ডোনাল্ড ট্রাম্প, পারমাণবিক হামলা, ইরান
ইরানে পারমাণবিক হামলার অনেক ইঙ্গিত রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে গুঞ্জন।   ছবি: বিবিসি বাংলা

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চরম হুমকিমূলক একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। ইরানকে ঘিরে সামরিক চাপ বাড়তে থাকায় বিশ্বজুড়ে এখন একটাই প্রশ্ন—আসলেই কি পারমাণবিক হামলার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে?

মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘আজ রাতে একটি গোটা সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, যা আর কখনো ফিরে আসবে না।’ 

তার এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। যদিও তিনি সরাসরি ‘পারমাণবিক হামলা’ শব্দটি ব্যবহার করেননি, তার বক্তব্যের তীব্রতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

এর আগে ইরানকে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য সময়সীমা বেঁধে দেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্র সময় মঙ্গলবার রাত ৮টা পর্যন্ত দেওয়া এই আলটিমেটাম বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী বুধবার সকাল ৬টা। সতর্ক করে তিনি আরও বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সমঝোতা না হলে ‘এক রাতেই নিশ্চিহ্ন’ করে দেওয়া হতে পারে ইরানকে।

এদিকে আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এমন কিছু শক্তিশালী অস্ত্র রয়েছে, যা এখনো ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তার এই মন্তব্যকে ঘিরেই সামাজিক মাধ্যমে পারমাণবিক হামলার জল্পনা ছড়িয়ে পড়ে।

তবে এসব গুঞ্জনকে সরাসরি নাকচ করেছে হোয়াইট হাউস। তারা জানিয়েছে, ভাইস প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে পারমাণবিক হামলার কোনো ইঙ্গিত নেই এবং এ ধরনের দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু পোস্টকে তারা “ভুল ব্যাখ্যা” বলে উল্লেখ করেছে।

অন্যদিকে, ইসরায়েল ইতোমধ্যে ইরানের কিছু অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও রয়েছে। এতে করে অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের কড়া ভাষার পেছনে কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশল থাকতে পারে। কারণ সরাসরি পারমাণবিক হামলার সিদ্ধান্ত একটি চরম পদক্ষেপ, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে।

সব মিলিয়ে এখনো পর্যন্ত পারমাণবিক হামলার কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে সময়সীমা যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে উদ্বেগ। বিশ্ববাসীর দৃষ্টি এখন একদিকে—এই হুমকি কি বাস্তবে রূপ নেবে, নাকি শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক সমাধানই সামনে আসবে।

যুদ্ধবিরতি আলোচনার প্রচেষ্টা নস্যাৎ

এ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি আলোচনার প্রচেষ্টা নস্যাৎ করার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করেছেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। তিনি বলেন, যখন ‘উভয় পক্ষই আলোচনার টেবিলে বসার মতো পর্যায়ে ছিল’, ঠিক তখনই তেহরানে হামলা চালিয়ে ইসরায়েল এই পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।

পাকিস্তানের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জিও নিউজ জানিয়েছে, পাকিস্তানের সিনেটে আইনপ্রণেতাদের ইসহাক দার বলেন, ‘সোমবার রাতের আগ পর্যন্ত আমরা (আলোচনা নিয়ে) খুবই আশাবাদী ছিলাম।’ 

তিনি জানান, পাকিস্তান এই আলোচনায় মধ্যস্থতা করুক তাতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই রাজি হয়েছিল এবং তারা ইসলামাবাদে বৈঠকে বসতেও সম্মত হয়েছিল।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার আরও জানান, পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ১৫ দফা শর্ত ইরানের কাছে এবং ইরানের দেওয়া ৫ দফা শর্ত ওয়াশিংটনের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, দুই সপ্তাহের উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনার পর যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া তাদের জবাব পাকিস্তানের মাধ্যমে পৌঁছে দিয়েছে তেহরান।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে তোলা প্রস্তাবে রাশিয়া ও চীনের ভেটো

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে সম্মিলিত ও প্রতিরক্ষামূলক চেষ্টাকে সমর্থন জানিয়ে আনা একটি প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছে রাশিয়া ও চীন। ফলে প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে গেছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর পক্ষ থেকে এই প্রস্তাবটি পেশ করা হয়েছিল।

নিরাপত্তা পরিষদের ১১টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয় এবং দুটি দেশ (পাকিস্তান ও কলম্বিয়া) ভোটদানে বিরত থাকে। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য চীন ও রাশিয়া ভেটো দেওয়ায় প্রস্তাবটি পাশ হয়নি। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্যরাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন ও রাশিয়া—যে কোনো এক সদস্য ভেটো দিলে পরিষদে যে কোনো প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায়। কয়েক সপ্তাহের দীর্ঘ আলোচনার পর মূল খসড়া প্রস্তাবটি বেশ কয়েকবার সংশোধন করা হয়। 

শুরুতে এটি ‘চ্যাপ্টার সেভেন' (যা সামরিক শক্তি ব্যবহারের অনুমতি দেয়) এর অধীনে থাকলেও পরে তা সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর ‘প্রয়োজনীয় সব প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের অনুমতি’ সংক্রান্ত অংশটিও বাদ দিয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ে শুধুমাত্র প্রতিরক্ষামূলক প্রচেষ্টাকে ‘জোরালোভাবে উৎসাহিত’ করার কথা বলা হয়েছিল।

বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল লতিফ বিন রশিদ আল জায়ানি এই সভায় সভাপতিত্ব করেন। ভোটের আগে তিনি কাউন্সিল সদস্যদের বলেন, এই প্রস্তাব নতুন কোনো বাস্তবতা তৈরি করছে না; বরং এটি ইরানের ক্রমাগত বৈরী আচরণের বিরুদ্ধে একটি কঠোর পদক্ষেপ, যা বন্ধ হওয়া জরুরি।

সূত্র: বিবিসি।