মঙ্গলবার সেই ট্রাম্পই কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে হোয়াইট হাউসে স্বাগত জানালেন। ওয়াশিংটন ডিসিতে এটিই ছিল দুই নেতার প্রথম সরাসরি বৈঠক। উভয় নেতাই বৈঠকটিকে ফলপ্রসূ বলে উল্লেখ করেছেন, যদিও তাদের মধ্যে থাকা দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য তারা স্বীকার করে নিয়েছেন।

বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে পেত্রো ট্রাম্পের সঙ্গে তার তিক্ত অতীত সম্পর্কে করা প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যান। অতীতে তিনি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছিলেন। এর বদলে তিনি বৈঠকটিকে ‘‘ভিন্ন চিন্তাধারার দুই সমমর্যাদার নেতার সাক্ষাৎ’’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

পেত্রো বলেন, ‘‘তিনি (ট্রাম্প) তার চিন্তাধারা বদলাননি। আমিও বদলাইনি। কিন্তু কীভাবে একটি চুক্তি বা সমঝোতা হয়? এটি যমজ ভাইদের মধ্যে হয় না। এটি হয় প্রতিপক্ষের মধ্যে।’’ অন্যদিকে, ওভাল অফিস থেকে সাংবাদিকদের ট্রাম্প জানান, বৈঠকটি নিয়ে তিনি বেশ ইতিবাচক। তিনি বলেন, ‘‘আমার মনে হয়েছে এটি দারুণ ছিল।’’ বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে আন্তর্জাতিক মাদক পাচার রোধ এবং ল্যাটিন আমেরিকার নিরাপত্তা ইস্যু প্রাধান্য পেয়েছে।

হোয়াইট হাউসের সৌজন্যতা প্রদর্শন
গত এক বছরে ট্রাম্প বিদেশী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের সময় প্রায়ই গণমাধ্যমকে উপস্থিত থাকার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং ওভাল অফিসে যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেছেন। তবে এবার তা হয়নি। ট্রাম্প ও পেত্রোর বৈঠকটি প্রায় দুই ঘণ্টা স্থায়ী হলেও তা ছিল সম্পূর্ণ রুদ্ধদ্বার।

তবে বৈঠক শেষে উভয় নেতাই একে অপরের সম্পর্কে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পেত্রো জানান, ট্রাম্প তাকে বেশ কিছু উপহার দিয়েছেন। এর মধ্যে তাদের বৈঠকের একটি স্মারক ছবিও রয়েছে, যার সঙ্গে ট্রাম্পের স্বাক্ষর করা একটি নোট ছিল। নোটে লেখা ছিল: ‘‘গুস্তাভো – এটি একটি বড় সম্মান। আমি কলম্বিয়াকে ভালোবাসি।’’

আরেকটি পোস্টে পেত্রো ট্রাম্পের লেখা বই ‘দ্য আর্ট অফ দ্য ডিল’-এর একটি স্বাক্ষর করা কপি দেখান। বইয়ের টাইটেল পেজে ট্রাম্প পেত্রোর উদ্দেশে লিখেছেন: ‘‘আপনি দারুণ।’’ স্প্যানিশ ভাষায় কৌতুক করে পেত্রো লেখেন, ‘‘কেউ কি আমাকে বলতে পারবেন ট্রাম্প এই উৎসর্গনামায় কী লিখেছেন? আমি ইংরেজি খুব একটা বুঝি না।’’

সম্পর্কের মোড় ঘুরছে?
পেত্রোর এই কৌতুকটি মূলত ট্রাম্পের সঙ্গে তার কুখ্যাত তিক্ত সম্পর্কের দিকেই ইঙ্গিত করে। ২০২৫ সালের ২৬ জানুয়ারি, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের মাত্র ষষ্ঠ দিনে এই দুই নেতার বিরোধ শুরু হয়। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ডিপোর্টেশন ফ্লাইট বা নির্বাসন ফ্লাইট গ্রহণ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তারা একে অপরকে হুমকি দিয়েছিলেন।

পেত্রো নির্বাসিতদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে আপত্তি জানিয়েছিলেন। অন্যদিকে, ফ্লাইট গ্রহণে পেত্রোর অস্বীকৃতিকে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ‘‘জাতীয় নিরাপত্তার’’ জন্য হুমকি হিসেবে দেখেন। শেষ পর্যন্ত কলম্বিয়ার আমদানিকৃত পণ্যের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিলে পেত্রো পিছু হটেন।

এরপর থেকে তারা একে অপরকে ক্রমাগত আক্রমণ করে আসছিলেন। পেত্রো ক্যারিবিয়ান সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন বাহিনীর প্রাণঘাতী হামলার নিন্দা জানিয়েছিলেন এবং ভেনিজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণে মার্কিন সামরিক অভিযানের সমালোচনা করেছিলেন।

অন্যদিকে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে পেত্রো যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করায় এবং ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভে অংশ নেওয়ায় ট্রাম্প তার ভিসা বাতিল করেছিলেন। এছাড়া অক্টোবর মাসে ট্রাম্প প্রশাসন পেত্রোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তাকে ‘‘মাদক কারবারিদের প্রশ্রয় দেওয়ার’’ জন্য দায়ী করেছিল।

