যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ তৃতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে এবং পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। এখন প্রশ্ন কে জিতবে তা নিয়ে নয়, বরং এই সংঘাত কীভাবে শেষ হতে পারে, তা নিয়ে। প্রতিটি পাল্টা আঘাতের ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যকে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তবে ভয়াবহতম যুদ্ধেরও শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলেই সমাধান হয়। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো সেই মুহূর্তটি অনুধাবন করা, যখন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াটা থামিয়ে দেওয়ার চেয়ে বেশি ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়াবে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে, উপসাগরীয় অঞ্চলের বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার দায় আবারও অস্বীকার করেছে ইরান এবং ঘটনা তদন্তে আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে একটি যৌথ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। তেহরান বলছে, গালফ বা উপসাগরীয় দেশগুলোর অংশগ্রহণে একটি সহযোগিতামূলক প্রক্রিয়া এই ঘটনার সত্যতা ও দায়ভার নির্ধারণ করতে পারে। এই প্রস্তাব আন্তরিক নাকি কেবলই কৌশলগত—তা ভিন্ন বিষয়। ইরান বারবার জোর দিয়ে বলছে, তাদের যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে, উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে নয়। তবে অঞ্চলজুড়ে ক্রমাগত মিসাইল ও ড্রোন হামলা সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ইরানের যেকোনো দাবিই এখন খুব সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা হবে, যদি না সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হয়।
তবুও, উপসাগরীয় দেশগুলো খুব ভালোভাবেই বোঝে যে এই যুদ্ধ তাদের স্বার্থের অনুকূলে নয়। এটি তাদের নির্বাচিত কোনো সংঘাত নয় এবং তারা এতদিন সরাসরি অংশগ্রহণ থেকে নিজেদের বিরত রেখেছে। তাদের প্রতিক্রিয়া মূলত ইরানের ‘সার্বভৌম ভূখণ্ড ও বেসামরিক মানুষের ওপর বেপরোয়া হামলার’ নিন্দা জানানো এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এই সংযম আকস্মিক নয়। গালফ নেতারা জানেন, ৯ কোটিরও বেশি জনসংখ্যা ও উল্লেখযোগ্য সামরিক শক্তির দেশ ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত দ্রুত একটি দীর্ঘ ও ধ্বংসাত্মক আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। আশির দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধের স্মৃতি এখনো এই অঞ্চলে স্পষ্ট, যা মনে করিয়ে দেয় যে এ ধরনের সংঘাত কীভাবে বছরের পর বছর চলতে পারে এবং পুরো অঞ্চলের মানচিত্র বদলে দিতে পারে।
এর পেছনে আরও গভীর উদ্বেগ কাজ করছে। এই যুদ্ধের শেষ পরিণতি কী হবে, তা নিয়ে ওয়াশিংটনের কোনো স্পষ্ট অবস্থান দেখতে পাচ্ছে না উপসাগরীয় রাজধানীগুলো। একই সঙ্গে, তারা সচেতন যে এই সংঘাত বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ইসরায়েলের কৌশলগত অগ্রাধিকারগুলোকেই প্রতিফলিত করছে। অনেক গালফ দেশের আশঙ্কা, যুদ্ধ বিস্তৃত হলে তার বড় দায়ভার হয়তো তাদেরই বহন করতে হবে। তাদের দৃষ্টিতে, সংঘাত বাড়লে অন্যরা সরে যেতে পারে, কিন্তু তারা অরক্ষিত হয়ে পড়বে। প্রকৃতপক্ষে, ইসরায়েল ইতিমধ্যেই লেবাননের দিকে মনোযোগ দিতে শুরু করেছে, যা তাদের দীর্ঘদিনের সামরিক পরিকল্পনার অংশ। হিজবুল্লাহর অমীমাংসিত চ্যালেঞ্জ এবং লিটানি নদীর দক্ষিণের এলাকা দখলের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা ইসরায়েলের কৌশল নির্ধারণে ভূমিকা রাখছে।
