ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। রোববার (১ মার্চ) ওভার-দ্য-কাউন্টার লেনদেনে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক লাফে প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সোমবার বাজার খোলার সঙ্গে সঙ্গে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০০ ডলার ছুঁতে পারে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮০ ডলারে পৌঁছেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই ঊর্ধ্বগতি কেবল তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়; বরং ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হলে দামের আরও বড় উল্লম্ফন দেখা যেতে পারে।
জ্বালানি বাজারে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই সরু সামুদ্রিক পথটি বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান করিডোর। এক পাশে ইরান, অন্য পাশে ওমান এই প্রণালির ভৌগোলিক অবস্থানই একে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
আইসিআইএসের জ্বালানি ও রিফাইনিং বিভাগের পরিচালক অজয় পারমার বলেন, যে কোনো সামরিক হামলাই তেলের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হরমুজ প্রণালির কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া। কারণ বিশ্বের মোট তেল, কনডেনসেট ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ৩০ শতাংশের বেশি এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন ও কাতার থেকে রপ্তানিকৃত অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর বড় অংশই এই প্রণালি ব্যবহার করে। প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ৩০০টি জাহাজ এই পথে চলাচল করে। ব্যস্ত সময়ে কখনও কখনও প্রতি ছয় মিনিট পরপর একটি করে জাহাজ পারাপার হতে দেখা যায়। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এই প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ‘প্রাণরেখা’।
তেহরান দীর্ঘদিন ধরে হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছিল, ইরানের ওপর বড় ধরনের হামলা হলে তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে। সাম্প্রতিক হামলার পর ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস জাহাজগুলোর ভিএইচএফ চ্যানেলে বার্তা দিয়ে জানায়, প্রণালি দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচল করতে পারবে না। এর পরপরই অধিকাংশ ট্যাংকার মালিক, তেল কোম্পানি ও ট্রেডিং হাউস ওই রুট দিয়ে পরিবহন স্থগিত করে।
বাজার বিশ্লেষক হেলিমা ক্রফটের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলে তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে চলে যেতে পারে। একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছে বিনিয়োগ ব্যাংক বার্কলেজও। তাদের ধারণা, সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে দামের ঊর্ধ্বগতি দ্রুত ও তীব্র হবে।
অন্যদিকে তেল উৎপাদনকারী জোট ওপেক+ এপ্রিল থেকে দৈনিক উৎপাদন ২ লাখ ৬ হাজার ব্যারেল বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এই বৃদ্ধি বৈশ্বিক চাহিদার মাত্র ০.২ শতাংশেরও কম, যা সম্ভাব্য ঘাটতি পূরণে খুবই সামান্য ভূমিকা রাখতে পারে।
জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিস্টেড এনার্জির জ্বালানি অর্থনীতিবিদ হোর্হে লিওনের মতে, হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে কিছু সীমিত রুট থাকলেও তা দিয়ে পূর্ণ সক্ষমতায় সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব নয়। প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। রাইস্টাডের পূর্বাভাস অনুযায়ী, নতুন সপ্তাহের লেনদেন শুরু হলে তেলের দাম আরও ২০ ডলার বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯২ ডলারে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু জ্বালানি বাজারেই নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় চাপ তৈরি করতে পারে। তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়ালে পরিবহন ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ও পণ্যমূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে নতুন করে মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি বাড়বে। বিশেষ করে তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে বাড়তি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের চাপ সামলাতে হবে।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কতটা বিস্তৃত হয় এবং হরমুজ প্রণালি কতদিন অচল থাকে—তার ওপরই নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ভবিষ্যৎ গতিপথ। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে বিশ্ববাজারে তেলের দামে আরও বড় অস্থিরতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকরা।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!