মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট, পাম্প, যানবাহনের ভিড় ,
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানি তেল ও গ্যাস বিক্রির পাম্পগুলোয় যানবাহনের ভিড় ও দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। মিরপুর, ১, ১২, ১৪, কল্যাণপুর, শেওরাপাড়াসহ বেশ কিছু পাম্পে আবার জ্বালানি তেল বিক্রি বন্ধ রাখা হয়।   ছবি: আরটিএনএন

ধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। এতে আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি ঘিরে সম্ভাব্য জ্বালানি সংকটের গুজব ছড়িয়ে পড়ায় পেট্রোল পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেল কিনতে ক্রেতার অস্বাভাবিক ভিড় দেখা গেছে। অনেকেই আগেভাগে মজুতের আশঙ্কায় ট্যাঙ্ক পূর্ণ করে তেল নিচ্ছেন। ফলে হঠাৎ করে পেট্রোল-অকটেন-ডিজেলের চাহিদা বেড়ে গেছে। দিনশেষে রাতেও তাই ফিলিং স্টেশনে গাড়ির জট দেখা গেছে।

ক্রেতার চাপে কোথাও কোথাও বিক্রি সাময়িক বন্ধ রাখার ঘটনাও ঘটেছে। তেল ডিপোগুলোতেও গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ ডিজেল বিক্রি হয়েছে। 

বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) রাত ১০টার পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার পেট্রোল পাম্প ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

সংকটের’ শঙ্কা ডিজেল-পেট্রোল কিনতে ডিপো ও পাম্পে অস্বাভাবিক ভিড়

আরটিএনএন প্রতিবেদক রায়হান জানান, তেল নিতে গিয়েৃ রাত ১২ পরও রাজধানীর মিরপুর ২ নম্বর ফিলিং স্টেশনের সরেজমিন চিত্রে দেখা গেছে বাইকের দীর্ঘ  লাইন আর মিরপুর ১৪ নম্বর স্টেশন আরও আগেই বন্ধ।

পরিস্থিতি সামলাতে তেলের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে বিপিসি। সংস্থাটি বলছে, জ্বালানি তেল নিয়ে একাধিক জাহাজ বন্দরে ভিড়েছে। আরও জাহাজ আসছে। তাই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। 

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানি তেল বিক্রয়কেন্দ্রেও অস্বাভাবিক ভিড় দেখা গেছে। মিরপুর, কল্যাণপুর, টেকনিক্যাল, গাবতলী, মালিবাগ, তেজগাঁও, আসাদগেট, নিউমার্কেটসহ বিভিন্ন এলাকার পাম্পে যানবাহনের দীর্ঘ সারি সড়ক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। অধিকাংশ চালক ট্যাঙ্ক পূর্ণ করে তেল নিচ্ছেন। ফলে কিছু পাম্পে মজুত দ্রুত কমে গেছে। 

মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার চৌধুরী ফিলিং স্টেশনে রাইড শেয়ারিং চালক সোহেল বলেন, সাধারণত দিনে দুই থেকে তিনবার অকটেন নেন। কিন্তু লোকজন বলছে, দুদিন পর তেল পাওয়া যাবে না। তাই পুরো ট্যাঙ্ক ভরেছেন। এই পাম্পের ম্যানেজার নজরুল বলেন, সাধারণত তাদের কাছে ২০ থেকে ২৭ হাজার লিটার তেল মজুত থাকে। কিন্তু অতিরিক্ত চাহিদায় তা দ্রুত কমে গেছে। তাই আপাতত শুধু গাড়িতে তেল দেয়া হচ্ছে।

নিউমার্কেট এলাকার একটি পাম্পের কর্মীরা জানান, বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত গাড়ির চাপ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দেড় থেকে দুই গুণ ছিল। মজুত কমে যাওয়ায় গতকাল বেলা ১০-১১টার পর অনেক পাম্পে তেল বিক্রি বন্ধ করে দেয়া হয়। তেজগাঁওয়ের সিটি ফিলিং স্টেশনের কর্মী আমিনুল বলেন, ডিপো থেকে গাড়ি আসছে না। মজুত কমে গেছে। তাই বিক্রি বন্ধ রেখেছেন।

বেশি টাকা নেয়ার অভিযোগ

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ডিজেল সংকটের গুজব ছড়িয়ে পড়ায় বিভিন্ন দোকান ও পেট্রোল পাম্পে ক্রেতার উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। এ সুযোগে কিছু ব্যবসায়ীর লিটারপ্রতি ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ইরানে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ডিজেলের দাম বাড়তে পারে– এমন আশঙ্কায় কৃষক, শ্যালো মেশিন মালিক ও যানবাহন শ্রমিকরা আগেভাগে ডিজেল কিনছেন। ইরি-বোরো মৌসুমে সেচের জন্য ডিজেল প্রয়োজন হওয়ায় কৃষকদের উদ্বেগ বাড়ছে। উথলীর পাম্পের স্টেশন ম্যানেজার জব্বার বলেন, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ ডিজেল বিক্রি হচ্ছে। 

শত শত ট্যাঙ্ক-লরির দীর্ঘ সারি

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে গোদনাইল এলাকায় পদ্মা ও মেঘনা অয়েল ডিপোতে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই শত শত ট্যাঙ্ক-লরির দীর্ঘ সারি দেখা যায়। তেল সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া এবং সরবরাহে বিলম্ব হওয়ায় ডিপোর ভেতর থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ট্যাঙ্ক-লরির লাইন নারায়ণগঞ্জ-শিমরাইল সড়কে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। দুপুরের পর সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হলেও সড়কে তীব্র যানজট দেখা যায়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কায় পেট্রোল পাম্প মালিক ও এজেন্টরা বেশি করে তেল সংগ্রহ করতে লরি নিয়ে ডিপোতে ভিড় করছেন। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সংকট হতে পারে– এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ায় তেলের চাহিদা বেড়ে গেছে বলে মনে করছেন তারা।

