মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-আমেরিকা-ইসরাইল সংঘাত ঘিরে সৃষ্ট বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব এবার স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে বাংলাদেশেও
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-আমেরিকা-ইসরাইল সংঘাত ঘিরে সৃষ্ট বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব এবার স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে বাংলাদেশেও   ছবি: আরটিএনএন

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-আমেরিকা-ইসরাইল সংঘাত ঘিরে সৃষ্ট বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব এবার স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে বাংলাদেশেও। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনায়। এ পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে একাধিক কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার, যার প্রভাব পড়েছে শপিংমল, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। 


সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, জরুরি সেবা ছাড়া দেশের সব বিপণিবিতান (মার্কেট), অফিস ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বন্ধ করতে হবে। যদিও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা রাত ৮টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার দাবি জানিয়েছেন। তবে সরকার জানিয়েছে—বর্তমান সংকট বিবেচনায় এই সময়সীমা পরিবর্তনের সুযোগ নেই।


এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা ছিল, আপাতত সপ্তাহে ছয় দিন ক্লাস নেওয়া। যার মধ্যে জোড়-বিজোড় মিলিয়ে তিন দিন অনলাইন এবং তিন দিন স্বশরীরে পাঠদানের প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে, অর্থাৎ এক দিন অনলাইনে ক্লাস হলে পরদিন সশরীর ক্লাস নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। অনলাইনে ক্লাস হলেও শিক্ষকেরা সশরীর উপস্থিত থেকে পাঠদান করবেন। ব্যবহারিক ক্লাস হবে স্বশরীরে।  

এসব বিষয়ে রাজধানীর বিভিন্ন শপিংমল ও জনসাধারনের কাছ থেকে পাওয়া যায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া।   
 


রাজধানীর মৌচাক এলাকার ফরচুন শপিংমলের ব্যবসায়ীরা এই সিদ্ধান্তে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। 'জাবির ফাউজান শাড়ি বিতানের' মালিক বলেন,  ঢাকা শহরে এমন অনেক কার্যক্রম রয়েছে যা রাত পর্যন্ত চালু থাকে, কিন্তু শুধুমাত্র শপিংমলগুলোকেই সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। এতে ব্যবসায়ীরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
 তার ভাষায়, সন্ধ্যার পরই মূলত ব্যবসার সময় শুরু হয়। আসরের পর থেকে দুই-তিন ঘণ্টা ক্রেতাদের ভিড় থাকে। কিন্তু সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে দোকান বন্ধ করতে হওয়ায় সেই গুরুত্বপূর্ণ সময় পুরোপুরি নষ্ট হচ্ছে।


তিনি আরও বলেন, সকালে দোকানে ক্রেতা থাকে না বললেই চলে। তাই দুপুরের পর থেকে রাত ৯-১০টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার সুযোগ দিলে ব্যবসার জন্য তা অনেক বেশি কার্যকর হতো।
এছাড়া তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, জাতীয় সংকট হলে তা সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত। শুধু শপিংমল নয়, ব্যাটারিচালিত রিকশা বা অন্যান্য খাতে বিদ্যুৎ অপচয়ও নিয়ন্ত্রণ করা দরকার।


তিনি সরকারের সমালোচনা করে বলেন, 'আমার মনে হয় শিক্ষা নিয়ে বিগত সরকারের আমলে যেমন একটা ষড়যন্ত্র ছিল বর্তমান সরকারের আমলে সেই ভূত এদের ঘারে চাপছে'। 

তিনি একজন স্কুল ছাত্রের উদাহরণ দিয়ে বলেন, 'একজন চতুর্থ শ্রেণীর ছেলের মাথায় যে কথাটা আসছে  সেটা আমদের সরকারের মাথায় আসেনি। ৫০ জন ছেলে যেখানে পড়ালেখা করে সেখানে চারটা ফ্যান চলে ২টা লাইট জ্বলে। আর যদি এখন অনলাইনে  ৫০ জন ছেলে পড়ালেখা করতে যাবে  সেখানে ৫০টা ফ্যান চলবে ৫০টা লাইট জ্বলবে অথবা ২০টা এসি চলবে, ল্যাপটপ চলবে তাহলে সেক্ষেত্রে খরচ কম হবে নাকি বেশি হবে? 