এই প্রেক্ষাপটে, যদিও ইরান "যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার কোনো কারণ দেখছে না", তবুও যৌথ তদন্তের প্রস্তাবটি উত্তেজনা কমানোর (de-escalation) একটি সংকীর্ণ কিন্তু অর্থবহ সুযোগ তৈরি করতে পারে। উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো মনে করতে পারে যে, নিদেনপক্ষে কারিগরি পর্যায়ে হলেও তেহরানের সঙ্গে সতর্ক সংলাপ তাদের ঘরের কাছের অস্থিতিশীলতা রোধে সহায়ক হতে পারে। এই ধরনের পদক্ষেপে তাদের আগ্রহের আরেকটি কারণ হলো এই অঞ্চলে গোয়েন্দা তৎপরতার জটিল সমীকরণ। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আন্তঃসীমান্ত সক্ষমতা এবং খোদ ইরানের ভেতরে গিয়ে কাজ করার বিষয়টি সবার নজরে এসেছে। ১৮ মার্চ ইসরায়েল কর্তৃক 'সাউথ পারস' গ্যাসক্ষেত্রে (ইরান ও কাতারের যৌথ মালিকানাধীন বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাস রিজার্ভ) হামলার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, ইসরায়েল এমন পদক্ষেপ নিতেও পিছপা হবে না যা উপসাগরীয় দেশগুলোকে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে হামলার দায় নির্ধারণ করা প্রায়শই কঠিন হয়ে পড়ে। তাই একটি যৌথ বা স্বাধীন তদন্ত উত্তেজনা কমানোর পথে প্রথম ব্যবহারিক পদক্ষেপ হতে পারে।
এই যুদ্ধে কোনো পক্ষেরই চূড়ান্ত সামরিক বিজয় অর্জনের সম্ভাবনা কম। আবার সহসাই কোনো পূর্ণাঙ্গ শান্তি প্রক্রিয়ার দিকে এগোনোর সম্ভাবনাও ক্ষীণ। তাই নিকট ভবিষ্যতে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হলো একটি 'যুদ্ধবিরতি'। ঐতিহাসিকভাবে, যুদ্ধবিরতি তখনই আসে যখন সব পক্ষ একই সিদ্ধান্তে পৌঁছায়: যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে তা শেষ করা বেশি লাভজনক। তবে যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখতে হলে উভয় পক্ষকেই নিজেদের কিছু না কিছু ‘সাফল্য’ দেখানোর সুযোগ দিতে হবে। বাস্তবে এর অর্থ হলো এমন একটি ফলাফল তৈরি করা, যা সব পক্ষকে নিজের দেশের মানুষের সামনে 'মানসম্মান' বজায় রাখার সুযোগ দেবে এবং উত্তেজনা থেকে সরে আসতে সাহায্য করবে।
সামনে এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পথ হলো—হঠাৎ কোনো বড় রাজনৈতিক চুক্তিতে না গিয়ে ধাপে ধাপে উত্তেজনা কমানো। ব্যবহারিক অর্থে, প্রাথমিক ধাপে উপসাগরীয় রাষ্ট্র ও বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা বন্ধের দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি, এই নিশ্চয়তা দিতে হবে যে উপসাগরীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানে কোনো হামলা চালানো হবে না। এই ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে গালফ সরকারকে অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দাবি জানাতে হবে যেন তারা তাদের আঞ্চলিক ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করে ইরানে আর হামলা না চালায়। একই সময়ে, ইরানকেও সমুদ্রপথ ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা বন্ধ করতে হবে। হরমুজ প্রণালী নিরাপদ রাখার বিষয়টি ইউরোপ থেকে এশিয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকে যুদ্ধবিরতির সমর্থনে এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করবে।
দ্বিতীয় ধাপে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি পাল্টাপাল্টি হামলা বন্ধের ওপর জোর দেওয়া যেতে পারে। এই পর্যায়ে সামরিক বাস্তবতার চেয়ে রাজনৈতিক বয়ান বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতারা হয়তো দাবি করবেন যে, তাদের অভিযানে ইরানের পারমাণবিক ও মিসাইল সক্ষমতা দুর্বল হয়ে গেছে এবং তারা কৌশলগত ক্ষতিসাধন করতে সক্ষম হয়েছে। তারা হামলা থামানোর সিদ্ধান্তকে ‘বেসামরিক প্রাণহানি এড়ানোর জন্য নেওয়া সচেতন পদক্ষেপ’ হিসেবেও তুলে ধরতে পারেন। এভাবে উপস্থাপন করা হলে অভিযান বন্ধ করাকে ‘পিছু হটা’ মনে হবে না, বরং সীমিত সামরিক লক্ষ্য অর্জনের সাফল্য হিসেবে দেখা হবে।