গত ৩ জানুয়ারি মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ট্রাম্প পেত্রোকে সতর্ক করে বলেছিলেন, তার ‘‘নিজের দিকে খেয়াল রাখা উচিত’’। এটি কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি হিসেবেই দেখা হয়েছিল। তবে গত মাসে তাদের সম্পর্কে পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। ৭ জানুয়ারি দুই নেতা প্রথমবারের মতো ফোনে কথা বলেন এবং মঙ্গলবারের সরাসরি বৈঠকটি তাদের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।

মতপার্থক্যে ঐকমত্য
উত্তেজনা কমলেও বৈঠক শেষে উভয় নেতাই তাদের মতপার্থক্যগুলো পুনরায় তুলে ধরেন। ওভাল অফিসে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ‘‘তিনি (পেত্রো) এবং আমি ঠিক পরম বন্ধু ছিলাম না, কিন্তু আমি অপমানিত বোধ করিনি কারণ তার সঙ্গে আমার কখনো দেখা হয়নি।’’

তিনি যোগ করেন, ‘‘আমি তাকে একদমই চিনতাম না, কিন্তু আমাদের বোঝাপড়া খুব ভালো হয়েছে।’’ অন্যদিকে, ওয়াশিংটনে কলম্বিয়ার দূতাবাসে এক দীর্ঘ সংবাদ সম্মেলনে পেত্রো ট্রাম্পের সঙ্গে তার কিছু অমিলের কথা তুলে ধরেন। তিনি গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং টেকসই জ্বালানি উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন, যা ট্রাম্প অতীতে ‘‘ধাপ্পাবাজি’’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।

কলম্বিয়ার প্রথম বামপন্থী এই নেতা ল্যাটিন আমেরিকার ওপর ঔপনিবেশিকতা ও বিদেশী হস্তক্ষেপের সমালোচনা করে বলেন, ‘‘আমরা ব্ল্যাকমেইলের নিচে কাজ করি না।’’ এটি স্পষ্টতই ট্রাম্পের চাপ প্রয়োগের নীতির দিকে ইঙ্গিত ছিল।

মাদক পাচার রোধে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি
মাদক পাচার রোধ নিয়ে পেত্রোর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অন্যতম বিরোধের জায়গা। কলম্বিয়া বিশ্বের বৃহত্তম কোকেন উৎপাদনকারী দেশ, যা বৈশ্বিক সরবরাহের ৬৮ শতাংশের জন্য দায়ী। ট্রাম্প প্রশাসন আন্তর্জাতিক মাদক পাচার রোধের অজুহাতে সামরিক হামলা চালিয়ে আসছে। অন্যদিকে, পেত্রো মাদকের বিরুদ্ধে তার সরকারের ঐতিহাসিক অভিযানগুলোকে তুলে ধরেছেন।

পেত্রো বলেন, কোকেনের কাঁচামাল কোকা চাষ ধ্বংস করতে সামরিকীকরণের বদলে তিনি স্বেচ্ছায় নির্মূল কর্মসূচিতে বেশি সাফল্য পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘হাজার হাজার কৃষক নিজেরাই এই গাছ উপড়ে ফেলছে।’’ তিনি ট্রাম্পকে বলেছেন, ‘‘যদি মাদক পাচার রোধে আপনি মিত্র চান, তবে বড় বড় পাচারকারীদের ধরতে হবে, দরিদ্র কৃষকদের নয়।’’

ট্রাম্পীয় আচরণ
মঙ্গলবারের বৈঠকটি ট্রাম্পের জন্য আবারও একটি বড় ইউ-টার্ন হিসেবে চিহ্নিত হলো। বিশ্বনেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক বদলানোর তার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। গত বছর তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সঙ্গেও প্রকাশ্য বিবাদে জড়িয়েছিলেন, কিন্তু পরে সুর নরম করেছিলেন।

কলম্বিয়ায় আগামী মে মাসে গুরুত্বপূর্ণ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। পেত্রো আইন অনুযায়ী পরপর দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না। তবে ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্পের সঙ্গে এই বৈঠক পেত্রোর বামপন্থী জোটকে নির্বাচনের আগে মার্কিন নিন্দা এড়াতে সাহায্য করবে।

পেত্রো ট্রাম্পের সঙ্গে তার মতপার্থক্য স্বীকার করলেও কিছু বিষয়ে মিলও খুঁজে পেয়েছেন। ট্রাম্পের মতো তিনিও বৈশ্বিক নিরাপত্তা রক্ষায় জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

তবে ট্রাম্পের বিখ্যাত ‘‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’’ স্লোগানযুক্ত ক্যাপ পরার ক্ষেত্রে পেত্রো নিজস্বতার ছাপ রেখেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি ক্যাপের স্লোগানে একটি আঁকাবাঁকা ‘S’ যুক্ত করে লিখেছেন: ‘‘মেক আমেরিকাস (Americas) গ্রেট এগেইন’’—যা পুরো পশ্চিম গোলার্ধকে অন্তর্ভুক্ত করার ইঙ্গিত দেয়।

সূত্র : আল জাজিরা

আরটিএনএন/এআই