জ্বালানি
চাহিদা বাড়লেও বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার ভিত্তি এখনো অনেকটাই আমদানি নির্ভর।   ছবি: আরটিএনএন

বাংলাদেশে জ্বালানি নিয়ে আলোচনা সাধারণত তখনই জোরালো হয়, যখন বিদ্যুতের দাম বাড়ে বা লোডশেডিং দেখা দেয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো- আমরা কি সমস্যার সময়ে কথা বলব, নাকি সমাধানের সময় সিদ্ধান্ত নেব? আজ বাংলাদেশ যে জ্বালানি বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেটি নতুন নয়। কিন্তু চাপ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। কারণ আমাদের অর্থনীতি বড় হয়েছে, শিল্প বেড়েছে, মানুষের প্রত্যাশাও বেড়েছে। অথচ জ্বালানি ব্যবস্থার ভিত্তি এখনো অনেকটাই আমদানি নির্ভর।

যে খরচটা আমরা প্রতিদিন দিচ্ছি

প্রতিবছর বাংলাদেশকে তেল, LNG ও কয়লা আমদানির জন্য ১০–১২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হয়। এই অঙ্কটি শুধু পরিসংখ্যান নয়- এটি আমাদের উন্নয়ন বাজেট, কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের সুযোগের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এই অর্থ যদি দেশের ভেতরেই থাকত, তাহলে কত স্কুল, হাসপাতাল, শিল্প বা প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ সম্ভব হতো- এই প্রশ্নটা আমাদের নিজেদেরই করা উচিত।

তাহলে কি আমাদের কোনো বিকল্প নেই?

বিকল্প অবশ্যই আছে। এবং সেটি নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশে সূর্যের আলো প্রতিদিন আসে। শিল্পের ছাদগুলো খালি পড়ে থাকে। গ্রাম থেকে শহর, সবখানেই বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। অর্থাৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানির মৌলিক উপাদানগুলো আমাদের হাতের কাছেই।

সমস্যা প্রযুক্তির নয়। সমস্যা সিদ্ধান্তের। আমরা এখনো নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অনেক সময় “ভবিষ্যতের অপশন” হিসেবে দেখি। কিন্তু বাস্তবে এটি হতে পারে বর্তমান সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একটি কার্যকর পথ।

প্রতিবেশীদের অভিজ্ঞতা আমাদের কী বলে?

ভারত ও পাকিস্তানের দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়- তাদের পথও সহজ ছিল না। ভারত সৌর বিদ্যুৎ নিয়ে শুরুতে ব্যর্থতার মুখ দেখেছে। বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চিত ছিল, প্রকল্প বাস্তবায়নে জটিলতা ছিল। তবুও তারা নীতিতে স্থির থেকেছে। আজ সেই সিদ্ধান্তের সুফল তারা পাচ্ছে।

পাকিস্তান আরও কঠিন সময় পার করেছে। লোডশেডিং সেখানে অর্থনীতির বড় বাঁধা ছিল। অনেক নবায়নযোগ্য উদ্যোগ মাঝপথে থেমে গেছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা নীতিগত সংস্কার করেছে এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ শুরু করেছে। এই অভিজ্ঞতাগুলো দেখায়—ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেয়ে সিদ্ধান্ত না নেওয়াই বেশি ক্ষতিকর।

বাংলাদেশের মূল সমস্যা কোথায়?

আমাদের সমস্যা সম্ভাবনার অভাব নয়। সমস্যা হলো— বড় বিনিয়োগ আনার জন্য প্রকল্পগুলো প্রস্তুত নয়; ঝুঁকি কে নেবে, লাভ কীভাবে ভাগ হবে-এটা স্পষ্ট নয়; এবং নীতিগত বার্তা অনেক সময় পরিবর্তনশীল।  এই অনিশ্চয়তাগুলোই বিনিয়োগকারীদের দূরে রাখে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে অগ্রগতি চাইলে নীতিনির্ধারকদের শুধু পরিকল্পনা ঘোষণায় থেমে থাকলে চলবে না। দরকার— নীতিগত ধারাবাহিকতা; দীর্ঘমেয়াদি স্পষ্টতা; বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থার পরিবেশ। এটি কোনো একক প্রকল্পের প্রশ্ন নয়। এটি দেশের জ্বালানি ভবিষ্যতের প্রশ্ন।

সহযোগিতা মানেই সুযোগ

বাংলাদেশ যদি আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কাঠামোগত অংশীদারদের সঙ্গে পরিকল্পিতভাবে কাজ করতে পারে, তাহলে লাভ শুধু বিদ্যুৎ খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এতে—

বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমবে; শিল্প খাত দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হবে; কর্মসংস্থান বাড়বে; ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পাবে একটি নিরাপদ জ্বালানি ব্যবস্থা।  এটি উন্নয়নের পাশাপাশি একটি দায়িত্বশীল সিদ্ধান্তও।

শেষ কথা

বাংলাদেশ আজ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া পিছিয়ে দিলে তার মূল্য দিতে হবে ভবিষ্যতে। সংকট সামলে চলা সহজ পথ, কিন্তু টেকসই নয়। নবায়নযোগ্য জ্বালানি কোনো আবেগী ধারণা নয়। এটি একটি বাস্তব অর্থনৈতিক সমাধান- যদি আমরা সাহস করে সেটিকে বাস্তবে রূপ দিতে পারি।

আজ আমরা যে সিদ্ধান্ত নেব, সেটাই ঠিক করবে- জ্বালানি সংকট আমাদের পিছু টানবে, নাকি আমরা নিজেরাই আমাদের ভবিষ্যতের আলো জ্বালাব।

 

লেখক :
Head of Business Development & Investor Relations
S.P.O.N.S.O.R. (SCOP)