বিসিবি, আইসিসি, ভারত, পাকিস্তান, পিসিবি
বাংলাদেশকে সমর্থনের অংশ হিসেবে পাকিস্তান বিশ্বকাপে তাদের অংশগ্রহণ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে   ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) কর্তৃক ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশকে বহিষ্কারের ঘটনায় ক্রিকেট বিশ্বে শুরু হয়েছে নজিরবিহীন বিতর্ক। এই ঘটনায় বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে পাকিস্তান, যা টুর্নামেন্টের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার ক্রিকেটীয় ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের জেরে আইসিসির নেওয়া সিদ্ধান্তকে ‘দ্বিমুখী নীতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)।

ঘটনার সূত্রপাত বাংলাদেশের বহিষ্কার :
এই বিতর্কের সূচনা হয় তিন সপ্তাহ আগে, যখন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) তাদের খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে। বিসিবি আইসিসির কাছে আবেদন জানিয়েছিল যেন ভারতে নির্ধারিত তাদের ম্যাচগুলো সহ-আয়োজক শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়া হয়।

  • মুস্তাফিজুর রহমান বিতর্ক: ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) চলাকালীন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) নির্দেশে কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) থেকে বাংলাদেশের পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে হঠাৎ বাদ দেওয়া হয়। বিসিসিআই কারণ হিসেবে ‘পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি’র কথা উল্লেখ করে।
  • নিরাপত্তা শঙ্কা: বিসিবি যুক্তি দেখায়, তাদের একজন খেলোয়াড় যদি ভারতে নিরাপদ না থাকেন, তবে পুরো দলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।
  • আইসিসির কঠোর অবস্থান: আইসিসি দাবি করে, বাংলাদেশ দলের জন্য ভারতে কোনো ‘বিশ্বাসযোগ্য’ হুমকি নেই। বিসিবি তাদের দাবিতে অনড় থাকায়, লজিস্টিক অচলাবস্থার দোহাই দিয়ে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে টুর্নামেন্ট থেকে বাদ দেওয়া হয় এবং তাদের জায়গায় স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া সমর্থনের কারণ :
বাংলাদেশকে বাদ দেওয়ার পর পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায় এবং এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে। পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি আইসিসির বিরুদ্ধে ‘দ্বিমুখী নীতি’ বা বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছেন।

  • দ্বিমুখী নীতির অভিযোগ: ২০২৪ সালের শেষ দিকে আইসিসির মধ্যস্থতায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি তিন বছর মেয়াদী চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতিবেশী দেশে কোনো টুর্নামেন্ট হলে নিরাপত্তা শঙ্কায় তারা নিরপেক্ষ ভেন্যুতে খেলতে পারবে। ভারত পাকিস্তানে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি খেলতে না যাওয়ায় দুবাইতে খেলেছে। পাকিস্তানও ২০২৫ নারী বিশ্বকাপ এবং ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তাদের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় খেলবে। পিসিবি প্রশ্ন তুলেছে, ভারত ও পাকিস্তান যদি এই সুবিধা পায়, তবে আইসিসির পূর্ণ সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ কেন একই সুবিধা পাবে না?
  • রাজনৈতিক মেরুকরণ: ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে ফাটল ধরে, অন্যদিকে পাকিস্তান-বাংলাদেশ সম্পর্ক উন্নত হতে থাকে। পাকিস্তানের ক্রিকেট প্রধান মহসিন নাকভি বলেন, “এক দেশের (ভারত) জন্য এক নিয়ম আর অন্যদের জন্য ভিন্ন নিয়ম হতে পারে না। বাংলাদেশের প্রতি অবিচার করা হয়েছে।”

বিশ্বকাপে পাকিস্তানের অংশগ্রহণে অনিশ্চয়তা :
বাংলাদেশকে সমর্থনের অংশ হিসেবে পাকিস্তান বিশ্বকাপে তাদের অংশগ্রহণ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে।

  • চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঝুলে আছে: পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফের সাথে বৈঠক করলেও বিশ্বকাপে দল পাঠানোর বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কিছু জানাননি। তিনি জানিয়েছেন, আগামী শুক্রবার বা সোমবারের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
  • প্রস্তাব জল্পনা: পাকিস্তানের গণমাধ্যমে গুঞ্জন রয়েছে যে, পিসিবি হয়তো টুর্নামেন্ট বয়কট করতে পারে অথবা প্রতিবাদের অংশ হিসেবে কলম্বোতে ভারতের বিপক্ষে ১৫ ফেব্রুয়ারির ম্যাচটি বর্জন করতে পারে।
  • মুস্তাফিজকে প্রস্তাব: আইপিএল থেকে মুস্তাফিজ বাদ পড়ার পরপরই পিসিবি তাকে পাকিস্তান সুপার লিগে (পিএসএল) খেলার আমন্ত্রণ জানায়।

ক্রিকেট রাজনীতির জটিল সমীকরণ :
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পুরো ঘটনাটি খেলাধুলার মোড়কে একটি গভীর রাজনৈতিক সংকট।

  • ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত এই তিন দেশের সম্পর্ক সবসময়ই জটিল। শেখ হাসিনার পতনের পর ভূ-রাজনীতিতে যে পরিবর্তন এসেছে, তার প্রভাব পড়েছে ক্রিকেটের মাঠেও।
  • বিশেষজ্ঞদের মত: লাহোর ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সেসের অধ্যাপক আলি খান পাকিস্তানের অবস্থানকে ‘নীতিগতভাবে সঠিক’ বলে মন্তব্য করেছেন। তবে তিনি বয়কটের হুমকির চেয়ে কূটনৈতিকভাবে আইসিসির বৈষম্য তুলে ধরার পরামর্শ দিয়েছেন। অন্যদিকে, আইসিসির সাবেক চেয়ারম্যান এহসান মানি পিসিবিকে সতর্ক করে বলেছেন, খেলা থেকে রাজনীতিকে দূরে রাখাই শ্রেয়।

আইসিসির ভূমিকা ভবিষ্যৎ প্রভাব
ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের বিশাল আর্থিক ক্ষমতার কাছে আইসিসি এবং অন্যান্য ক্রিকেট বোর্ডগুলো অসহায় হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন সমালোচকরা।

  • অন্যদের নীরবতা: ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট বোর্ডের নীরবতা নিয়েও সমালোচনা হচ্ছে। সাংবাদিক শারদা উগ্রা বলেন, “মনে হচ্ছে সবাই বিসিসিআই-এর আজ্ঞাবহ হয়ে পড়েছে।”
  • সম্ভাব্য পরিণতি: যদি পাকিস্তান সত্যি সত্যি বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ায়, তবে তা হবে ক্রিকেট বিশ্বের জন্য এক বিশাল ধাক্কা। এটি কেবল টুর্নামেন্টের জৌলুসই কমাবে না, বরং আইসিসির বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

৭ ফেব্রুয়ারি নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে পাকিস্তানের প্রথম ম্যাচ। তার আগে ক্রিকেট বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে ইসলামাবাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে।

সূত্র : আল জাজিরা

আরটিএনএন/এআই