মেক্সিকো, মাদক সম্রাট, জালিস্কো, এল মেনচো
মাদক সম্রাটকে হত্যা করেছে মেক্সিকোর নিরাপত্তা বাহিনী, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমাঞ্চলীয় বেশ কিছু এলাকায় সহিংসতার ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে   ছবি: সংগৃহীত

মেক্সিকোর অন্যতম শক্তিশালী অপরাধী সংগঠনের প্রধান, এক মাদক সম্রাটকে হত্যা করেছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমাঞ্চলীয় জালিস্কো প্রদেশসহ বেশ কিছু এলাকায় সহিংসতার ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে। মেক্সিকোর প্রতিরক্ষা সচিবালয় জানিয়েছে, নেমেসিও রুবেন ওসেগুয়েরা সার্ভান্তেস—যিনি "এল মেনচো" নামে পরিচিত—রবিবার জালিস্কো রাজ্যের তাপালপা শহরে সৈন্যদের সঙ্গে সংঘর্ষে আহত হন। পরে মেক্সিকো সিটিতে নিয়ে যাওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। যুক্তরাষ্ট্র তার মাথার ওপর ১৫ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছিল।

এই অভিযানের জেরে জালিস্কো, কোলিমা, মিচোয়াকান, নায়ারিত, গুয়ানাজুয়াতো এবং তামাউলিপাসসহ ছয়টিরও বেশি রাজ্যে সহিংসতার আগুন জ্বলে ওঠে। বন্দুকধারীরা গাড়ি জ্বালিয়ে দেয় এবং মহাসড়ক অবরোধ করে। জালিস্কোর রাজধানী গুয়াদালাজারা—যেখানে আসন্ন ফিফা বিশ্বকাপের বেশ কয়েকটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে—রবিবার রাতে ভুতুড়ে শহরে পরিণত হয়। আতঙ্কে সাধারণ মানুষ ঘরবন্দী হয়ে পড়ে।

সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, গুয়াদালাজারা বিমানবন্দরে মানুষ ভয়ে ছুটোছুটি করছে এবং পর্যটন শহর পুয়ের্তো ভালার্তার আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়ছে। জালিস্কোর গভর্নর পাবলো লেমুস বাসিন্দাদের বাড়িতে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন এবং গণপরিবহন বন্ধ করে দিয়েছেন। সোমবার কয়েকটি রাজ্যে স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শেনবাম এক্সে (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রশংসা করেছেন এবং শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি লেখেন, "সব রাজ্যের সরকারের সঙ্গে আমাদের পূর্ণ সমন্বয় রয়েছে। জাতীয় ভূখণ্ডের অধিকাংশ জায়গায় কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবে চলছে।"

‘মেক্সিকোর জন্য বড় সাফল্য’

সিনালোয়া কার্টেলের প্রতিষ্ঠাতা হুয়াকিন "এল চাপো" গুজম্যান এবং ইসমায়েল জাম্বাদাকে আটকের পর ৫৯ বছর বয়সী ওসেগুয়েরাই হলেন মেক্সিকোর অন্যতম শীর্ষ মাদক সম্রাট, যাকে ধরাশায়ী করা হলো। এল চাপো এবং জাম্বাদা বর্তমানে মার্কিন হেফাজতে রয়েছেন।

মেক্সিকোর প্রতিরক্ষা সচিবালয় জানিয়েছে, মার্কিন কর্তৃপক্ষের "সহায়ক তথ্যের" ভিত্তিতে রবিবার এই অভিযান চালানো হয়। এতে ওসেগুয়েরার 'জালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেল' (CJNG)-এর চার সদস্য নিহত হয় এবং মেক্সিকো সিটিতে স্থানান্তরের সময় আরও দুজনের মৃত্যু হয়। দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং সাঁজোয়া যান, রকেট লঞ্চার ও অন্যান্য অস্ত্র জব্দ করা হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনীর তিন সদস্য আহত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রসচিব ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউ এই অভিযানকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং ওসেগুয়েরাকে "অন্যতম রক্তপিপাসু ও নির্মম মাদক সম্রাট" বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, "এটি মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র, লাতিন আমেরিকা এবং বিশ্বের জন্য একটি বড় অগ্রগতি।"

