আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচনে বিএনপির অনিবার্য জয়ই তো এই দেশে স্বাভাবিক। দেখার বিষয় ছিল- ঠিক কতোগুলো আসন তারা পায়। কিন্তু বাংলাদেশ বদলে গেছে। বদলে যাওয়া বাংলাদেশে এমনকি ভোটের আগের দিনও বিএনপির নীতিনির্ধারণী কর্তারা নিশ্চিত হতে পারছেন না- জয় আসবেই! বিএনপির বুদ্ধিজীবিরা যতই ল্যান্ডস্লাইড বিজয়ের বয়ান উৎপাদন করুক; মাঠের বাস্তবতা যে ভিন্ন তা দৃশ্যমান হয় ট্রেনের ছাদে উপচে পড়া মানুষের স্লোগানে, লঞ্চের পাটাতনে ঘরমুখো মানুষের আনন্দ-উচ্ছ্বাসে। সেখানে শোনা গেল “দাঁড়িপাল্লার” স্লোগান!
যে জয় বিএনপির জন্য কেবলই সময়ের অপেক্ষা হওয়ার কথা, সেই জয় আজ কেন ‘যদি’ ‘কিন্তু’র উপর নির্ভরশীল? বিএনপির বুদ্ধিজীবিদের বড় সমস্যা হল- তারা এই পর্যালোচনায় যেতে চায় না। তারা মনে করছে- বিএনপির বিএনপি হওয়াটাই বড় কথা। এটাই তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার নিশ্চয়তা। সময় যে বদলে গেছে, সময়ের হাত ধরে মানুষের হিসেব নিকেষ যে পাল্টে গেছে- সেই পালস বিএনপি ধরতে পারছে না বলেই দৃশ্যমান। সব বাদ দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচনের উদাহরণ টানা যায়। সেখানে বিএনপির এক তরুণ বুদ্ধিজীবি বলেছিলেন- ছাত্রশিবির তৃতীয় বা চতুর্থ হবে। শিবির সেখানে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছে। শুধু শিবিরকর্মীদের ভোটে নয়; সাধারণ শিক্ষার্থীরাও শিবিরের প্যানেলকে ভোট দিয়েছে। জুলাই-উত্তর বাংলাদেশে এই যে তারুণ্যের ভিন্ন দেয়াল লিখন, সেটি পড়ার বা বুঝতে পারার কোনো আগ্রহ কিংবা সামর্থ্য বিএনপির বুদ্ধিজীবিদের আছে বলে মনে হয় না। এরপরের প্রায় সবগুলো ছাত্রসংসদ নির্বাচনেও তাই প্রায় একই রকমের ফলাফল। কোনো বিশ্লেষণ, কোনো আত্মপর্যালোচনা, ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো প্রবণতা চোখে পড়েনি।
বরং উপর্যপুরি অভিযোগে জর্জড়িত হতে হয়েছে বিএনপিকে। দখলদারি, চাঁদাবাজি, মামলা-বাণিজ্য, সন্ত্রাসসহ নানা অপকর্মের শিরোনাম হয়েছে বছরজুরে। নিজেদের মধ্যে খুনোখুনির ঘটনাও ঘটেছে প্রায় একশর মতো। অপেক্ষা ছিল তারেক রহমানের দেশ ফেরার। ২৫ ডিসেম্বর তিনি রাজকীয় সংবর্ধনার মধ্য দিয়ে ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফিরলেন। শুধু দলীয় নেতাকর্মীদের নয়; পুরো বাংলাদেশেরই প্রত্যাশা ছিল- একজন পরিণত ভিন্ন তারেক রহমানের দেখা মিলবে। বহু ঘাত-প্রতিঘাতে পুড়ে তৈরি হওয়া এক দেশনায়কের আবির্ভাব ঘটবে। দেশকে স্থিতিশীলতায় ফিরিয়ে আনার আগে দলের মধ্যে শৃঙ্ক্ষলা ফিরিয়ে আনবেন। তাঁর আগমনী বক্তব্যে ‘আই হ্যাভ অ্যাভ প্ল্যান’ এর কথা শুনে মানুষ আশায় বুক বেঁধেছিল। কিন্তু খুব দ্রূতই তিনি খেই হারিয়ে ফেললেন। তিনি বিএনপির পুরনো বয়ানের বৃত্তেই বন্দী হয়ে রইলেন। ১৭ বছরের পশ্চিমা জীবনযাপন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি তিনি ১৭ ঘণ্টার মধ্যেই বিসর্জন দিলেন। তিনি বাংলাদেশকে নিয়ে যথেষ্ট হোমওয়ার্ক করার আগেই ফিল্ডওয়ার্কে নেমে গেলেন। সারাদেশে ঘুরে বেড়ানো বক্তব্যে তিনি বুঝিয়ে দিলেন- তিনি যথেষ্ট প্রস্তুত নন। দলের মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কোনো উদাহরণ চোখে পড়েনি। কমপক্ষে ৭৯টি আসনে ৮৪ জন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রয়ে গেছেন। তারেক রহমান এক্ষেত্রে কোনো ম্যাজিক দেখাতে পারেননি। প্রতিদ্বন্দ্বী নারীকর্মীদের উপর তাঁর দলের নেতাকর্মীদের অব্যাহত সহিংসতার বিষয়ে তিনি কোনো কথা বলেননি। তফসিল ঘোষণার পরে কমপক্ষে ৩৬টি জায়গায় নারীদের উপর বিএনপির নেতাকর্মীরা আক্রমণ করেছে। সর্বশেষ পটুয়াখালীর বাউফলে এক অন্ত:স্বত্তা নারী ক্যাম্পেইনারকে লাথি দিয়ে আঘাত করা হয়েছে।
