বাংলাদেশ, নির্বাচন, বিএনপি, জামায়াত
গণতন্ত্র যখন চাপের মুখে থাকে, তখনও নাগরিকরা স্বৈরাচারী শাসকদের হটিয়ে নবজাগরণ ঘটাতে পারে   ছবি: সংগৃহীত

দেড় বছর আগে মনে হচ্ছিল, বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের বিপর্যয়ের যে ধারা চলছে, বাংলাদেশ হয়তো তার ব্যতিক্রম হতে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, অর্থনৈতিকভাবে হতাশ ও ক্ষুব্ধ তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে গণবিক্ষোভ শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের একনায়কতন্ত্রের পতন ঘটায়। এর মাধ্যমে ভীতি প্রদর্শন ও সংকুচিত রাজনীতির এক দশকেরও বেশি সময়ের শাসনের অবসান ঘটে। সেই মুহূর্তটি কেবল বাংলাদেশেই নয়, বরং দেশের বাইরেও আশার সঞ্চার করেছিল—এটি ছিল প্রমাণ যে, গণতন্ত্র যখন চাপের মুখে থাকে, তখনও নাগরিকরা স্বৈরাচারী শাসকদের হটিয়ে নবজাগরণ ঘটাতে পারে।

বৃহস্পতিবারের জাতীয় ভোট বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক পালাবদলের প্রথম নির্বাচনী পরীক্ষা। কিন্তু গণতান্ত্রিক সংস্কার বা 'রিসেট'-এর সেই প্রবল আশাবাদ এখন অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। শেখ হাসিনার পতনের পর যে নিরাময় বা স্বস্তির সময় আসার কথা ছিল, তার বদলে দেশ দেখেছে লাগাতার সহিংসতা, আমলাতান্ত্রিক ও শিল্প ধর্মঘট, ধ্বংসাত্মক বিক্ষোভ এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। এই অভিজ্ঞতা এমন একটি কঠোর সত্য প্রকাশ করেছে যার প্রভাব উন্নয়নশীল বিশ্ব থেকে শুরু করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমেরিকা পর্যন্ত বিস্তৃত: গণতন্ত্র যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভর করে, সেগুলো যদি ভেতর থেকে ফোকলা হয়ে যায়, তবে গণতান্ত্রিক নবজাগরণ অধরাই থেকে যায়। বাংলাদেশ এখন এই পরিস্থিতির একটি 'কেস স্টাডি' বা দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই দেশটির রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) খালেদা জিয়ার তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ঘিরে। মতাদর্শ ও নীতিগত পার্থক্য সামান্য হলেও, এই দুই নারী নেত্রী ও তাদের দল বছরের পর বছর নির্বাচনে তিক্ত লড়াই চালিয়ে গেছেন। তবুও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হতো। কিন্তু ২০১১ সালে ক্রমশ স্বৈরাচারী হয়ে ওঠা শেখ হাসিনার শাসনামলে সেই ব্যবস্থা বাতিল করা হয়, যার ফলে শুরু হয় নির্বাচনী অনিয়ম ও অবৈধ ভোটের যুগ। স্বজনপ্রীতি ও লুটপাটতন্ত্র (kleptocracy) গভীর আকার ধারণ করে এবং তার সরকার বিরোধীদের দমনে আদালত, পুলিশ ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে ব্যবহার করতে থাকে।

কোটি কোটি বাংলাদেশি আশা করেছিলেন, ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান দেশে স্থিতিশীলতা ও জবাবদিহিতা ফিরিয়ে আনবে। নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় শুরুতে আশাবাদের সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু গভীরভাবে রাজনীতিকৃত ও বিভক্ত রাষ্ট্রযন্ত্রে শৃঙ্খলা ও শান্তি ফিরিয়ে আনতে ড. ইউনূসকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তার প্রশাসনের সুনির্দিষ্ট ম্যান্ডেট এবং প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ব্যাপক সমর্থনের অভাব ছিল। পুলিশ ও বিচার বিভাগের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর তিনি কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। হাসিনার পতনের পর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা অতীতের অপকর্মের জন্য প্রতিশোধের ভয়ে পদত্যাগ করায় এসব প্রতিষ্ঠান আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। বিপ্লবের পর থেকে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মজুরি বৃদ্ধি না পাওয়া এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক চাপে পিষ্ট হয়েছে বহু পরিবার।

বৃহস্পতিবারের ভোটের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও ইতিমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। এর কারণ রাজনৈতিক সহিংসতা, ভোট কেনার অভিযোগ, অন্যান্য অনিয়ম এবং নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা। নির্বাচনের দৌড়ে বর্তমানে এগিয়ে আছে বিএনপি, যার নেতৃত্বে আছেন গত ডিসেম্বরে মারা যাওয়া খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান।

