ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু আলোচনায় "উৎসাহজনক ইঙ্গিত" পাওয়া গেছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, আগামী বৃহস্পতিবার নির্ধারিত পরবর্তী আলোচনার আগে তেহরান যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রয়েছে। সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা যখন বাড়ছে, ঠিক তখনই রবিবার পেজেশকিয়ান এই মন্তব্য করলেন। একদিকে ওয়াশিংটন উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো চুক্তি না হলে তাদের "খুবই খারাপ পরিণতির" মুখোমুখি হতে হবে।
পেজেশকিয়ান এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, "ইরান এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।" তিনি বলেন, "সাম্প্রতিক আলোচনায় বাস্তবসম্মত প্রস্তাব বিনিময় হয়েছে এবং উৎসাহজনক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবুও আমরা যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি এবং সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি।"
এই সতর্ক আশাবাদ তখনই প্রকাশ পেল যখন ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল বুসাইদি নিশ্চিত করলেন যে সুইজারল্যান্ডে দুই পক্ষের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনার তৃতীয় রাউন্ড অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করা আল বুসাইদি বলেন, "আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা এখন এই বৃহস্পতিবার জেনেভায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। চুক্তি চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে বাড়তি কিছু করার জন্য ইতিবাচক তাগিদ রয়েছে।"
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র চলতি মাসের শুরুতে ওমানে পরোক্ষভাবে আলোচনা শুরু করে এবং গত সপ্তাহে জেনেভায় দ্বিতীয় দফায় বৈঠকে বসে। উভয় পক্ষ আলোচনাকে সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক বললেও কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জনে ব্যর্থ হয়। ওয়াশিংটনের পক্ষে পরমাণু আলোচনার নেতৃত্ব দেওয়া ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ শনিবার বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানতে আগ্রহী যে কেন ইরান এখনও "আত্মসমর্পণ" করেনি এবং তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে রাজি হয়নি।
ফক্স নিউজের 'মাই ভিউ উইথ লারা ট্রাম্প' অনুষ্ঠানে উইটকফ বলেন, "আমি 'হতাশ' শব্দটি ব্যবহার করতে চাই না, কারণ তিনি [ট্রাম্প] বোঝেন তার হাতে অনেক বিকল্প আছে। কিন্তু তিনি জানতে চান তারা কেন... আমি 'আত্মসমর্পণ' শব্দটি ব্যবহার করতে চাই না, কিন্তু তারা কেন আত্মসমর্পণ করেনি।"
তিনি প্রশ্ন রাখেন, "এত চাপের মুখে, ওখানে এত বিপুল নৌবাহিনী ও সমুদ্র শক্তি থাকার পরও, তারা কেন আমাদের কাছে এসে বলেনি—'আমরা ঘোষণা করছি যে আমরা অস্ত্র চাই না, তাই আমরা এই করতে প্রস্তুত'? অথচ তাদের সেই জায়গায় আনাটা বেশ কঠিন মনে হচ্ছে।" মার্কিন গণমাধ্যমের মতে, ২০০৩ সালে ইরাক আগ্রাসনের পর এই প্রথম ওয়াশিংটন ওই অঞ্চলে এত বিপুল বিমান শক্তি জড়ো করছে। গত কয়েক দিনেই যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ১২০টিরও বেশি বিমান মোতায়েন করেছে। এছাড়া বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড’ আরব সাগরে অবস্থানরত ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপের সঙ্গে যোগ দিতে রওনা হয়েছে।
উইটকফের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক্সে লিখেছেন: "জানতে চান আমরা কেন আত্মসমর্পণ করি না? কারণ আমরা ইরানি।" সিবিএস-এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধান এখনও সম্ভব। 'ফেস দ্য নেশন'-এর সঞ্চালক মার্গারেট ব্রেনানকে তিনি বলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ইরানিদের জন্য "মর্যাদা ও গর্বের" বিষয়। তিনি বলেন, "আমরা আমাদের বিজ্ঞানীদের দিয়ে নিজেরাই এই প্রযুক্তি তৈরি করেছি এবং এটি আমাদের খুব প্রিয় কারণ আমরা এটি সৃষ্টি করেছি—এর জন্য আমাদের বিশাল মূল্য দিতে হয়েছে।"
মূল্য হিসেবে তিনি দুই দশকের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, ইরানি বিজ্ঞানীদের টার্গেটেড কিলিং বা হত্যা এবং গত জুনে পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার কথা উল্লেখ করেন। আরাঘচি বলেন, "আমরা [আমাদের পারমাণবিক কর্মসূচি] ছেড়ে দেব না; জাতিসংঘের পারমাণবিক তদারকি সংস্থা আইএইএ-এর অধীনে সবকিছু যখন শান্তিপূর্ণ ও সুরক্ষিত, তখন তা করার কোনো আইনি কারণ নেই।" তিনি যোগ করেন, পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি)-র "প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সদস্য" হিসেবে ইরান "সংস্থার সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত"। এনপিটি অনুযায়ী পারমাণবিক অস্ত্রহীন দেশগুলোর পারমাণবিক অস্ত্র চাওয়া বা অর্জন করা নিষেধ।
শান্তিপূর্ণ সমৃদ্ধকরণ
তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, চুক্তির অধীনে তেহরানেরও "সমৃদ্ধকরণসহ শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি উপভোগ করার পূর্ণ অধিকার" রয়েছে। মন্ত্রী উল্লেখ করেন, "সমৃদ্ধকরণ আমাদের আলোচনার একটি স্পর্শকাতর অংশ। আমেরিকান দল আমাদের অবস্থান জানে, আমরাও তাদের অবস্থান জানি। আমরা ইতিমধ্যে আমাদের উদ্বেগ বিনিময় করেছি এবং আমি মনে করি একটি সমাধান সম্ভব।"
এদিকে ওয়াশিংটন আলোচনার পরিধি পারমাণবিক ইস্যুর বাইরে বাড়িয়ে ইরানের মিসাইল কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তাদের সমর্থনকেও অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছে। ইরান এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। আরাঘচি সিবিএসকে বলেন, ইরানি প্রতিনিধিদল বর্তমানে "শুধুমাত্র পারমাণবিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে।"
তিনি আরও বলেন, পরবর্তী বৈঠকের আগে ইরানি প্রতিনিধিদল একটি খসড়া তৈরির কাজ করছে, যাতে "উভয় পক্ষের উদ্বেগ ও স্বার্থ মিটমাট করার মতো উপাদান" থাকবে এবং এর মাধ্যমে একটি "দ্রুত চুক্তিতে" পৌঁছানো যাবে। ইরানের শীর্ষ এই কূটনীতিক বলেন, এই চুক্তিটি সম্ভবত ২০১৫ সালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়ে করা জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (JCPOA)-এর চেয়েও "ভালো" হবে।
বিস্তারিত না বলে তিনি বলেন, "এমন কিছু উপাদান আছে যা আগের চুক্তির চেয়ে অনেক ভালো হতে পারে। এখনই বিস্তারিত বলার দরকার নেই। তবে আমরা একমত হতে পারি যে আমাদের পারমাণবিক কর্মসূচি চিরকাল শান্তিপূর্ণ থাকবে এবং একই সঙ্গে আরও নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে।"
‘অবাস্তব কল্পনা’
তবে কিছু পর্যবেক্ষক চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে কম আশাবাদী। কুইন্সি ইনস্টিটিউটের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পার্সি আল জাজিরাকে বলেন, ইরান হয়তো এমন প্রস্তাব দেবে যা তাদের আগের সব প্রস্তাবের চেয়েও এগিয়ে, কিন্তু তা-ও হয়তো যথেষ্ট হবে না। পার্সি বলেন, "ইসরায়েলিরা ট্রাম্পকে এমন এক গল্প শুনিয়েছে যেখানে ইরানকে বাস্তবের চেয়ে অনেক অনেক বেশি দুর্বল হিসেবে দেখানো হয়েছে। ফলে, তিনি সর্বোচ্চ আত্মসমর্পণের দাবি জানাচ্ছেন, যা ক্ষমতার বাস্তব পরিস্থিতির বিচারে পুরোপুরি অবাস্তব।"
"যতক্ষণ না এই ভুল ধারণা শুধরানো হচ্ছে, ততক্ষণ ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় কোনো প্রস্তাবও দেয়, তবুও ট্রাম্প হয়তো 'না' বলবেন। কারণ তিনি ভুল বিশ্বাস নিয়ে আছেন যে তিনি আরও ভালো কিছু পেতে পারেন।" গত বছরও পরমাণু আলোচনার প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ইসরায়েল ইরানে হামলা চালালে তা ভেস্তে যায় এবং ১২ দিনের যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। সেই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যোগ দিয়ে ফোরদো, নাতাঞ্জ এবং ইসফাহানে ইরানের তিনটি পারমাণবিক কেন্দ্রে বোমা হামলা চালায়।
জানুয়ারিতে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের পর ট্রাম্প নতুন করে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দেন। জবাবে তেহরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার এবং ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলার হুঁশিয়ারি দেয়। এই পাল্টাপাল্টি হুমকি আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয় এবং ওমান, কাতার ও সৌদি আরবের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে বাধ্য করে।
এদিকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের কাছে এমন একটি চুক্তির জন্য লবিং করছেন, যা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস করবে এবং ব্যালিস্টিক মিসাইল সমস্যার সমাধান করবে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম কান (Kan) গত সপ্তাহে জানিয়েছে, ইসরায়েল এমন সম্ভাবনার প্রস্তুতি নিচ্ছে যে ওয়াশিংটন ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল সিস্টেমে হামলার সবুজ সংকেত দিতে পারে। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের নন-প্রলিফারেশন প্রোগ্রামের সাবেক পরিচালক মার্ক ফিটজপ্যাট্রিক বলেন, তেহরানের পক্ষে শূন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ মেনে নেওয়া অসম্ভব।
তিনি ইরান নীতি নিয়ে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে সম্ভাব্য কৌশলগত ফাটলের কথাও উল্লেখ করেন। ফিটজপ্যাট্রিক যুক্তি দেন যে ট্রাম্প প্রশাসন পারমাণবিক হুমকির ওপরই পুরোপুরি মনোযোগ নিবদ্ধ রেখেছে, অন্যদিকে ইসরায়েলি সরকার আরও ব্যাপক পরিসরে ইরানকে আটকে রাখার কৌশল চায়। তিনি বলেন, "ট্রাম্পের লক্ষ্য কেবল পারমাণবিক বিষয়। যদি তিনি সেটা [শূন্য সমৃদ্ধকরণ] অর্জন করতে পারেন, তবে আমার মনে হয় না তিনি চাপ অব্যাহত রাখতে বাধ্যবোধ করবেন শুধু এ কারণে যে নেতানিয়াহু অন্য বিষয়গুলোও চাইছেন।"
সূত্র : আল জাজিরা
আরটিএনএন/এআই
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!