ইরান, ট্রাম্প, খোমেনি, আরাকচি
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি   ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি অব্যাহত রাখলেও, কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রেখে সুইজারল্যান্ডে তৃতীয় দফার পরমাণু আলোচনায় বসতে যাচ্ছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় পৌঁছান এবং ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদির সাথে সাক্ষাৎ করেন। ওমান এই পরোক্ষ আলোচনার মধ্যস্থতা করছে, যা বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

যাত্রার আগে আরাকচি বলেন, একটি ‘ন্যায্য ও সুষম চুক্তি’ এখন হাতের নাগালে। তবে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না, কিন্তু ‘শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার’ ত্যাগ করতেও তারা প্রস্তুত নয়। এই আলোচনা এমন এক প্রেক্ষাপটে হচ্ছে যখন দুই পক্ষের মধ্যেই অবিশ্বাস প্রবল এবং তাদের কথাবার্তায় কখনো সমঝোতা, আবার কখনো সংঘাতের সুর শোনা যাচ্ছে।

ওয়াশিংটনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স অভিযোগ করেন যে, গত জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার পর ইরান আবারও তাদের পরমাণু কর্মসূচি পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, তেহরানের উচিত ওয়াশিংটনের সামরিক পদক্ষেপের হুমকিকে গুরুত্ব সহকারে নেওয়া।

হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ভ্যান্স বলেন, “নীতিটা খুব সহজ: ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকতে পারে না। যদি তারা পুনরায় এটি তৈরির চেষ্টা করে, তবে তা আমাদের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করবে। আসলে, তারা যে ঠিক সেটাই করার চেষ্টা করেছে, তার প্রমাণ আমরা পেয়েছি।”

তিনি আরও বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘কূটনৈতিকভাবে সমস্যাটি সমাধান করতে চান’, তবে তার হাতে ‘অন্যান্য বিকল্পও রয়েছে’। তেহরান থেকে ভ্যান্সের মন্তব্যের কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামোর বর্তমান অবস্থা অস্পষ্ট। ট্রাম্প দাবি করেছেন যে গত বছরের হামলায় ইরানের কর্মসূচি ‘নিশ্চিহ্ন’ হয়ে গেছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) পরিদর্শকদের ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানের ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলোতে কী অবশিষ্ট আছে তা যাচাই করতে দেওয়া হয়নি।

‘বিশাল বড় সমস্যা’

এর আগের দিন ট্রাম্প তার ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণে ইরানের বিরুদ্ধে ‘অশুভ পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা’ পোষণ এবং যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির অভিযোগ এনে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেন। ইরানি কর্মকর্তারা অবশ্য এসব অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেন, “ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং জানুয়ারির অস্থিরতায় হতাহতের সংখ্যা নিয়ে তারা যা-ই বলছে, তা কেবল ‘বড় মিথ্যার’ পুনরাবৃত্তি।” তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশলকে অ্যাডলফ হিটলারের প্রচারমন্ত্রী জোসেফ গোয়েবলসের প্রোপাগান্ডা কৌশলের সাথে তুলনা করেন।

সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস থেকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, জেনেভার আলোচনা মূলত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপরই ফোকাস করবে। তবে তিনি ইরানি ব্যালিস্টিক মিসাইল নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন এবং বলেন, ইরান এগুলোকে আন্তঃমহাদেশীয় অস্ত্রে রূপান্তর করার চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, মিসাইল কর্মসূচিকে আলোচনার বাইরে রাখার ইরানি জিদ একটি “বিশাল বড় সমস্যা”। এর আগে আরাকচি ইন্ডিয়া টুডে-কে বলেছিলেন, ইরানের মিসাইলগুলো “প্রতিরক্ষামূলক”। তিনি বলেন, “এগুলো কেবল প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং আত্মরক্ষার জন্য তৈরি করা হয়েছে।”

