বাগেরহাটের মোংলার বাসিন্দা বাদল ফরাজির স্বপ্ন ছিল তাজমহল দেখা। সেই স্বপ্ন নিয়েই ২০০৮ সালের ১৩ জুলাই বৈধ পর্যটক ভিসায় তিনি ভারতে যান। কিন্তু সীমান্ত পার হওয়ার পরপরই শুরু হয় তার জীবনের ভয়াবহতম অধ্যায়। বাংলাদেশের বেনাপোল সীমান্ত অর্থাৎ ভারতের হরিদাসপুর সীমান্ত অতিক্রম করার পর ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী তাকে আটক করে। কারণ, তাকে ভুলভাবে শনাক্ত করা হয় ‘বাদল সিং’ হিসেবে; যিনি ২০০৮ সালের ৫ মার্চ নয়াদিল্লির অমর কলোনিতে সংঘটিত এক বৃদ্ধা হত্যা ও ডাকাতি মামলার আসামি ছিলেন।
যাবজ্জীবন সাজা ও তিহার কারাগার
পাসপোর্টে বাদল ফরাজির পরিচয় যাচাই করার কোনো চেষ্টা করেনি ভারতীয় পুলিশ। বরং বাদল সিং নাম দিয়ে আদালতে পাঠানো হয় তাকে। এই ভুল পরিচয়ের ভিত্তিতেই বিচারিক প্রক্রিয়া এগোয় এবং ২০১৫ সালের ২২ আগস্ট দিল্লির সাকেত আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এরপর তিনি তিহার কারাগার-এ দীর্ঘ বছর বন্দি জীবন কাটান। কারাগারে থেকেও তিনি থেমে থাকেননি। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেন, যা তার মানসিক দৃঢ়তার প্রমাণ বহন করে। তবে সীমান্তে যখন তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিলো, তখন তিনি ইংরেজি কিংবা হিন্দি কোনো ভাষাতেই পারদর্শী বা ন্যূনতম কথা বলার মতোও যোগ্যতা রাখতেন না, কিন্তু পরবর্তীতে তিনি জেদের বসে ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জন করে কারাগারেই বন্দীদের ইংরেজি ভাষা শেখানোর শিক্ষকতাও করেন বলে জানা যায়।
প্রত্যর্পণ কিন্তু মুক্তি নয়
২০১৮ সালের ৬ জুলাই বন্দি বিনিময় চুক্তির আওতায় তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়। কিন্তু দেশে ফিরে মুক্তি তো দূরের কথা বরং তাকে আবারও কারাগারে রাখা হয়। বাদল ফরাজির পরিচয় নিশ্চিত হয়ে ভারতের কাছে সাজা মওকুফ ও মুক্তির কোনো চেষ্টা করেনি বাংলাদেশের সরকারও। এমনকি সাজার মেয়াদ শেষ হলেও, তার মুক্তির বিষয়ে উদ্যোগ নেই সরকারের! বর্তমানে তিনি গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১-এ বন্দি রয়েছেন।
আইনি জটিলতায় আটকে স্বাধীনতা
ভারতের আইন অনুযায়ী, যাবজ্জীবন সাজায় ১৪ বছর ‘প্রকৃত সাজাভোগ’ হিসেবে গণ্য হয়। সেই হিসাবে বহু আগেই তার মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো- ১৬ বছরের বেশি সময় কারাভোগের পরও তার মামলা ভারতের ‘সেন্টেন্স রিভিউ বোর্ড’-এ পর্যন্ত উপস্থাপন করা হয়নি।
দুই দেশের আইনি কাঠামোর অসামঞ্জস্য এবং প্রশাসনিক গাফিলতির কারণে তার মুক্তি অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে আছে- এমন বক্তব্য জেল কর্তৃপক্ষের। তবে দায় এড়ানোর কৌশল হিসেবে ভারত বাদল ফরাজির বিষয়ে নিরুত্তর থাকছে বলে মনে করছেন তার পরিবার।
আদালতের অবস্থান
২০১৮ সালের ১১ জুলাই আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) দায়ের করা এক জনস্বার্থ রিট হাইকোর্ট খারিজ করে দেয়। আদালত পর্যবেক্ষণে স্পষ্টভাবে জানায়, বিদেশে দণ্ডপ্রাপ্ত ও প্রত্যর্পিত ব্যক্তিকে বর্তমান আইনি কাঠামোর মধ্যে সরাসরি মুক্তি দেওয়ার সুযোগ নেই। এই অবস্থান কার্যত বাদলের মুক্তির পথকে আরও জটিল করে তোলে।
আইনি নোটিশ ও ক্ষতিপূরণ দাবি