তবে ২০০৮ সালের পর থেকে দেশে প্রকৃত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হয়নি, তাই নির্বাচনের ফলাফল কী হবে তা বোঝা কঠিন। নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশিরা এবার ভোট দিচ্ছে—মোট ভোটারের ৪৩ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৭ বছরের মধ্যে। জরিপগুলো বলছে, অতীতের দলীয় রেষারেষির চেয়ে আইনশৃঙ্খলা, চাকরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরপেক্ষ শাসনের মতো বাস্তব সমস্যাগুলো তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ইসলামপন্থী শক্তিগুলো এই নির্বাচনে আরেকটি বড় ফ্যাক্টর বা 'ওয়াইল্ড কার্ড'। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির প্রান্তে থাকা এই গোষ্ঠীটি বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে আরও সোচ্চার হয়েছে। এতে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, যা দেশটির অন্যতম ভিত্তিপ্রস্তর। সাম্প্রতিক একটি জরিপে দেখা গেছে, প্রথমবারের ভোটারদের ৩৭ শতাংশ বাংলাদেশের বৃহত্তম ধর্মীয় রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। দলটি ইসলামের তুলনামূলক মধ্যপন্থী সংস্করণ প্রচার করে এবং তাদের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর বিকল্প হিসেবে সমর্থন লাভ করেছে। তবে ২০২৪ সালের পর থেকে কিছু কট্টর ইসলামপন্থী গোষ্ঠী নারীদের পোশাকবিধি কঠোর করা, ধর্মনিন্দার জন্য মৃত্যুদণ্ড এবং এমনকি ইসলামি খিলাফত প্রতিষ্ঠার দাবিও তুলেছে। বাংলাদেশ তার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে।

গত নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে যে ভবিষ্যতের নির্বাচনগুলোর জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করা হবে, যদিও এই সপ্তাহের নির্বাচনের জন্য তা কার্যকর হচ্ছে না। বৃহস্পতিবারের ব্যালটে একটি নতুন জাতীয় সনদের ওপর গণভোটও অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যা রাষ্ট্রকে সুষ্ঠু নির্বাচন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং নির্বাহী ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা নিশ্চিত করতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করবে।

তবে এই উচ্চাভিলাষ বাস্তবে রূপ দেওয়া কঠিন হবে। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং তদারকি সংস্থাগুলোর অধিকতর স্বাধীনতাসহ সনদের কিছু মূল বিধানে বিএনপির আপত্তি রয়েছে। আরও কয়েকটি দলও আপত্তি জানিয়েছে। গণভোট পাস হলেও সনদ বাস্তবায়নের জন্য আইন প্রণয়ন, সাংবিধানিক সংশোধনী এবং দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক সহযোগিতার প্রয়োজন হবে, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে অসম্ভাব্য মনে হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি অনেক বেশি।

অতীতে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বাণিজ্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক অচলাবস্থার কুফলগুলো আড়াল করে রেখেছিল। অভ্যুত্থানের পর অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। যদিও স্থিতিশীলতার কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, নতুন নেতাদের এমন এক বৈশ্বিক পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে যা মোটেও ক্ষমাশীল নয়—যেখানে বাড়ছে সংরক্ষণবাদ, ভেঙে পড়ছে সরবরাহ ব্যবস্থা এবং রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ।

ভারতের সঙ্গেও সম্পর্কের টানাপড়েন দেখা দিয়েছে, যা বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সম্পর্ক। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ায় বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন নেতা ও আন্দোলনকারীরা ক্ষুব্ধ। তারা চান হাসিনাকে দেশে এনে বিচার করা হোক। অন্যদিকে ভারত অভিযোগ করেছে যে ঢাকা বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা দমনে ব্যর্থ হয়েছে। এই উত্তেজনা ইতিমধ্যে ভিসা স্থগিত এবং বাণিজ্যে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে।

বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের শিক্ষা তার সীমান্তের গণ্ডি ছাড়িয়ে বহুদূর বিস্তৃত। ২০১০-এর দশকের আরব বসন্ত থেকে শুরু করে শ্রীলঙ্কা, নেপাল, দক্ষিণ আমেরিকা এবং অন্যান্য স্থানে সাম্প্রতিক অস্থিরতা রাজনৈতিক পরিসর উন্মুক্ত করেছিল। কিন্তু গণতান্ত্রিক উত্তরণকে এগিয়ে নেওয়ার মতো নিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অভাবে সেই অর্জনগুলো হারিয়ে গেছে অথবা ভঙ্গুর অবস্থায় রয়ে গেছে।

এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ড আদালত, আইনি কর্তৃপক্ষ এবং সরকারি সংস্থাগুলোকে দলীয় দ্বন্দ্বে টেনে এনে এবং নির্বাচনের ফলাফলকে প্রশ্নবিদ্ধ করে মার্কিন গণতন্ত্রের স্তম্ভগুলোকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করার হুমকি দিচ্ছে। স্বৈরশাসকদের ক্ষমতাচ্যুত করা যায়। কিন্তু তারা যে ক্ষতি করে যায়, তা মেরামত করাই গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

সূত্র : নিউইয়র্ক টাইমস

আরটিএনএন/এআই