তেহরান থেকে আল জাজিরার তৌহিদ আসাদি জানান, মূল ইস্যুগুলোতে দুই পক্ষের অবস্থান এখনো অনেক দূরে। এর মধ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং মিসাইল, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও আঞ্চলিক কর্মকাণ্ডের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত। আসাদি বলেন, “মূল কথা হলো, ব্যবধান স্পষ্টভাবেই বিদ্যমান। কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চূড়ান্ত সমাধান সম্ভব কি না, তা দেখার বিষয়। আপাতত অনিশ্চয়তাই একমাত্র নিশ্চিত বিষয়।”

বৃহস্পতিবারের আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং তার জামাতা জ্যারেড কুশনার। প্রথম দফার আলোচনা ৬ ফেব্রুয়ারি ওমানে এবং দ্বিতীয় দফা ১৭ ফেব্রুয়ারি জেনেভায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আরাকচি জানিয়েছিলেন, দুই পক্ষ ভবিষ্যতের আলোচনার জন্য কিছু সাধারণ নীতিতে একমত হয়েছে, তবে কোনো উল্লেখযোগ্য চুক্তি হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা

ইরান সতর্ক করে দিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা হামলা চালানো হবে, যেখানে হাজার হাজার সৈন্য মোতায়েন রয়েছে। তেহরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছে, যেখান দিয়ে বিশ্বের তেল সরবরাহের একটি বড় অংশ পরিবাহিত হয়।

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ তেহরানের অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন, “যদি আপনারা কূটনীতির পথ বেছে নেন—যেখানে ইরানি জাতির মর্যাদা ও পারস্পরিক স্বার্থকে সম্মান জানানো হয়—তবে আমরাও সেই টেবিলে থাকব। কিন্তু যদি আপনারা প্রতারণা, মিথ্যা ও ভুল তথ্যের মাধ্যমে অতীতের পুনরাবৃত্তি করেন এবং আলোচনার মাঝখানে হামলা চালান, তবে নিঃসন্দেহে ইরানি জাতির কঠোর আঘাতের স্বাদ পাবেন।” ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র টিম হকিংস বলেন, ওয়াশিংটন যেকোনো উত্তেজনার জবাব দিতে প্রস্তুত। বুধবার তিনি বলেন, “আমাদের দৃষ্টিতে শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমেই প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।”

যুক্তরাষ্ট্র গত কয়েক দশকের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় বিমান ও যুদ্ধজাহাজের সমাবেশ ঘটিয়েছে। জানুয়ারির শেষ থেকে আরব সাগরে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েন রয়েছে। এছাড়া ট্রাম্প বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডসহ তিনটি ডেস্ট্রয়ার এবং ৫,০০০-এর বেশি অতিরিক্ত সেনাসদস্যকে ওই অঞ্চলে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।

এর পাশাপাশি বিমান শক্তিও বাড়ানো হচ্ছে। এফ-৩৫, এফ-২২, এফ-১৫ ও এফ-১৬-সহ ডজন ডজন যুদ্ধবিমান যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ঘাঁটি থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে উড়ে যেতে দেখা গেছে। এরই মধ্যে বুধবার মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ৩০টিরও বেশি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, যারা ইরানের তেল বিক্রি, ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচি ও অস্ত্র উৎপাদনে অর্থায়ন করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অর্থসচিব স্কট বেসেন্ট এক বিবৃতিতে বলেন, “ইরান অবৈধভাবে তেল বিক্রি, অর্থ পাচার এবং পারমাণবিক ও প্রচলিত অস্ত্র কর্মসূচির জন্য সরঞ্জাম সংগ্রহ করতে আর্থিক ব্যবস্থাকে ব্যবহার করছে।”

ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরার কিম্বার্লি হালকেট বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং সর্বশেষ নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে আলোচনার টেবিলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে। হালকেট বলেন, “আশা করা হচ্ছে ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত করতে রাজি হবে এবং ভবিষ্যতে তাদের আঞ্চলিক প্রক্সি ও মিসাইল কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়েও আলোচনার সুযোগ থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে যে, যদি এই ছাড়গুলো দেওয়া হয়, তবে তারা ইরানের অর্থনীতিকে প্রয়োজনীয় স্বস্তি দেবে।”

সূত্র : আল জাজিরা

আরটিএনএন/এআই