পাকিস্তান, আফগানিস্তান, বিমান হামলা, তালেবান
আফগানিস্তানের খোস্ত প্রদেশে পাকিস্তানি যুদ্ধবিমানের ওপর নজর রাখতে বিমান-বিধ্বংসী কামানের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন এক তালেবান সদস্য   ছবি: সংগৃহীত

পাকিস্তানের বেশ কয়েকটি বড় শহরে বোমা হামলা এবং ইসলামাবাদের প্রতিরক্ষামন্ত্রী কর্তৃক প্রতিবেশী দেশটির বিরুদ্ধে ‘প্রকাশ্য যুদ্ধ’ ঘোষণার পর আফগানিস্তানের তালেবান নেতারা জানিয়েছেন, তারা আলোচনার জন্য প্রস্তুত। গত কয়েক মাস ধরে চলা উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষের জেরে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। শুক্রবার পাকিস্তান আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল, তালেবান নেতাদের ঘাঁটি কান্দাহার এবং অন্যান্য শহরে হামলা চালায়। একই সঙ্গে সীমান্তেও লড়াই অব্যাহত রয়েছে। উভয় পক্ষই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কথা জানিয়েছে।

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে ‘সর্বাত্মক সংঘাত’ ঘোষণা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন: “এখন আমাদের এবং তোমাদের মধ্যে প্রকাশ্য যুদ্ধ।” সহিংসতা বন্ধে তালেবান নেতারা পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন আফগান সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ। তিনি বলেন, “আফগানিস্তানের ইসলামিক আমিরাত সবসময় আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করেছে এবং এখনো আমরা আলোচনার মাধ্যমেই এই বিষয়টির সমাধান চাই।”

গত সপ্তাহান্তে আফগান ভূখণ্ডে পাকিস্তানের বিমান হামলার জেরে বৃহস্পতিবার সীমান্তে আফগানিস্তান পাল্টা হামলা চালায়, যার ফলে নতুন করে এই সহিংসতার সূত্রপাত হয়। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে আফগানিস্তান পাকিস্তানি তালেবান যোদ্ধাদের আশ্রয় দিচ্ছে—যা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। তবে আফগানিস্তান বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

মুজাহিদ জানান, বৃহস্পতিবার রাতে পাকিস্তান কাবুল, কান্দাহার ও পাক্তিয়ার বিভিন্ন অংশে হামলা চালায়। এছাড়া শুক্রবার পাক্তিয়া, পাক্তিকা, খোস্ত ও লাগমানেও হামলা চালানো হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার শেষ রাতে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তের উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানে পাকিস্তানি সামরিক অবস্থান ও স্থাপনা লক্ষ্য করে আফগান ড্রোন হামলা চালানো হয়েছিল।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী দাবি করেছেন, পাকিস্তানের বিমান ও স্থল অভিযানে আফগান বাহিনী ও তাদের সহযোগী যোদ্ধাদের অন্তত ২৭৪ জন নিহত এবং ৪০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, ১২ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত এবং ২৭ জন আহত হয়েছেন। একজন পাকিস্তানি সেনা নিখোঁজ রয়েছেন।

মুজাহিদ বিপুল সংখ্যক আফগান হতাহতের এই দাবিকে ‘মিথ্যা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি দাবি করেন, ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২৩ জনের মরদেহ আফগানিস্তানে নিয়ে আসা হয়েছে। এছাড়া ‘অনেক’ পাকিস্তানি সেনাকে বন্দি করা হয়েছে বলেও তিনি জানান। তার মতে, ১৩ জন আফগান সেনা নিহত এবং ২২ জন আহত হয়েছেন। পাশাপাশি ১৩ জন বেসামরিক নাগরিকও আহত হয়েছেন।

শুক্রবার পরে আফগান সরকার জানায়, দক্ষিণ-পূর্ব আফগানিস্তানের খোস্ত ও পাক্তিকা প্রদেশে পাকিস্তানের হামলায় ১৯ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ২৬ জন আহত হয়েছেন। আল জাজিরা স্বাধীনভাবে কোনো পক্ষের হতাহতের দাবির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।

সম্পর্কের অবনতি

২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর আফগান রাজধানীতে এটিই পাকিস্তানের সবচেয়ে ব্যাপক বোমাবর্ষণ এবং তালেবান কর্তৃপক্ষের শক্ত ঘাঁটি দক্ষিণাঞ্চলে প্রথম বিমান হামলা। সুইডেনভিত্তিক আফগানিস্তান ও পাকিস্তান বিষয়ক সংঘাত বিশ্লেষক আব্দুল সাঈদ আল জাজিরাকে বলেন, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ কারণগুলো আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরুর ক্ষেত্রে বড় বাধা।

তিনি বলেন, “উভয় দেশের জনগণের মধ্যে গভীর সম্পর্ক, বিশেষ করে ডুরান্ড লাইনের (২,৫৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত, যা পাকিস্তান আন্তর্জাতিক সীমানা হিসেবে মানলেও আফগানিস্তান মানে না) দুই পাশে বসবাসকারী উপজাতিদের সম্পর্কের কারণে এই সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “ফলস্বরূপ, উল্লেখযোগ্য সামরিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও, আফগানিস্তানের সঙ্গে সশস্ত্র সংঘাতের ফলে যে বিশাল রক্তপাত হবে, তা পাকিস্তান সামাল দিতে পারবে না।”

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্কের চরম অবনতি হয়েছে। গত অক্টোবরে প্রাণঘাতী সংঘর্ষে উভয় পক্ষের ৭০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হওয়ার পর থেকে স্থল সীমান্ত ক্রসিংগুলো মূলত বন্ধ রয়েছে।

কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় প্রাথমিক যুদ্ধবিরতির পর ইসলামাবাদ ও কাবুলের মধ্যে কয়েক দফা আলোচনা হলেও তা কোনো স্থায়ী সমাধান আনতে ব্যর্থ হয়েছে। বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের পর, এই মাসে সৌদি আরব হস্তক্ষেপ করে এবং অক্টোবরে আফগানিস্তানের হাতে বন্দি তিন পাকিস্তানি সেনার মুক্তি নিশ্চিত করে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে সহিংসতার বৃদ্ধি এবং বেসামরিক জনগণের ওপর এর প্রভাব নিয়ে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছেন বলে এক ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন তার মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক। রাশিয়া, ইরান ও ইরাকসহ বেশ কয়েকটি দেশ অবিলম্বে এই লড়াই বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।

সূত্র : আল জাজিরা

আরটিএনএন/এআই