বাংলাদেশে শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় টিকার সাম্প্রতিক সংকট নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। এই সংকটের পেছনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেয়া কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং বাস্তবায়নে ঘাটতির বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। একইসঙ্গে হামের প্রাদুর্ভাব ও শিশু মৃত্যুর ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
টিকা কেনার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল ছিল। ১৯৯৮ সালে চালু হওয়া স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টিখাত কর্মসূচি (এইচপিএনএসপি) বা সেক্টর প্রোগ্রামের আওতায় শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হতো। এই কর্মসূচির অংশ হিসেবেই সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) পরিচালিত হয়েছে বছরের পর বছর। টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতা ছিল গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে গাভি দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্সের আর্থিক সহায়তায় ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা হতো। এতে প্রক্রিয়াটি তুলনামূলকভাবে দ্রুত ও ঝামেলাহীন ছিল।
তবে দাতানির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে ধীরে ধীরে এই ব্যবস্থার বাইরে আসার পরিকল্পনা করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল নিজস্ব আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যখাতকে রাজস্ব খাতের আওতায় আনা। এই পরিকল্পনার ধারাবাহিকতায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেক্টর প্রোগ্রাম বাতিল করে সরাসরি টিকা কেনার উদ্যোগ নেয়।
নীতিগতভাবে এই পরিবর্তনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রস্তুতির অভাব ছিল বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। ইউনিসেফকে বাদ দিয়ে সরাসরি টিকা কেনার প্রক্রিয়া শুরু করতে গেলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আপত্তি ওঠে। পরে আবার ইউনিসেফকে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও এর মধ্যে কয়েক মাস সময় পার হয়ে যায়। অর্থ ছাড়, হিসাব নিরীক্ষা ও প্রশাসনিক জটিলতায় আরও বিলম্ব ঘটে। ফলে প্রায় ছয় মাস টিকা কেনার কার্যক্রম কার্যত বন্ধ থাকে।
এই বিলম্বের প্রভাব দ্রুতই মাঠপর্যায়ে দেখা দেয়। ২০২৫ সালের শেষ দিকে দেশের বিভিন্ন জেলায় শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় টিকার ঘাটতি দেখা দেয়। অনেক অভিভাবক একাধিকবার টিকাকেন্দ্রে গিয়েও শিশুদের টিকা দিতে পারেননি। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিতভাবে ধাপে ধাপে পরিবর্তন আনার পরিবর্তে হঠাৎ করে সেক্টর প্রোগ্রাম বাতিল করাই এই সংকটের অন্যতম কারণ।
এদিকে টিকা সংকটের প্রেক্ষাপটে হামের প্রাদুর্ভাব নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় হামে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। পাঁচ শতাধিক মানুষ আক্রান্ত হয়েছে, যাদের অধিকাংশই শিশু। ইতোমধ্যে তিন ডজনের বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যদিও এসব মৃত্যু সরাসরি হামের কারণে হয়েছে কি না তা এখনো নিশ্চিত নয় বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
চিকিৎসকরা বলছেন, হামের টিকার দুই ডোজ সম্পূর্ণ না পাওয়া, অপুষ্টি, বুকের দুধ না খাওয়ানো এবং কৃমিনাশক ওষুধ না নেয়ার মতো কারণগুলো এই সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এবার নয় মাসের কম বয়সী শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে, যেখানে সাধারণত নয় মাস বয়সের পর প্রথম ডোজ দেয়া হয়।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে কারণ নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির বাইরে যে বিশেষ হামের টিকাদান ক্যাম্পেইন প্রতি চার বছর পরপর করা হয়, সেটি ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত হয়নি। করোনা মহামারি এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এই কর্মসূচি বন্ধ ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বর্তমানে শুধু হামের টিকা নয়, যক্ষা, পোলিও, নিউমোনিয়া, ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি ও ধনুষ্টংকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ রোগের টিকারও ঘাটতি রয়েছে বলে বিভিন্ন জেলা থেকে তথ্য পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও স্বীকার করেছে যে তাদের কেন্দ্রীয় মজুদ সন্তোষজনক নয়।
এই সংকট মোকাবিলায় নতুন সরকার জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিয়েছে। সরদার মো. সাখাওয়াত হোসাইনের নেতৃত্বে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হামের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি এগিয়ে এনে ৫ এপ্রিল থেকে শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি সংক্রমণপ্রবণ এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে এই কর্মসূচি পরিচালিত হবে এবং মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
একইসঙ্গে হামের প্রথম ডোজ দেয়ার বয়স নয় মাস থেকে কমিয়ে ছয় মাস নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ এই কর্মসূচির আওতায় ছয় মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুরা টিকা পাবে। ইতোমধ্যে প্রায় ৯০ লাখ ডোজ হামের টিকা সংগ্রহ করা হয়েছে এবং সিরিঞ্জ সংকটও সমাধান করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার। এছাড়া অন্যান্য প্রয়োজনীয় টিকা কেনার জন্য নতুন করে প্রায় ছয়শ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতে, নীতিগত পরিবর্তন যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া বাস্তবায়ন করায় টিকা ব্যবস্থায় যে বিঘ্ন ঘটেছে, তার প্রভাব এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্য খাতে আরও বড় ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!