ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, খোমেনি, ট্রাম্প, ইসরায়েল
১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন   সংগৃহীত

মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার ঘটনাটি ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দেশটির নেতৃত্বের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাতগুলোর একটি। এই ঘটনায় তার সমর্থকদের মধ্যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। খোমেনিই ছিলেন সেই নেতা, যিনি মার্কিন-সমর্থিত শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির বিরুদ্ধে ইসলামি বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

রবিবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, খামেনি ও অন্যান্য জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তাদের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া দেশটির "দায়িত্ব এবং বৈধ অধিকার"। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অভিযানকে একটি "মুক্তির মুহূর্ত" হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, "মাথা" সরিয়ে ফেলার ফলে শরীর অর্থাৎ পুরো ব্যবস্থাটি দ্রুত ভেঙে পড়বে। তবে, ইরানের বাস্তব পরিস্থিতি বলছে বিষয়টি অনেক বেশি জটিল।

ভেতরের খবর রাখা ব্যক্তি, সামরিক বিশেষজ্ঞ এবং রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে যে, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়ার ফলাফল পশ্চিমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী নাও হতে পারে। বরং এর ফলে একটি "গ্যারিসন স্টেট" বা সামরিকীকৃত রাষ্ট্রের জন্ম হতে পারে—যেটি অস্তিত্ব রক্ষার জন্য মরিয়া হয়ে উঠবে এবং তাদের জন্য আর কোনো রাজনৈতিক সীমারেখা অবশিষ্ট থাকবে না।

মাথা কেটে ফেলা সীমাবদ্ধতা
মার্কিন অভিযানের মূল ধারণাটি হলো, সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু সামাল দেওয়ার মতো শক্তি ইরানের নেই। সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক ফোনালাপ সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, তেহরানে কারা কলকাঠি নাড়ছে তা তিনি "ভালোভাবেই জানেন"। তিনি আরও বলেন, সর্বোচ্চ নেতার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার জন্য "কিছু ভালো প্রার্থী রয়েছে", তবে বিস্তারিত কিছু বলেননি।

কিন্তু সামরিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, শুধুমাত্র বিমান হামলা চালিয়ে "ক্ষমতার পরিবর্তন" সম্ভব—এমন ধারণা ভুল। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক উপ-সহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাইকেল মুলরয় আল জাজিরা অ্যারাবিককে বলেন, মাটিতে সেনা মোতায়েন বা সশস্ত্র গণঅভ্যুত্থান ছাড়া রাষ্ট্রের গভীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেবল নিজেদের সংহতি বজায় রেখেই টিকে থাকতে পারে।

মুলরয় বলেন, "শুধুমাত্র বিমান হামলার মাধ্যমে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। যদি কথা বলার মতো একজনও বেঁচে থাকে, তবে শাসনব্যবস্থা টিকেই থাকবে।" ইরানের টিকে থাকার এই ক্ষমতা দেশটির দ্বৈত সামরিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। সরকারকে শুধু নিয়মিত সেনাবাহিনী (আর্তেশ) নয়, বরং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) রক্ষা করে। আইআরজিসি একটি শক্তিশালী সমান্তরাল সামরিক বাহিনী, যা সংবিধান অনুযায়ী 'বেলায়াত-ই ফকিহ' বা ইসলামি ফকিহ-এর অভিভাবকত্ব রক্ষা করতে দায়বদ্ধ।

তাদের সমর্থনে রয়েছে 'বাসিজ'—একটি বিশাল আধা-সামরিক স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী, যা প্রতিটি মহল্লায় ছড়িয়ে আছে। অভ্যন্তরীণ ভিন্নমত দমন এবং আদর্শিক অনুগতদের জড়ো করার জন্য এদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তবে এই সংহতি ইতোমধ্যেই পরীক্ষার মুখে পড়েছে। তেহরানভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক হোসেন রয়ভারান নিশ্চিত করেছেন যে, হামলায় দেশটির শীর্ষ নিরাপত্তা স্তরের অনেকে নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে খামেনির উপদেষ্টা এবং নবগঠিত সুপ্রিম ডিফেন্স কাউন্সিলের সচিব আলি শামখানিও রয়েছেন।

ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলি লারিজানি জানিয়েছেন, রবিবার থেকেই ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হবে। লারিজানি বলেন, "শীঘ্রই একটি অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব পরিষদ গঠন করা হবে। পরবর্তী নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন জুরিস্ট (আইনজ্ঞ) দায়িত্ব পালন করবেন।"

রাষ্ট্রীয় টিভিতে প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেন, "যত দ্রুত সম্ভব এই পরিষদ গঠন করা হবে। আমরা আজই এটি গঠনের চেষ্টা করছি।" প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগীয় প্রধান এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন ধর্মীয় নেতাকে নিয়ে দ্রুত অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ গঠনের উদ্যোগ ইঙ্গিত দেয় যে, শাসনব্যবস্থার "সারভাইভাল প্রটোকল" বা টিকে থাকার জরুরি বিধিমালা সক্রিয় করা হয়েছে।

রয়ভারানের মতে, ইরানের ব্যবস্থাটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যা "প্রাতিষ্ঠানিক, ব্যক্তিগত নয়"। রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও এটি "অটোপাইলট" মোডে বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে সক্ষম। তবে তেহরানভিত্তিক আরেক বিশ্লেষক বলছেন, কর্মকর্তারা ‘স্থিতিশীলতা দেখানোর’ চেষ্টা করলেও ইরানের ভবিষ্যৎ গতিপথ এখনো অস্পষ্ট।

মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ সেন্টারের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো আব্বাস আসলামি বলেন, "কর্মকর্তারা এখানে স্থিতিশীলতা দেখানোর চেষ্টা করছেন এবং জোর দিয়ে বলছেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকঠাক কাজ করছে।" আল জাজিরাকে তিনি বলেন, "আজকে [মার্কিন-ইসরায়েলি] বিমান হামলা রাজধানী [তেহরান] এবং অন্যান্য শহরের নিরাপত্তা ও সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, আগামী কয়েক ঘণ্টা বা দিনে এই হামলা অব্যাহত থাকতে পারে এবং তীব্রতা বাড়তে পারে।" তিনি আরও বলেন, "সংঘাত বাড়ার এই সম্ভাবনা সাধারণ ইরানিরা খুব একটা ভালোভাবে দেখছে না। একই সঙ্গে, ইরানি কর্মকর্তারাও কঠোর হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। তারা ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে, ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এমন সক্ষমতা ব্যবহার করে জবাব দেওয়া হতে পারে যা আগে কখনো ব্যবহার করা হয়নি।"

ধর্মতত্ত্ব থেকে জাতীয়তাবাদী অস্তিত্ব রক্ষায় রূপান্তর
তাৎক্ষণিকভাবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি হতে পারে ইরানের ধর্মীয় বৈধতা থেকে সরে এসে অস্তিত্ব রক্ষার জাতীয়তাবাদের দিকে ঝুঁকে পড়া। বেঁচে থাকা কর্মকর্তারা বুঝতে পারছেন যে, সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু জনগণের একাংশের সঙ্গে আধ্যাত্মিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করতে পারে। তাই তারা এই যুদ্ধকে এখন আর যাজকতন্ত্রের প্রতিরক্ষা হিসেবে নয়, বরং ইরানের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার লড়াই হিসেবে তুলে ধরছেন।

রক্ষণশীল হেভিওয়েট নেতা এবং অন্তর্বর্তীকালীন প্রক্রিয়ার অন্যতম চাবিকাঠি আলি লারিজানি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইসরায়েলের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো ইরানকে "ভাগ করা"। ইরানকে ভেঙে জাতিগত ছোট ছোট রাষ্ট্রে পরিণত করার ভীতি দেখিয়ে, নেতৃত্ব এখন ধর্মনিরপেক্ষ ইরানি এবং বিরোধীদেরকেও এক সাধারণ বিদেশি শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করছে। এই কৌশলটি যুক্তরাষ্ট্রের গণঅভ্যুত্থানের আশাকে জটিল করে তুলেছে।

রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানী সালেহ আল-মুতাইরি উল্লেখ করেন, সরকার ৪০ দিনের শোক ঘোষণা করে বিরোধীদের জন্য একটি "ফিউনারেল ট্র্যাপ" বা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ফাঁদ তৈরি করেছে। রাস্তাঘাট সম্ভবত লাখ লাখ শোকার্ত মানুষে ভরে যাবে, যা সরকারের জন্য মানবঢাল হিসেবে কাজ করবে। এর ফলে সরকারবিরোধী আন্দোলনকারীদের পক্ষে স্বল্পমেয়াদে রাজপথে নামা বা গতি সঞ্চার করা কৌশলগত ও নৈতিকভাবে কঠিন হয়ে পড়বে।

কৌশলগত ধৈর্যেরঅবসান
যদি ইরান এই প্রাথমিক ধাক্কা সামলে ওঠে, তবে যে নতুন ইরানের আবির্ভাব ঘটবে তা হবে মৌলিকভাবে ভিন্ন: কম হিসেবি এবং সম্ভবত অনেক বেশি সহিংস। বহুবছর ধরে খামেনি "কৌশলগত ধৈর্য" (Strategic Patience) নীতি মেনে চলতেন। তিনি সর্বাত্মক যুদ্ধ এড়ানোর জন্য প্রায়ই ছোটখাটো আঘাত সহ্য করে নিতেন।

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাসান আহমাদিয়ান আল জাজিরা অ্যারাবিককে বলেন, সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সেই যুগের অবসান ঘটেছে। তিনি বলেন, "২০২৫ সালের জুনের যুদ্ধ থেকে ইরান কঠিন শিক্ষা পেয়েছে: সংযমকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়।" তেহরানের নতুন সমীকরণ সম্ভবত হবে "পোড়ামাটি নীতি" । আহমাদিয়ান আরও বলেন, "সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেছে। যদি হামলা হয়, ইরান সবকিছু জ্বালিয়ে দেবে।" তিনি ইঙ্গিত দেন, এবারের প্রতিক্রিয়া অতীতের যেকোনো সংঘাতের চেয়ে ব্যাপক এবং বেদনাদায়ক হবে।

এর ফলে এমন একটি পরিস্থিতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে যেখানে মাঠপর্যায়ের কমান্ডাররা, ধর্মীয় নেতৃত্বের রাজনৈতিক সতর্কতার তোয়াক্তা না করে, আরও ভয়ংকর আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারেন। এই হত্যাকাণ্ড দেশটির নিরাপত্তা সংস্থাকে অপমানিত করেছে এবং এক বিশাল গোয়েন্দা ব্যর্থতা উন্মোচিত করেছে, যাকে আল জাজিরা সেন্টার ফর স্টাডিজের সিনিয়র গবেষক লিকা মাকি "বিপর্যয়কর" বলে অভিহিত করেছেন।

মাকি বলেন, "একজন বিশ্বাসী একই গর্ত থেকে দুবার দংশিত হয় না, অথচ ইরান দুবার দংশিত হয়েছে।" যুক্তরাষ্ট্রের হামলার ধরন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই "পুরোপুরি উন্মোচিত হওয়ার" ঘটনাটি সম্ভবত বেঁচে থাকা নেতৃত্বকে আত্মগোপনে (Underground) যেতে বাধ্য করবে। এর ফলে ইরান একটি 'হাইপার-সিকিউরিটি' বা অতি-নিরাপত্তা রাষ্ট্রে পরিণত হবে, যেখানে যেকোনো অভ্যন্তরীণ ভিন্নমতকে বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখা হবে। মাকি মন্তব্য করেন, ইরানের "মাথা" হয়তো সরিয়ে ফেলা হয়েছে, কিন্তু "শরীর"—যার হাতে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহৎ ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার রয়েছে—তা এখনো অক্ষত।

সূত্র : আল জাজিরা

আরটিএনএন/এআই