রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে ডিজেল সংকটের যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা এক ধরনের ‘কৃত্রিম সংকট’ বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত থাকার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে পরিবহন খাতের চালক ও মালিকদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। চাহিদামতো ডিজেল না পাওয়ায় লোকাল ও দূরপাল্লার বাসের ট্রিপ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়াতে পারে।
সরকারি রেশনিং ব্যবস্থায় প্রতিটি লোকাল বাসের জন্য দিনে ৭০–৮০ লিটার এবং দূরপাল্লার বাসের জন্য ২০০–২২০ লিটার ডিজেল বরাদ্দের কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে এই বরাদ্দের খুব সামান্য অংশই পাওয়া যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে লোকাল বাস চালকরা ২০–২৫ লিটার এবং দূরপাল্লার বাসগুলো ৪০–৫০ লিটারের বেশি তেল পাচ্ছেন না। ফলে যানজটপূর্ণ ঢাকা শহরে প্রয়োজনীয় ট্রিপ সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক চালক জানিয়েছেন, দিনে দুই থেকে তিনটি ট্রিপ দিতে তাদের অন্তত ৫০–৭০ লিটার ডিজেল দরকার হয়। কিন্তু সেই পরিমাণ তেল না পাওয়ায় ট্রিপ কমানো ছাড়া বিকল্প থাকছে না।
বাসচালকদের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, এই সংকট সরাসরি পরিবহন সেবায় প্রভাব ফেলছে। কোনো কোনো বাস দিনে তিনটি ট্রিপে ১১০–১১৫ লিটার ডিজেল ব্যবহার করলেও বাস্তবে তারা দুই পাম্প ঘুরে মাত্র ৮০ লিটার তেল সংগ্রহ করতে পারছেন। আবার কোথাও প্রয়োজন ৬০ লিটার হলেও দেওয়া হচ্ছে মাত্র ২০ লিটার। ফলে চালকদের বারবার পাম্পে যেতে হচ্ছে, এতে সময়ের অপচয় হচ্ছে এবং যাত্রীসেবার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে।
ফিলিং স্টেশনগুলোতে সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক পাম্পেই ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলছে। পাম্পকর্মীদের মতে, রেশনিং পদ্ধতি চালুর আগে অতিরিক্ত বিক্রির কারণে অনেক স্টেশনের মজুত শেষ হয়ে গেছে। এছাড়া সরকারি ছুটির কারণে তেলবাহী গাড়ি সময়মতো না আসায় সরবরাহে সাময়িক ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে সীমিত মজুত থেকে অল্প অল্প করে তেল দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) দাবি করছে, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই। তাদের তথ্যমতে, অর্ডার করা বেশ কয়েকটি তেলবাহী কার্গো ইতোমধ্যে দেশে পৌঁছেছে এবং আরও কার্গো আসার কথা রয়েছে। এপ্রিল পর্যন্ত ডিজেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা আছে বলেও কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং মানুষের আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত মজুদের প্রবণতা সাময়িক চাপ তৈরি করেছে।
এখানেই তৈরি হয়েছে বাস্তবতা ও সরকারি বক্তব্যের মধ্যে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য। যদি দেশে সত্যিই পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত থাকে, তবে ফিলিং স্টেশনগুলোতে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড কেন? আবার যদি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে, তবে পরিবহন খাত কেন প্রয়োজনীয় তেল পাচ্ছে না? এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট উত্তর না থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
এদিকে পরিস্থিতি সামাল দিতে ফিলিং স্টেশনগুলোতে পুলিশি টহল জোরদারের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে বিপিসি। তাদের মতে, অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ এবং অননুমোদিত মজুতের প্রবণতা বাড়ায় কিছু স্থানে ক্রেতা ও পাম্পকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি বলছে, এটি হয়তো সরাসরি জ্বালানি ঘাটতি নয়; বরং সরবরাহ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, আতঙ্কজনিত মজুত এবং রেশনিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার ফলে তৈরি হওয়া এক ধরনের ‘কৃত্রিম সংকট’। তবে এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে গণপরিবহন ব্যবস্থায় এবং শেষ পর্যন্ত ভোগান্তির শিকার হবেন সাধারণ যাত্রীরাই।
যত দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক করা যাবে এবং বাজারে আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা যাবে, তত দ্রুত এই কৃত্রিম সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। অন্যথায় সামনে ঈদ মৌসুমে পরিবহন খাতে চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!