বিএনপির সবচেয়ে বড় ভুল- বদলে যাওয়া বাংলাদেশের টোন এবং টিউনিং এর সঙ্গে কণ্ঠ মেলাতে না-পারা। তারা পুরনো কোরাসই গেয়ে চলেছে। যে বিভক্তির বয়ান তুলে জাতিকে বিভ্রান্ত করেছিল পতিত আওয়ামী লীগ, তারা সেই বস্তাপঁচা বন্দোবস্তকেই ইলেকশন ক্যাম্পেইনের ট্রেডমার্ক বানাতে চেয়েছে। চেতনার রাজনীতির চৌহদ্দী থেকে তার বের হতে পারেনি বা বের হতে চায়নি। এখন যে তরুণদের হাতের মুঠোয় বিশ্ব, বৈশ্বিক বিশালতা; সেখানে চেতনার সংকীর্ণ সোপান তরুণদের আকৃষ্ট করবার জন্য কোনো আবেদনময়ী মাইলএজ নয়। তরুণরা বুকের রক্ত ও গায়ের ঘাম দিয়ে যে জুলাই এর জন্ম দিয়েছে, আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণের বয়ানে বিএনপি তার অনুবাদ করতে পারেনি। সংস্কারের প্রশ্নে বিএনপির অস্পষ্ট অবস্থান তারই ইঙ্গিত বহন করে। এমনকি গণভোটেও বিএনপি তার অবস্থান পরিষ্কার করতে পারেনি। দীর্ঘ নিরবতার পরে গত ৩০ জানুয়ারি তারেক রহমান “হ্যাঁ” পক্ষে প্রথমবারের মতো ভোট চাইলেন। যদিও অভিযোগ রয়েছে, মাঠপর্যায়ের বিএনপির নেতাকর্মীরা এখনও “না” এর পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন! আজ, ভোটের আগেরদিনও, বিএনপির তরুণ বুদ্ধিজীবি শাহেদ আলম ফেসবুকে “না” এর পক্ষে ভোট চাইলেন!
অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত-এনসিপি জোট জিরো থেকে শুরু করে একটা ম্যাজিক দেখানোর সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেছে। এনসিপি জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল। তারা তারুণ্যের ভাষা বোঝে। এই নষ্ট পঁচে যাওয়া রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে থেকেও তারা এখন পর্যন্ত যতটুকু কমিটমেন্ট শো করেছে, তা-ই বিরল। যে দেশে বুড়োরা তেমন কোনো অনুসরণীয় আদর্শ স্থাপন করতে পারেননি, সেই দেশে তরুণদেরকে “ফেরেশতা” মনে করবার কারণ নেই। তবুও তারা ভালো করেছে।
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় হাইপটা তুলেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। স্বাধীন বাংলাদেশে যে দলটি সর্বোচ্চ আসন পেয়েছিল ১৮টি, তারা আজ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন প্রাপ্তির স্বপ্নে বিভোর। দলীয় নেতাকর্মীদের একটা বড় অংশ বিশ্বাস করছে- জামায়াতই এবার সরকার গঠন করবে। দ্বিধাহীনভাবেই বলা যায়- মাঠপর্যায়ে জামায়াতের পক্ষে এক ধরনের জোয়ার তৈরী হয়েছে। বিএনপি তিনবার ক্ষমতায় ছিল। স্বাভাবিকভাবেই তাদের জনসমর্থন বেশি। তবুও এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে জামায়াত যে ক্ষমতায় যাওয়ার দৌঁড়ে টিকে আছে, মোটা দাগে তার কারণ দুটি। জামায়াত শুধুমাত্র তার জনশক্তিদের ভোট পাবে না। জামায়াত করে না এমন বহু মানুষ এবার জামায়াতকে ভোট দিবে। এসব ভোটারকে আবার দুই ভাগে ভাগ করা যায়। এক দল এমন যারা বিএনপির ভুল রাজনীতির প্রতি ক্ষুব্ধ। আর এক দলে আছে সিদ্ধান্তহীন ভোটার। বিশেষ করে যারা গত তিনটি নির্বাচনে ভোট দিতে পারেনি, যাদের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ এর মধ্যে। তারা পরিবর্তন চায়। জুলাই-পরবর্তী রাজনীতিতে জামায়াত সেই পরিবর্তনের একটি সুস্পষ্ট আবহ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
