ইরান, ট্রাম্প, খোমেনি, বিক্ষোভ
ইরানি কর্তৃপক্ষ ব্যক্তিগত মালিকানাধীন বেশ কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে   ছবি: সংগৃহীত

গত মাসে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী বিক্ষোভের পর ইরানি কর্তৃপক্ষ ব্যক্তিগত মালিকানাধীন বেশ কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে। দেশটির ধসে পড়া অর্থনীতি যখন জনগণ ও ব্যবসায়ীদের ওপর বড় ধরনের আঘাত হানছে এবং সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি জটিল কূটনৈতিক পথে হাঁটছে, ঠিক তখনই এই পদক্ষেপ নেওয়া হলো।

তেহরানের কেন্দ্রস্থল ও উত্তরাঞ্চলের তরুণদের প্রিয় আড্ডাস্থল হিসেবে পরিচিত এসব প্রতিষ্ঠান কেন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ বা বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ কেউই বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি। তবে বন্ধ হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকেই হয় ধর্মঘটে অংশ নিয়েছিল, অথবা ডিসেম্বরের শেষে শুরু হওয়া দেশব্যাপী বিক্ষোভের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ইনস্টাগ্রামে স্টোরি শেয়ার করেছিল।

গত কয়েক দিনে জনসমাগমস্থল বা পাবলিক স্পেস তদারকির দায়িত্বে থাকা পুলিশ বিভাগ ডজনখানেক ছোট ও মাঝারি আকারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে—যার মধ্যে রেস্তোরাঁ, ক্যাফে, রোস্টারি (কফি শপ), আর্ট গ্যালারি এবং আইসক্রিমের দোকান রয়েছে। বন্ধ হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর সোশ্যাল মিডিয়া পেজে দেওয়া নোটিশে বলা হয়েছে, তাদের কন্টেন্ট বা বিষয়বস্তু "দেশের আইন লঙ্ঘন করেছে এবং পুলিশের নিয়ম মেনে চলেনি"।

সোমবার, ইরানের ইসলামিক রিভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফার্স নিউজ এজেন্সি একটি স্বীকারোক্তিমূলক চিঠির ছবি প্রকাশ করেছে। ওই চিঠিতে মোহাম্মদ আলী সায়েদিনিয়া নামের এক বেসরকারি ব্যবসায়ীর স্বাক্ষর রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

৮১ বছর বয়সী এই ব্যবসায়ী ও তাঁর পরিবার সারা দেশে বেশ কিছু জনপ্রিয় ক্যাফে ও ফুড ব্র্যান্ড পরিচালনা করতেন, যেগুলোর কয়েক ডজন শাখা রয়েছে। বিচার বিভাগ গত সপ্তাহে নিশ্চিত করেছে যে, বিক্ষোভ-পরবর্তী সময়ে তিনি কারাগারে রয়েছেন। তাঁর সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং অস্থিরতার সময় হওয়া ক্ষতির ক্ষতিপূরণ হিসেবে তাঁর সমস্ত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

স্বীকারোক্তিমূলক চিঠিতে বলা হয়েছে, "দুর্ভাগ্যবশত, সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে সৃষ্ট সমস্যা এবং কারখানার অর্থায়নের কারণে আমার ছেলে ভুলবশত তেহরান বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের দোকানগুলো বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছিল।" "সে এবং আমি এখন আমাদের ভুল সম্পূর্ণভাবে বুঝতে পেরেছি এবং প্রিয় জনগণের কাছে ক্ষমা চাইছি। কারণ কোনো সমস্যা থাকলে আমাদেরই সতর্ক থাকতে হবে, যাতে ইরান ও ইসলামের শত্রুরা এর অপব্যবহার করতে না পারে।"

ইরান সরকার জানিয়েছে, এই অস্থিরতায় ৩ হাজার ১১৭ জন মানুষ নিহত হয়েছে। তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অর্থায়ন ও অস্ত্রসজ্জিত "সন্ত্রাসী" এবং "দাঙ্গাবাজদের" এই হত্যাযজ্ঞ এবং বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ সরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের জন্য দায়ী করেছে।

অন্যদিকে জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো জানিয়েছে, শিশুসহ বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের ব্যাপক প্রমাণ তাদের কাছে রয়েছে। তারা হাসপাতালে অভিযান এবং চিকিৎসাকর্মীদের গ্রেপ্তারের বিষয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভে ৬ হাজার ৯৬৪ জন নিহত হয়েছে এবং আরও ১১ হাজার ৭৩০টি ঘটনা তদন্তাধীন রয়েছে। ইরান বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ার মাই সাতো বলেছেন, নিহত বেসামরিক নাগরিকের সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে, কারণ রাষ্ট্রের কঠোর ইন্টারনেট সেন্সরশিপের কারণে তথ্য খুবই সীমিত আকারে পাওয়া যাচ্ছে।