 

একই মার্কেটের আরেক ব্যবসায়ী কামাল হোসেন বলেন, ব্যবসার মূল চালিকাশক্তি হলো ক্রেতা, আর ক্রেতার উপস্থিতির ওপরই নির্ভর করে বেচাকেনা। সাধারণত বিকেল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্তই বাজারে সবচেয়ে বেশি ক্রেতা আসেন। গরমের দিনে দুপুরের তীব্র রোদের কারণে মানুষ ঘরে থাকেন, আর সন্ধ্যার পর তাপমাত্রা কমলে বাজারে ভিড় বাড়তে শুরু করে—এই সময়টাই ব্যবসার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


তিনি বলেন, এমন বাস্তবতায় যদি ঠিক এই গুরুত্বপূর্ণ সময়েই দোকানপাট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে তা ব্যবসায়ী ও সাধারণ ক্রেতা—উভয়ের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

একজন সচেতন নাগরিক জানান, প্রায় ৪ কোটি মানুষের ঢাকা শহরে আনুমানিক দেড় কোটি মোবাইল ফোন ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন ধরনের চার্জারের হিসাবে তিনি ধারণা দেন, প্রতিদিন শুধু চার্জার প্লাগে লাগিয়ে রাখার কারণেই প্রায় ৬০ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে।


তিনি আরও বলেন, শহরে প্রায় পাঁচ লাখ বিদ্যুৎচালিত রিকশা রয়েছে, যেগুলোর চার্জিং ব্যবস্থায় প্রতিদিন অতিরিক্ত প্রায় ১০ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ অপচয় হয়। সব মিলিয়ে শুধু মোবাইল ও রিকশার চার্জার অযথা প্লাগে লাগিয়ে রাখার কারণে প্রতিদিন প্রায় ২৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকার বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে বলে তিনি একটি আনুমানিক হিসাব তুলে ধরেন।
 এছাড়া তিনি উল্লেখ করেন, অনেকেই না জেনে চার্জার, ল্যাপটপ বা কম্পিউটার দীর্ঘ সময় প্লাগে সংযুক্ত রেখে দেন, যা 'স্ট্যান্ডবাই পাওয়ার' হিসেবে বিদ্যুৎ খরচ করে। অফিস ও দোকানেও একই চিত্র দেখা যায়। 

তিনি বলেন, এগুলো কেবল উদাহরণ—বাস্তবে আরও অনেক ক্ষেত্রেই এভাবে অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে। 

একজন সাধারণ নাগরিক বলেন, মানুষ মূলত অভ্যাসের গোলাম—অভ্যাস তৈরি হয়ে গেলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই সবকিছু বন্ধ রাখা সম্ভব। তিনি বলেন, অনেক দোকানে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ৫টি পর্যন্ত লাইট জ্বালানো থাকে শুধু ক্রেতা আকর্ষণের জন্য, যা অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ খরচ বাড়ায়।


তিনি আরও বলেন, ব্যবসা চলবে, তবে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে এ ধরনের অপচয় রোধ করা জরুরি। কয়েক দিনের মধ্যেই মানুষ ৯টা থেকে ৬টার সময়ের মধ্যেই কেনাকাটায় অভ্যস্ত হয়ে যাবে। কিন্তু দোকানপাট রাত ৯টা–১০টা পর্যন্ত খোলা রাখলে দেশে জ্বালানি তেলের ওপর চাপ বাড়বে এবং এতে কয়েকশো কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে আশরাফ উদ্দিন মিন্টু নামের একব্যক্তি বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে রাস্তায় বের হওয়া যানবাহন নিয়ন্ত্রণ বা জব্দ করা গেলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে বড় ধরনের সুফল পাওয়া যাবে।

 

সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব যে বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিক্ষা ও জনজীবনে সরাসরি পড়ে গেছে—তা এখন আর অস্বীকার করার সুযোগ নেই। পরিস্থিতি কতদিন স্থায়ী হবে এবং ভবিষ্যতে আরও কী ধরনের সিদ্ধান্ত আসবে, সেদিকেই এখন সবার নজর।