দ্বিতীয় কারণটি হল জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমানের ব্যক্তিগত ক্যারিশম্যাটিক ইমেজ ও লিডারশিপ। বহু মানুষ আছে, যারা জামায়াতকে পছন্দ করে না; কিন্তু ডা. শফিকুর রহমানকে পছন্দ করে। নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে এই মানুষটি নিজেকে যেভাবে উপস্থাপন করেছেন, তা জামায়াতের কঠিন কাঠামোর মধ্যে থেকে করে যাওয়াটা ছিল বেশ চ্যালেঞ্জিং। মুক্তিযুদ্ধ, শরিয়াহ আইন, নারী, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের বিষয়ে অবস্থান- এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তিনি বেশ মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। এক পেশাগত সাক্ষাৎকারে তাঁকে প্রশ্ন করেছিলাম- হিন্দু প্রার্থী দিলেন। আপনার দলের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া হবে কিনা। দ্বিধাহীনভাবে বললেন, কে কী মনে করবে এটা বড় কথা নয়। আমরা সবাই মিলেই বাংলাদেশ। হিন্দুদেরও অধিকার রয়েছে ইসলামের সৌন্দর্য কাছ থেকে দেখার। বললাম- এই যে জামায়াতের একটা জাগরণ তৈরি হয়েছে, এটা সম্ভবত আপনার নেতৃত্বের কারণে। সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন- মোটেই না। এটা হয়েছে শহীদদের ত্যাগের কারণে।
ডা: শফিক ছুটে চলেন প্রান্তর থেকে প্রান্তরে। সবার সঙ্গে তিনি মিশে যান। তিনি রিকশায় চড়েন। তিনি হাঁটেন। পথে তাকে জড়িয়ে ধরে শিশু-কিশোরেরা। তিনি বুকে টেনে নেন দিনমজুর, শ্রমিক, রিকশাওয়ালাকে ভাইটিকে। নারীরা তাঁর সঙ্গে সেলফি তোলে। জুলাই-শহীদের মা আবেগে তাঁকে জড়িয়ে ধরে। তিনি কারও নেতা, কারও ভাই, কারও দাদু। তিনি যেন সবার হয়ে ওঠা এক বিরল ব্যক্তিত্ব। তিনি অসুস্থ বেগম জিয়াকে দেখতে লন্ডন চলে যান। তিনি মা-হারা তারেক জিয়াকে শোক জানাতে তাঁর বাসায় ছুটে যান। তিনি বন্যার পানিতে নেমে যান মানুষের পাশে দাঁড়াতে। তিনি সহকর্মীর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে কবরে নেমে যান। আগুনে পুড়ে যাওয়া বস্তিতে তিনি সবার আগে পৌঁছে যান। সত্যিকারের এক মানবিক নেতৃত্বের ব্যতিক্রমী উদাহরণ হয়ে উঠেছেন ডা: শফিকুর রহমান। দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর বিরোধীতা করাই যায়। কিন্তু নির্মোহ বিশ্লেষণে তিনি এই বাংলাদেশে চলমান সময়ের এক অতুলনীয় আইকন।
আমার ধারণা- তিনি দেশের নেতৃত্ব পেলে দেশকে অনেককিছুই দিতে পারবেন। কাজটি কঠিন। কিন্তু তিনি ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছেন- তিনি সক্ষম।
জামায়াত ক্ষমতায় যাবে কিনা সেটা হয়ত আর কয়েকঘণ্টা পরেই জানা যাবে। তবে আজন্ম তীর্যক তীরে বিদ্ধ জামায়াত এই যে গণজোয়ার তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, তার বড় একটা কারণ ডা: শফিক। বাংলাদেশের ইতিহাস এই ব্যক্তিকে মনে রাখবে।
লেখক: হেড, ডিপার্টমেন্ট অব জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!