ভারত
যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে গুরপতবন্ত সিং পান্নুনকে হত্যা।   ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে বসবাসরত মার্কিন নাগরিক খালিস্তানি আন্দোলনের নেতা গুরপতবন্ত সিং পান্নুন’কে হত্যার ষড়যন্ত্রের দায়ে ভারতীয় নাগরিক নিখিল গুপ্ত দোষ স্বীকার করেছেন। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি (শুক্রবার) ম্যানহাটনের একটি ফেডারেল আদালতে উপস্থিত হয়ে তিনি তিনটি গুরুতর অপরাধের কথা স্বীকার করেন ভারতীয় এই নাগরিক।

মার্কিন বিচার বিভাগ জানিয়েছে, ৫৪ বছর বয়সী নিখিল গুপ্ত গত বৃহস্পতিবার ভাড়াটে খুনি নিয়োগ, খুনের ষড়যন্ত্র এবং অর্থ পাচারের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ স্বীকার করেছেন।

ম্যানহাটানের একটি ফেডারেল আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে আগামী ২৯ মে অভিযুক্তের সাজা ঘোষণা করা হতে পারে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার সর্বোচ্চ ৪০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন আদালত।

মার্কিন প্রসিকিউটরদের দাবি, নিখিল গুপ্ত ভারত সরকারের এক কর্মকর্তার নির্দেশে নিউইয়র্কভিত্তিক শিখ রাজনৈতিক কর্মীকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন। আদালতের নথিতে সরাসরি নাম উল্লেখ না থাকলেও টার্গেট যে গুরপতবন্ত ছিলেন, তা স্পষ্ট করা হয়েছে। গুরপতবন্ত খালিস্তানপন্থী আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ এবং নেতা ছিলেন।

ভারত সরকার গুরপতবন্তকে ভারতের প্রধান সন্ত্রাসবিরোধী আইন ইউএপিএ-এর অধীনে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে এবং তার সংগঠনকেও ভারতে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।

ভারতের অভিযোগ, তিনি ‘খালিস্তান’ রাষ্ট্র গঠনের নামে বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সহিংসতা উসকে দিচ্ছেন।

যেভাবে সাজানো হয়েছিল হত্যার ছক:

মার্কিন কৌঁসুলিদের অভিযোগ ও মামলার নথি অনুযায়ী, এই হত্যা ষড়যন্ত্রের মূল সূত্রপাত হয় ২০২৩ সালে। অভিযোগ রয়েছে, বিকাশ যাদব নামের জনৈক ব্যক্তি নিখিল গুপ্তকে এই কাজের জন্য নিয়োগ করেছিলেন। বিকাশ যাদব সে সময় ভারতের মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যেখান থেকে দেশটির বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর কার্যক্রম পরিচালিত হয়। যাদবের নির্দেশেই যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে গুরপতবন্ত সিং পান্নুনকে হত্যার জন্য ভাড়াটে খুনি (হিটম্যান) খোঁজার কাজ শুরু করেন নিখিল।

ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে নিখিল গুপ্ত যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, তাদের তিনি 'ভাড়াটে খুনি' মনে করলেও তারা আসলে ছিলেন মার্কিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোপন সোর্স। ফলে নিখিলের প্রতিটি পদক্ষেপ শুরু থেকেই গোয়েন্দাদের নজরদারিতে ছিল।

তদন্তকারীদের দাবি অনুযায়ী, পান্নুনকে হত্যার জন্য ১ লাখ মার্কিন ডলারের একটি চুক্তি চূড়ান্ত করা হয়। এই চুক্তির অংশ হিসেবে ১৫ হাজার ডলার অগ্রিম হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া পান্নুনের বাড়ির ঠিকানা, ফোন নম্বর এবং ব্যক্তিগত গতিবিধির যাবতীয় তথ্য নিখিল গুপ্তই সরবরাহ করেছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালেও মার্কিন ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এবং ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন -এর অত্যন্ত গোপনীয় ও যৌথ অভিযানের ফলে এই ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয়ে যায়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড এড়ানো সম্ভব হয়।

মোদির সফর:

মার্কিন বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নিখিল গুপ্ত ছদ্মবেশী এক কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন ২০২৩ সালের জুনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় এই হত্যাকাণ্ড না ঘটে। তবে একই মাসে কানাডায় শিখ নেতা হরদীপ সিং নির্ঝর নিহত হওয়ার পর নিখিল গুপ্ত আর অপেক্ষা না করার ইঙ্গিত দেন। ২০২৩ সালের জুনে চেক প্রজাতন্ত্রে নিখিল গুপ্ত গ্রেপ্তার হন এবং ২০২৪ সালে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করা হয়।

ভারত-মার্কিন কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপড়েন:

পান্নুন হত্যাচেষ্টার এই মামলাটি ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে এই ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উত্থাপন করার পর, বিষয়টি তদন্তে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে নয়াদিল্লি। ভারত সরকার জানিয়েছে যে তারা মার্কিন অভিযোগগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে; তবে এই ষড়যন্ত্রে সরকারি কোনো পর্যায়ের সরাসরি সম্পৃক্ততার দাবি শুরু থেকেই প্রত্যাখ্যান করে আসছে ভারত।