হাদি হত্যা, আন্তর্জাতিক তদন্ত, শরীফ ওসমান হাদি
রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ব্যস্ততার আড়ালে ধামাচাপা পড়ে গেছে হাদি হত্যার বিচার।   ছবি: আরটিএনএন

শহীদ শরীফ ওসমান হাদি হত্যার প্রায় দুই মাস অতিক্রান্ত হলেও তদন্তের গতি, কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্নের অন্ত নেই। হত্যার ৫৬ দিনের বেশি সময় পার হলেও প্রাথমিক হত্যাকারীদের শনাক্ত বা গ্রেপ্তার কার্যক্রমে তেমন অগ্রগতি হয়নি। চারবার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় পরিবর্তন, পুলিশ ও প্রশাসনের গড়িমসি, আর রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ব্যস্ততার আড়ালে এই হত্যা মামলার ন্যায্য বিচার একেবারেই তলিয়ে গেছে। তাই এবার জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি উঠেছে। তাহলেই হয়তো থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছে ওসমান হাদির হাতে গড়া সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চ ও তার পরিবার। 

প্রথমেই বলা যায়, হত্যাকাণ্ডটি রাজনৈতিক ও নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে সংঘটিত হওয়ায় এর তদন্ত স্বাভাবিক গতি হারিয়েছে। হাদিকে হত্যা করা হয় জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে, যেখানে রাজনীতির উত্তাপ এবং নির্বাচনী তফসিলের চাপ গোটা দেশকে আবদ্ধ করেছে। সরকার ও প্রশাসন নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত থাকায় হত্যার তদন্ত পিছিয়ে গেছে, যা ইনকিলাব মঞ্চ ও পরিবারের কাছে ‘অসঙ্গতি’ বা ‘অসহযোগিতা’র প্রতীক হিসেবে দেখা দিয়েছে।

দ্বিতীয়ত, তদন্ত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার অভাবও বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তদন্ত সংক্রান্ত সূত্রের দাবি, মূল আসামিদের অবস্থান, কার্যক্রম ও পরিচয় গোপন রাখার চেষ্টা চলছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের মূল শুটার ও তার সহযোগীরা ভারত ও দেশীয় বিভিন্ন জায়গায় পালিয়ে গেছেন। এই ধরনের জটিল অবস্থায় দ্রুত তদন্ত কার্যকর করা প্রশাসনের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক সংযোগ ও প্রভাবও তদন্তের ধীরগতির একটি বড় কারণ। হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্ট অনেক ব্যক্তি রাজনীতির সঙ্গে সংযুক্ত, ফলে তদন্তে স্বচ্ছতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। সাংবাদিকদের কাছে পুলিশের তথ্য, স্থান ও সময়ের অসঙ্গতি এবং মূল আসামির ঠিকানা নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশ, এই বিষয়টিকে আরও জটিল করেছে।

চতুর্থত, সমাজ ও নাগরিক উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। ৬২ লাখের বেশি মানুষ ফেসবুকে ‘জাস্টিস ফর হাদি’ হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে বিচারের দাবিতে সামাজিক চাপ সৃষ্টি করেছে। ইনকিলাব মঞ্চের অবস্থান কর্মসূচি, পরিবার ও নাগরিকদের অংশগ্রহণ, এবং জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি, এই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক নজর আকর্ষণের চেষ্টা হিসেবে ধরা হচ্ছে।

যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক তদন্তের জন্য জাতিসংঘে প্রস্তাব পাঠানোর ঘোষণা এসেছে। তবে বাস্তবতায় এখনও নির্ধারিত কোনও কার্যক্রম শুরু হয়নি। এর ফলে সাধারণ জনগণ, নিহতের পরিবার এবং রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর মধ্যে হতাশা ক্রমশই বাড়ছে। অবশ্য ইনকিলাব মঞ্চ আশা করছে, আজ অথবা কালকের ভেতর জাতিসংঘে প্রস্তাব পাঠানোর কার্যক্রম সরকারের পক্ষ থেকে অন্তত করা হবে।

৫৬ দিনেও তদন্ত রিপোর্ট জমা না দেওয়ার পেছনে মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—নির্বাচনী ব্যস্ততা, প্রশাসনিক গড়িমসি, আসামিদের সংযোগ ও পালানোর কৌশল এবং তদন্ত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার অভাব। যদি এই সব চ্যালেঞ্জ সমাধান না হয়, তাহলে কেবল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নাগরিক ও আন্তর্জাতিক চাপই বিচার প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে পারবে।

হাদি হত্যার মামলার অবস্থা কেবল একটি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাষ্ট্রীয় দায়, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক সংযোগের পরীক্ষা। বিচার যদি নিরপেক্ষভাবে নিশ্চিত না হয়, তা কেবল হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নয়, বরং দেশের জনগণের রাজনৈতিক ও সামাজিক আস্থাকেও প্রভাবিত করবে। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি অনিশ্চিত করে ফেলবে বাংলাদেশের আগামীর ভবিষ্যতকে।