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জালিস্কো, তামাউলিপাস, মিচোয়াকান, গুয়েরেরো এবং নুয়েভো লিওন রাজ্যে অবস্থানরত মার্কিনিদের নিরাপদ স্থানে থাকার সতর্কবার্তা দিয়েছে। কানাডাও জালিস্কো, গুয়েরেরো এবং মিচোয়াকানে "নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের" কথা উল্লেখ করে ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে। পুয়ের্তো ভালার্তায় থাকা নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে এবং জালিস্কোতে সতর্কভাবে চলাফেরা করতে বলা হয়েছে।

এয়ার কানাডা "চলমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির" কারণে পুয়ের্তো ভালার্তায় ফ্লাইট স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে এবং যাত্রীদের বিমানবন্দরে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স এবং আমেরিকান এয়ারলাইন্সও পুয়ের্তো ভালার্তা ও গুয়াদালাজারায় ফ্লাইট বাতিলের কথা জানিয়েছে।

ওসেগুয়েরার বিরুদ্ধে এই সামরিক অভিযানটি মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের চাপের ফল। ট্রাম্প প্রশাসন শেনবাম সরকারকে মাদক পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিল, এমনকি মেক্সিকোতে সরাসরি হস্তক্ষেপের হুমকিও দিয়েছিল।

সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা এবং অ্যাভোকাডো চাষি ওসেগুয়েরা ২০০৭ সালের দিকে সিজেএনজি কার্টেল সহ-প্রতিষ্ঠা করেন। এফবিআই-এর মতে, তিনি এটিকে মেক্সিকোর সবচেয়ে শক্তিশালী পাচারকারী সংগঠনে পরিণত করেন, যা যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন, হেরোইন, মেথামফেটামিন এবং ফেন্টানাইল পাচারের বড় অংশের জন্য দায়ী। তিনি সারা দেশে নিজেকে রহস্যময় করে রেখেছিলেন এবং এতটাই নিভৃতে থাকতেন যে তার সব ছবিই ছিল দশকের পুরনো।

মেক্সিকো সিটি থেকে আল জাজিরার জন হলম্যান জানান, ওসেগুয়েরা ছিলেন সিজেএনজি-এর "অবিসংবাদিত প্রধান" এবং "মেক্সিকোর সবচেয়ে শক্তিশালী মাদক সম্রাট যিনি মুক্ত ছিলেন।" তিনি এই হত্যাকাণ্ডকে শেনবাম সরকারের জন্য "বিজয়" বললেও সতর্ক করেছেন যে এটি মেক্সিকো জুড়ে সহিংসতার ঢেউ বইয়ে দিতে পারে।

হলম্যান বলেন, "ওসেগুয়েরার কোনো স্পষ্ট উত্তরসূরি নেই। তার ভাই মার্কিন কারাগারে, ছেলে 'এল মেনচিতো' এবং মেয়েও কারাগারে। এখন আমরা দেখতে পারি কার্টেলের বিভিন্ন আঞ্চলিক বসরা ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছে। এল চাপো গ্রেপ্তারের পর সিনালোয়া কার্টেলের বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল।"

আমাদের সংবাদদাতা উল্লেখ করেন, মেক্সিকো ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজন করতে যাচ্ছে এবং গুয়াদালাজারা একটি স্বাগতিক শহর—তাই এই সময়টি বিশেষভাবে সংবেদনশীল। তিনি বলেন, "তাই আজ যা সরকারের বিজয় বলে মনে হচ্ছে, তা আগামী মাসগুলোতে বড় নিরাপত্তা সংকটে রূপ নিতে পারে।"

বিশ্লেষকরা বলছেন, সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে মেক্সিকোর সেনাবাহিনীকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। মার্কিন ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সাবেক আন্তর্জাতিক অপারেশন প্রধান মাইক ভিজিল বলেন, "কার্টেল প্রধানকে হত্যা বা আটক করলে খুব একটা প্রভাব পড়ে না। তাদের অবকাঠামো, লজিস্টিক, মানি লন্ডারিং এবং সশস্ত্র শাখাগুলোর ওপর আঘাত হানতে হবে।"

তিনি আরও বলেন, "গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সরাসরি হামলা চালিয়ে এই কার্টেলের অবকাঠামো দুর্বল করে দিতে হবে। আর এটা দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে করতে হবে, নইলে সহিংসতার চরম মূল্য দিতে হবে।" ভিজিল বলেন, মেক্সিকোকে চাপ দিলেও ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের নিজের সমস্যাগুলো সমাধানে খুব কমই কাজ করেছে।

সূত্র : আল জাজিরা

আরটিএনএন/এআই