হাম কীভাবে ছড়ায়?
হাম কীভাবে ছড়ায়?   ছবি: সংগৃহীত

দেশে হঠাৎ করে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় জনমনে উদ্বেগ ও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে রোগটির বিস্তার বাড়তে থাকায় অভিভাবকদের মধ্যে দুশ্চিন্তা আরও বেড়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, টিকাদানে অনিয়ম ও সচেতনতার ঘাটতির কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আবু সাঈদ শিমুল জানিয়েছেন, হাম একটি মারাত্মক ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ, যা ‘মিজেলস’ ভাইরাসের মাধ্যমে ছড়ায়। এটি মূলত বায়ুবাহিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁচি, কাশি, কথা বলা কিংবা শ্বাস নেওয়ার সময় ভাইরাসযুক্ত ক্ষুদ্র কণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং অন্যদের শরীরে প্রবেশ করে সংক্রমণ ঘটায়। ভাইরাস শরীরে প্রবেশের সাধারণত ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। 
বিশেষজ্ঞরা জানান, শরীরে র‌্যাশ ওঠার চার দিন আগে থেকে শুরু করে পরবর্তী চার থেকে পাঁচ দিন পর্যন্ত আক্রান্ত ব্যক্তি অন্যদের সংক্রমিত করতে পারে। এমনকি আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে ছড়ানো জীবাণু বাতাসে প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে।

চিকিৎসকদের মতে, যেকোনো বয়সের মানুষ হাম আক্রান্ত হতে পারে। তবে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু এবং ২০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। সংক্রমণের শুরুতে জ্বর দেখা দেয়, যা ১০০ থেকে ১০৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হতে পারে। এর সঙ্গে মুখমণ্ডল ও কানের পেছন থেকে শুরু হয়ে গলা ও বুকজুড়ে ছোট ছোট র‌্যাশ ছড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, চোখ দিয়ে পানি পড়া এবং কাশির মতো উপসর্গ দেখা যায়।

ডা. আবু সাঈদ শিমুল বলেন, হাম শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, ফলে শিশুদের মধ্যে বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হতে পারে। হাম আক্রান্ত শিশু নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানের সংক্রমণ ও অপুষ্টির মতো সমস্যায় ভুগতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এসব জটিলতাই রোগটিকে বিপজ্জনক করে তোলে।

বর্তমানে হামের সংক্রমণ বাড়ার প্রধান কারণ হিসেবে টিকাদানে ঘাটতিকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। তিনি জানান, টিকার স্বল্পতা, বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইনের অভাব এবং অনেক অভিভাবকের টিকা নিতে অনীহার কারণে অনেক শিশু টিকাবঞ্চিত থেকে যাচ্ছে। দেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় শিশুদের দুই ডোজ এমএমআর বা এমআর (হাম-রুবেলা) টিকা দেয়া হয় প্রথমটি ৯ মাস বয়সে এবং দ্বিতীয়টি ১৫ মাস বয়সে। তবে অনেক অভিভাবক সময়মতো টিকা দেয়ার বিষয়টি ভুলে যান। আবার শিশুর জ্বর বা অসুস্থতার কারণে টিকা পিছিয়ে যায় এবং পরে আর দেওয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রে প্রথম ডোজ নেয়ার পর দ্বিতীয় ডোজ না দেয়ার কারণেও শিশুরা সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকে। গত এক বছরে দেশের কিছু এলাকায় টিকার অপ্রতুলতাও পরিস্থিতি জটিল করেছে বলে জানান তিনি।

হাম আক্রান্ত হলে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। যেহেতু এটি ভাইরাসজনিত রোগ, অধিকাংশ ক্ষেত্রে যথাযথ পরিচর্যায় রোগ নিজে থেকেই সেরে যায়। এ সময় রোগীকে পর্যাপ্ত তরল ও পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে এবং শিশুদের ক্ষেত্রে বুকের দুধ খাওয়ানো অব্যাহত রাখতে হবে। 

জ্বর হলে প্যারাসিটামল এবং সর্দি-কাশির ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দিতে হবে। সংক্রমণ ছড়ানো ঠেকাতে আক্রান্ত শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখতে হবে, জনসমাগম এড়িয়ে চলতে হবে এবং সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত স্কুলে পাঠানো যাবে না।

তবে যদি শিশুর শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়, বারবার বমি হয়, অতিরিক্ত দুর্বল হয়ে পড়ে, জ্বরের সঙ্গে খিঁচুনি দেখা দেয় কিংবা অস্বাভাবিক কোনো লক্ষণ দেখা যায়, তাহলে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত করা এবং সচেতনতা বাড়ানোই হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।