সাম্প্রতিক সময়ে সুপ্রিম কোর্টের দুইজন আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান ও মহিউদ্দিন জুয়েল একটি আইনি নোটিশের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে ৭ দিনের মধ্যে ভারতের কাছে ১ কোটি মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করার আহ্বান জানিয়েছেন।
নোটিশে বলা হয়, ভুল পরিচয়ে অন্য একজন ‘বাদল সিং’-এর মামলায় আটক থাকার কারণে বাদল ফরাজির এই দীর্ঘ কারাবাস সম্পূর্ণ অন্যায় ও বেআইনি। একই সঙ্গে তার অবিলম্বে মুক্তির দাবিও জানানো হয়।
নোটিশটি জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, কারা মহাপরিদর্শক এবং কাশিমপুর কারাগার কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী কূটনৈতিক দায়মুক্তির কারণে এতে ভারতীয় হাইকমিশনকে বিবাদী করা হয়নি।
ক্ষতিপূরণ দাবি ও পরিবার
বাদলের পরিবারের পক্ষ থেকেও একই দাবি জানানো হয়েছে। দীর্ঘ কারাবাসে তাদের পরিবার কার্যত ভেঙে পড়েছে। পিতা ইতোমধ্যে মারা গেছেন আর ৭১ বছর বয়সী মা শয্যাশায়ী অবস্থায় দিন গুনছেন।
বাদলের বড় বোন আকলিমা বলেন, ‘আমার ভাইকে দ্রুত মুক্তি দেওয়া হোক। অন্তত আমার মা যেন জীবিত অবস্থায় একবার হলেও তার ছেলেকে মুক্ত অবস্থায় দেখতে পারেন, এইটাই আমাদের শেষ চাওয়া।’ এই বক্তব্য পরিবারের আর্তনাদের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার নির্মম প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।
মানবাধিকার কর্মীর তীব্র প্রতিক্রিয়া
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম এই ঘটনাকে সরাসরি মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তার ভাষায়, বাদল ফরাজির সাথে যা ঘটেছে, তা অমানবিক ও চরমভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন। একজন বাংলাদেশি পর্যটককে শুধুমাত্র নামের অজুহাতে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করে যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয়েছে এবং সাজা শেষ হওয়ার পরও তাকে মুক্তি দেওয়া হয়নি, এটি দুই দেশের যৌথ অবিচার।
তিনি আরও বলেন, ভারতের ক্লিয়ারেন্স ছাড়া মুক্তি দেওয়া যাচ্ছে না- এই যুক্তি অগ্রহণযোগ্য ও সরকারের ব্যর্থতা। মুক্তি দরি হলে তাকে অন্তত জামিন দেওয়া হোক, যেন তিনি তার শয্যাশায়ী মায়ের সঙ্গে শেষবার দেখা করতে পারেন। সরকারের নিজস্ব উদ্যোগে দ্রুত এই মামলার নিষ্পত্তি ও তার মুক্তি নিশ্চিত করতে হবে।
যৌবন কারাগারে শেষ, জীবনের গন্তব্য কোথায়?
একটি নামের ভুল, একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা, আর দুই দেশের আইনি জটিলতা নাকি এসব কেবলই অযুহাত মাত্র? বাদল ফরাজির মুসলমান পরিচয় ও বাংলাদেশি হওয়াই কি কাল হলো! দিলখুশির জন্যই কি এই অমানবিক উদাহরণ তৈরি করল সাম্প্রদায়িকতার চাদরে জড়ানো ভারত? কোন ফাঁদে পড়ে ১৮ বছর ধরে স্বাধীনতা হারিয়েছেন বাদল ফরাজি?
তার পরিবার ও মানবাধিকার কর্মীদের প্রশ্ন- একজন নিরপরাধ মানুষের হারিয়ে যাওয়া জীবনের দায় কে নেবে? শোকাক্রান্ত বাবার মৃত্যুর দায় কে নিবে? যৌবনের প্রারাম্ভে অন্ধকার কারাগারে নিক্ষিপ্ত করায় কে নিবে তার না হওয়া লাল টুকটুকে স্ত্রী ও সন্তানের দায়? কোনো অপরাধ না করেও, অবিচারের রায়ে পূর্ণ সাজার মেয়াদ ভোগ করার পরও কি মুক্তি মিলবে না বাদল ফরাজির?
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!