অর্থনীতিতে চরম বিপর্যয়

হত্যাকাণ্ডের ঘটনার এক মাসেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের আশঙ্কা এখনও কাটেনি। এর মধ্যেই ইরানের অর্থনীতি ক্রমশ চাপের মুখে পড়ছে। মঙ্গলবার দেশটির জাতীয় মুদ্রা রিয়ালের মান ডলার প্রতি প্রায় ১.৬২ মিলিয়নে নেমে এসেছে, যা গত মাসে রেকর্ড করা সর্বকালের সর্বনিম্ন মানের কাছাকাছি।

তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে প্রায় সব দোকানপাট খোলা এবং প্রয়োজনে কিছু কার্যক্রম শুরু হয়েছে, কিন্তু তা বিক্ষোভের আগের পরিস্থিতির তুলনায় অনেক কম। চীন থেকে আমদানিকৃত বৈদ্যুতিক মোটর বিক্রেতা এক ব্যবসায়ী আল জাজিরাকে বলেন, "সপ্তাহখানেক ধরে বিক্রি খুবই কম ছিল, এখন তা আগের তুলনায় হয়তো ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে। আর আমরা তো বিভিন্ন শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বিক্রি করি।"

তিনি আরও বলেন, "লেনদেন যতটা সম্ভব নগদেই করা হচ্ছে। এমনকি এক থেকে দুই মাসের জন্যও চেকে লেনদেনে কারও আগ্রহ নেই।" শহরের কেন্দ্রস্থলে জমহুরি ব্যবসায়িক এলাকার দোকানপাটও খোলা রয়েছে। গত ২৮ ডিসেম্বর জাতীয় মুদ্রার মান ধসের প্রতিবাদে এই এলাকার দোকানদাররাই প্রথম বিক্ষোভের সূচনা করেছিলেন। তবে এখনও সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি রয়েছে। তারা মাঝে মাঝে চেকপয়েন্ট বসিয়ে তল্লাশি চালায় এবং রাস্তায় টহল দেয়।

সংস্কারপন্থী পত্রিকা 'শার্গ' সোমবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, অস্থিরতার সময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাশাপাশি স্কুলগুলোও বন্ধ করে দিয়েছিল কর্তৃপক্ষ। এখন স্কুলগুলো সন্তানদের পাঠানোর জন্য নিরাপদ কি না, তা নিয়ে অনেক অভিভাবকই দ্বিধায় রয়েছেন। তাদের এই সিদ্ধান্তহীনতার কারণে অনেক শ্রেণিকক্ষ প্রায় ফাঁকা থাকছে।

১৯৭৯ সালের বিপ্লব উদযাপনের প্রস্তুতি

১৯৭৯ সালের বিপ্লবে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট ইরানের শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভিকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল। বুধবার সেই বিপ্লব বার্ষিকী উদযাপনের জন্য দেশটির ধর্মীয় সরকার বা থিওক্রেটিক এস্টাবলিশমেন্ট দেশজুড়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করেছে। সোমবার এক ভাষণে সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি ইরানিদের রাষ্ট্র-আয়োজিত মিছিল ও সমাবেশে অংশ নিয়ে "শত্রুকে হতাশ" করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি এই সমাবেশগুলোকে বিশ্বে "অতুলনীয়" বলে অভিহিত করেছেন।

প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তারাও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে জনগণকে সমাবেশে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সায়েদিনিয়ায়ের স্বাক্ষরিত সেই স্বীকারোক্তিমূলক চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, ব্যবসায়ী ও তাঁর ছেলে "অপরাধী আমেরিকার প্রতি ঘৃণা" প্রদর্শন করতে এই সমাবেশে অংশ নেবেন।

সরকারের প্রাণঘাতী দমন অভিযানের পর পরিবর্তনের আহ্বান জানানো শীর্ষস্থানীয় সংস্কারপন্থী নেতাদেরও এই সপ্তাহের শুরুতে গ্রেপ্তার করেছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। তাদের সবাইকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের "স্বার্থে" কাজ করার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। গত মাস থেকে গ্রেপ্তার হওয়া হাজার হাজার মানুষের সাথে তারাও যুক্ত হলেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান শুক্রবার ওমানের মধ্যস্থতায় পরোক্ষ আলোচনা করলেও, উভয় পক্ষই পাল্টাপাল্টি হুমকি অব্যাহত রেখেছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে তাদের যুদ্ধজাহাজ ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করছে। মঙ্গলবার ইরানের নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানি মাস্কাটে ওমানের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। অন্যদিকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছেন। তিনি ট্রাম্পকে ইসরায়েলের দাবির পক্ষে এবং ইরান ও তার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যুতে তাদের অবস্থান সমর্থন করার জন্য চাপ দেবেন।

ইসরায়েলি গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ট্রাম্প এই বৈঠকটি ক্যামেরার আড়ালে করার অনুরোধ জানিয়েছেন। এতে বোঝা যায় যে ওয়াশিংটন আপাতত তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক পথ খোলা রাখায় কিছু বিষয়ে মতভেদ থাকতে পারে।

সূত্র : আল জাজিরা

আরটিএনএন/এআই