অন্যদিকে, ইরান ভিন্নভাবে তাদের বিজয়ের বয়ান সাজাবে। তেহরান তাদের টিকে থাকার সক্ষমতাকে বড় করে দেখাবে। তারা বলবে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র তীব্র সামরিক চাপ সহ্য করে টিকে আছে এবং তাদের শাসন ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ইরানি নেতারা দাবি করতে পারেন যে, তাদের সর্বোচ্চ নেতার হত্যাকাণ্ডের জবাব এবং চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিক্রিয়া শত্রুদের ভবিষ্যৎ সংঘাতের ঝুঁকি সম্পর্কে ভাবতে বাধ্য করেছে এবং তাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা (deterrence) পুনরুদ্ধার করেছে।
এই বয়ানগুলো পরস্পরবিরোধী হতে পারে, কিন্তু যুদ্ধে এমনটা অস্বাভাবিক নয়। অনেক যুদ্ধ ঠিক এভাবেই শেষ হয়: কোনো স্পষ্ট বিজয়ী থাকে না, কিন্তু এমন একটি ব্যবস্থা হয় যেখানে উভয় পক্ষই দাবি করতে পারে যে তারা তাদের মূল লক্ষ্য অর্জন করেছে।
ইরান এবং তার প্রধান প্রতিপক্ষদের মধ্যে সরাসরি আলোচনা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত জটিল এবং টিকিয়ে রাখা কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে এবং অতীতে এই অঞ্চলে আয়োজিত আলোচনার অপব্যবহারের অভিজ্ঞতার আলোকে, অগ্রগতির জন্য এমন কোনো বড় বাইরের শক্তির প্রয়োজন যারা একাধিক পক্ষের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। চীন এই ভূমিকা পালনের জন্য উপযুক্ত অবস্থানে রয়েছে। বেইজিং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে এবং ইরান, উপসাগরীয় দেশসমূহ ও ইসরায়েল—সবার সঙ্গেই তাদের ভালো যোগাযোগ রয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষায় চীনের স্বার্থ এবং তাদের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ওজন উত্তেজনা কমাতে উৎসাহ জোগাতে পারে।
চীন ইতিপূর্বে আঞ্চলিক বিরোধ মেটাতে তাদের সক্ষমতা দেখিয়েছে। ২০২৩ সালের মার্চ মাসে, বেইজিংয়ের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সাত বছরের বিচ্ছিন্ন সম্পর্কের অবসান ঘটে এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আসন্ন চীন সফরের (যা ইরান যুদ্ধের কারণে এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে গেছে) প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের উচ্চ-পর্যায়ের যোগাযোগ বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধ এড়াতে পরাশক্তিগুলোর সমন্বয়ের একটি বিরল সুযোগ তৈরি করতে পারে। কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও, উভয় শক্তিরই এমন সংঘাত এড়ানোর স্বার্থ রয়েছে যা বিশ্ব বাজার অস্থিতিশীল করতে পারে এবং জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত করতে পারে।
আঞ্চলিক শক্তিগুলো, বিশেষ করে সৌদি আরব এবং তুরস্ক, চীনকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ওমান ও কাতারের মতো দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার গোপন মাধ্যম হিসেবে কাজ করে আসছে এবং আনুষ্ঠানিক আলোচনা থমকে গেলে ব্যাক-চ্যানেল যোগাযোগ বজায় রাখতে সক্ষম। ইউরোপীয় সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো একটি বৃহত্তর কূটনৈতিক প্যাকেজের অংশ হিসেবে অর্থনৈতিক প্রণোদনা বা নিষেধাজ্ঞা শিথিলের মাধ্যমে এই প্রচেষ্টায় সহায়তা করতে পারে।
সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ হবে সব পক্ষের নিরাপত্তা উদ্বেগ নিরসন করা। ইরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর হাতেই থাকা উচিত। অন্যদিকে, ইসরায়েল ও তার মিত্ররা বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা চায় যে ইরানের সামরিক সক্ষমতা তাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হবে না। এই ব্যবধান ঘোচাতে দীর্ঘমেয়াদী ও ধৈর্যশীল কূটনীতির প্রয়োজন হবে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত: এই যুদ্ধ কোনো সর্বোচ্চ দাবি বা যুদ্ধক্ষেত্রের চূড়ান্ত বিজয়ের মাধ্যমে শেষ হবে না। এর সমাপ্তি তখনই ঘটবে যখন নেতারা উপলব্ধি করবেন যে সংঘাত দীর্ঘায়িত করা কারও দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থরক্ষা করবে না।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!