ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সামরিক কর্মকর্তারা।   ছবি: এএফপি

ধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার প্রশাসন এখন এক জটিল এবং বহুমাত্রিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। এই সংকট কেবল একটি যুদ্ধের কৌশলগত সিদ্ধান্তের প্রশ্ন নয়; বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক অবস্থান, সামরিক নীতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে এক গভীর দ্বন্দ্বের প্রতিফলন।

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের মূল যুক্তি ছিল—তেহরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ না দেওয়া। এই অবস্থান নতুন কিছু নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির একটি ধারাবাহিক অংশ। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই নীতির বাস্তব প্রয়োগই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

এই চ্যালেঞ্জের কেন্দ্রে রয়েছে প্রায় ৯৭০ পাউন্ড সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের একটি মজুত, যা বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজনে একাধিক পারমাণবিক বোমা তৈরির সক্ষমতা রাখে। যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, এই বিপজ্জনক উপাদানের বড় অংশ এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে রয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান রাফায়েল গ্রোসির বক্তব্যও এই আশঙ্কাকে জোরালো করে। তার মতে, ইউরেনিয়ামের উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো স্থানান্তর করা হয়নি এবং তা ইরানের বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাতেই রয়েছে। ফলে, কেবল আকাশপথে হামলা চালিয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়—এমন ধারণাই জোরদার হচ্ছে।

এখানেই ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে সবচেয়ে বড় দ্বিধা। ইউরেনিয়াম সম্পূর্ণরূপে জব্দ বা ধ্বংস করতে হলে স্থল অভিযান—অর্থাৎ ইরানের মাটিতে সরাসরি মার্কিন সেনা মোতায়েন—প্রায় অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা।

ইরানে যুদ্ধ এবং আফগানিস্তান যুদ্ধ—এই দুই দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ এখনো মার্কিন সমাজ ও রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে রেখেছে। এই বাস্তবতায় ট্রাম্প নিজেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রকে আর কোনো দীর্ঘস্থায়ী মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে জড়াবেন না।

ফলে, একদিকে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করার উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য, অন্যদিকে সেই লক্ষ্য অর্জনে স্থলযুদ্ধ এড়িয়ে চলার রাজনৈতিক অঙ্গীকার—এই দুইয়ের মধ্যে স্পষ্ট দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে।

মার্কিন কংগ্রেসেও এই দ্বিধা প্রতিফলিত হচ্ছে। ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লমেন্থল মনে করেন, সেনা উপস্থিতি ছাড়া ইউরেনিয়াম নিরাপদ করা সম্ভব নয়। একইভাবে রিপাবলিকান সিনেটর রিক স্কট-ও স্বীকার করেছেন, বিকল্প কোনো কার্যকর পদ্ধতির বিষয়ে এখনো পরিষ্কার ধারণা নেই।

অন্যদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাখা হচ্ছে কৌশলগত নীরবতা। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বিভিন্ন বিকল্প রয়েছে, তবে সেগুলো এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না। এই ধরনের অবস্থান একদিকে সামরিক কৌশলের অংশ হতে পারে, তবে অন্যদিকে এটি অনিশ্চয়তাও বাড়াচ্ছে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ ঝুঁকি। যদি এই ইউরেনিয়াম মজুত নিয়ন্ত্রণে আনা না যায় এবং ইরানের কট্টরপন্থীরা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তাহলে তারা ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে আরও দ্রুত অগ্রসর হতে পারে। অর্থাৎ, নিষ্ক্রিয়তাও এখানে ঝুঁকিমুক্ত নয়।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ইউরেনিয়াম উদ্ধার বা ধ্বংস করতে হলে প্রতিটি স্থাপনায় বিপুলসংখ্যক সেনা প্রয়োজন হতে পারে, পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ধরে অভিযান চালাতে হবে। ধ্বংসস্তূপ সরাতে ভারী যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হবে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলবে। ফলে এটি কোনো দ্রুত সমাধানযোগ্য সমস্যা নয়; বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততার সম্ভাবনা তৈরি করে।

সব মিলিয়ে, ট্রাম্প প্রশাসন এখন এমন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে প্রতিটি পথই ঝুঁকিপূর্ণ। একদিকে রয়েছে বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চাপ, অন্যদিকে রয়েছে যুদ্ধবিরোধী জনমত ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার।

এই সংকটের সমাধান নির্ভর করবে শুধু সামরিক শক্তির ওপর নয়; বরং কৌশলগত দূরদর্শিতা, আন্তর্জাতিক সমন্বয় এবং বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর। কারণ, এই মুহূর্তে নেওয়া একটি সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা এবং বিশ্ব রাজনীতির নতুন সমীকরণ।