গোদনাইলের মেঘনা অয়েল ডিপোর ব্যবস্থাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী পাম্প মালিকদের ২০ শতাংশ এবং এজেন্টদের ৫০ শতাংশ কম তেল দিতে হচ্ছে। ডিপোতে পর্যাপ্ত তেল মজুত রয়েছে; সংকটের কোনো আশঙ্কা নেই। তবে পরিদর্শন কার্যক্রমের কারণে সরবরাহে কিছুটা বিলম্ব হওয়ায় ট্যাঙ্ক-লরির দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। একই এলাকার পদ্মা অয়েল ডিপোর ব্যবস্থাপক আমিনুল হক বলেন, ডিপোতে তেলের মজুত স্বাভাবিক।

ডিপো এলাকায় অপেক্ষমাণ চালকদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। গাজীপুর থেকে আসা ট্যাঙ্ক-লরি চালক আয়মান বলেন, সকাল ৮টায় এসে লাইনে দাঁড়িয়েছি, এখন দুপুর ১টা। কখন তেল পাব, জানি না! প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে জটে আটকে আছি। 

আরেক চালক বুলবুল জানান, সকাল সাড়ে ৯টায় পদ্মা ডিপোতে এসে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে লরির জটে আটকে পড়েছেন। তিন ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছেন। ট্যাঙ্ক-লরি চালক আনোয়ার বলেন, যুদ্ধের কারণে তেল সংকট হতে পারে– এ আশঙ্কায় অনেকেই বেশি তেল মজুত করতে চাইছেন।

সংকটের’ শঙ্কা ডিজেল-পেট্রোল কিনতে ডিপো ও পাম্পে অস্বাভাবিক ভিড়

কমছে মজুত

দেশে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের মজুত তুলনামূলক কমে এসেছে। তথ্য অনুযায়ী, ডিজেলের সংরক্ষণ সক্ষমতা ৬ লাখ ২৪ হাজার ১৮৯ টন। এর মধ্যে ব্যবহারযোগ্য মজুত রয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার ৯৪০ টন, যা মোট সক্ষমতার প্রায় ২৯ শতাংশ। গত ১ থেকে ৪ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৪ হাজার ৪৭৮ টন ডিজেল বিক্রি হয়েছে। এই হিসাবে বর্তমান মজুত দিয়ে প্রায় সাত দিনের সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব।

অন্যদিকে অকটেনের সংরক্ষণ সক্ষমতা ৫৩ হাজার ৬১৬ টন। বর্তমানে মজুত রয়েছে ২৮ হাজার ৪৮৮ টন, যা সক্ষমতার প্রায় ৫৩ শতাংশ। গত চার দিনে প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই হাজার টন অকটেন বিক্রি হয়েছে। বর্তমান মজুত দিয়ে প্রায় ১৪ দিন সরবরাহ চালানো যাবে।

এ ছাড়া পেট্রোলের সংরক্ষণ সক্ষমতা ৩৭ হাজার ১৩ টন। বর্তমানে মজুত রয়েছে ১৮ হাজার ২৬৩ টন, যা সক্ষমতার প্রায় ৪৯ শতাংশ। গত ১ থেকে ৪ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৩৪৫ টন পেট্রোল বিক্রি হয়েছে। এ হিসাবে বর্তমান মজুত দিয়ে প্রায় আট দিন সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব।

তবে বিপিসি জানিয়েছে, ৩০ হাজার ও ২৭ হাজার টন জ্বালানি তেল নিয়ে দুটি জাহাজ চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে এসেছে। আরও জাহাজ আসছে। হরমুজ প্রণালির কারণে সৌদি আরবে দুটি জাহাজ আটকে গিয়েছিল। সে জন্য ইউনিপ্যাকসহ কয়েকটি কোম্পানিকে তেল সরবরাহে চিঠি দেয়া হয়েছে। 

ফলে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে– দাবি বিপিসির। তবে সংস্থাটির একটি সূত্র জানিয়েছে, চুক্তিবদ্ধ কোম্পানিগুলো যুদ্ধ সংকটকে পুঁজি করে প্রিমিয়াম বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

বিপিসি সূত্র জানিয়েছে, মার্চের ১ থেকে ৪ তারিখে ডিজেল বিক্রি হয়েছে ৯৫ হাজার টন, যেখানে গত বছর একই সময়ে বিক্রি হয়েছে ৪৫ হাজার টন। অকটেন ও পেট্রোলের বিক্রিও বেড়েছে। 

পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির একাংশের সভাপতি নাজমুল হক বলেন, আতঙ্কজনিত কারণে গ্রাহকরা বেশি বেশি তেল কিনছেন। আবার বিপিসি সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে।  

মার্চ মাসে দেয়া বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) তথ্য বলছে, দেশে ডিজেল প্রায় ১৪ দিনের, পেট্রোল প্রায় ১৫-১৭ দিনের, অকটেন প্রায় ২৮ দিনের, ফার্নেস অয়েল প্রায় ৯৩ দিনের, জেট ফুয়েল প্রায় ৫৫ দিনের মজুত আছে।

সরকারি তথ্যের হিসাবে এখনই জ্বালানি সংকট তৈরি হওয়ার কথা না।তবে সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে জনগণকে সাশ্রয়ী হওয়ায় আহ্বান জানিয়েছে।

আর/এস