পৃথিবীর ইতিহাসের শুরু থেকে দেখলে ক্ষমতা ও আধিপত্যের লড়াই দেখা যায়। এলাকা দখল, খাদ্য নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ—এসব কিছুকে ঘিরেই ক্ষমতা ও আধিপত্যের প্রতিযোগিতা চলে এসেছে। তবে বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতির এই লড়াই মূলত জ্বালানি সম্পদ ও অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। এক কথায়, যার হাতে নিয়ন্ত্রণ—সেই মোড়ল।
যার কাছে জ্বালানি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা থাকবে এবং যার অর্থনীতি দৃঢ় হবে, সে-ই বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করবে।
বিশ্বে প্রথম খনিজ জ্বালানি তেল পাওয়া যায় ১৮৪৬ সালে আজারবাইজানে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়ায় ১৮৫৯ সালে তেল আবিষ্কৃত হয় এবং তা বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলন শুরু হয়। এরপর ক্রমান্বয়ে অন্যান্য দেশেও তেলের সন্ধান পাওয়া যায়।
১৮৮৬ সালে তেলচালিত ইঞ্জিন বাজারজাত হয়। অর্থাৎ বাণিজ্যিকভাবে তেল জ্বালানি শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে কলকারখানার আধুনিকায়ন ঘটে এবং তেল অর্থনীতিতে এক নতুন বিপ্লব ঘটায়। এটি অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে, অটোমান সাম্রাজ্য তখনও বিদ্যমান ছিল। তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আফ্রিকার বিশাল অংশ। অর্থাৎ খনিজ তেলসমৃদ্ধ অধিকাংশ অঞ্চলই তাদের অধীনে ছিল। ফলে এক অর্থে তারা বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করত।
এই সময়ে উপনিবেশবাদ ও আধিপত্যের ধরন পরিবর্তিত হয়ে জ্বালানি ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের দিকে মোড় নেয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে তাদের দখলকৃত অঞ্চল ছাড়তে শুরু করে, যদিও এর পেছনে নানা কারণ ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে বিশ্ব রাজনীতির মূল ধারায় উঠে আসে এবং ইউরোপে শিল্প বিপ্লব ঘটে।
অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসে। ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু হয় এবং সুদভিত্তিক অর্থনীতি প্রসার লাভ করে। অন্যদিকে অটোমান সাম্রাজ্যকে দুর্বল করার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে থাকে।
ব্রিটিশরা যখন তাদের সাম্রাজ্য গুটিয়ে নেয়, তখন বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্রোহ সৃষ্টি হয়, যার ফলে অটোমান সাম্রাজ্য খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে দেখা যায়, তেল সম্পদের মালিকানা অন্যের হাতে থাকলেও নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে চলে যায়। প্রেসিডেন্ট নিক্সন ডলারকে তেল বাণিজ্যের প্রধান মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকে আরও শক্তিশালী করে।
তবে এই আধিপত্য হঠাৎ করে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এর আগে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়। নানা কারণ উল্লেখ করা হলেও বিশ্লেষণে দেখা যায়, জ্বালানি ও আধিপত্যের প্রশ্নও এসব যুদ্ধের অন্যতম কারণ ছিল।
পরবর্তীতে সরাসরি দখলদারির বদলে অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক আরোপের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার শুরু হয়। মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশ এই প্রভাব মেনে নেয়নি, সেসব দেশে শাসন পরিবর্তন, গণতন্ত্রের নামে হস্তক্ষেপ এবং জ্বালানি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা দেখা গেছে। এই প্রেক্ষাপটে ইরান দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করেছে, যা বর্তমান সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচিত।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে ইসরায়েলের লক্ষ্য কী—এই প্রশ্নে প্রায়ই ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ ধারণার কথা বলা হয়। এই ধারণা অনুযায়ী, মিশরের নীল নদ থেকে ইরাকের ইউফ্রেটিস নদী পর্যন্ত বিস্তৃত একটি অঞ্চলকে কল্পিত ভূখণ্ড হিসেবে ধরা হয়। এতে ফিলিস্তিন, জর্ডান, লেবানন, সিরিয়া, মিশর, ইরাক ও সৌদি আরবের অংশ অন্তর্ভুক্ত বলে ধারণা করা হয়।
বর্তমান বাস্তবতায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত ও উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন পক্ষের সামরিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করছে।
বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে জ্বালানি, অর্থনীতি ও কৌশলগত প্রভাব বিস্তার—এই তিনটি বিষয় বড় শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার মূল কেন্দ্র। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনাও এর ব্যতিক্রম নয়, যেখানে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!