ইরান, ট্রাম্প, খামেনি, ইসরায়েল, আরব
কাতারের তেল শোধনাগার   ছবি: সংগৃহীত

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পরপরই খবর আসে যে, জর্ডান এবং মিশর সিরিয়ায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের সর্বশেষ এই ধাক্কার মাঝে এই খবরটি হয়তো সামান্য মনে হতে পারে—কিন্তু এটি এই অঞ্চলকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর চলমান প্রচেষ্টারই একটি অংশ।

আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ মনে হলেও, এই খবরটি দীর্ঘমেয়াদী ও অ-সামরিক সেই প্রক্রিয়াকে আড়াল করে রাখে, যার মাধ্যমে এই পুনর্বিন্যাস বাস্তবে রূপ পাচ্ছে। এই ঘটনা থেকে যা স্পষ্ট হয়েছে তা হলো, এই অঞ্চলের ওপর ইসরায়েলের জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ বাড়ছে—যা তাদের ঔপনিবেশিক এজেন্ডাকে আরও এগিয়ে নিতে সহায়তা করতে পারে।

গ্যাস কোথা থেকে আসে?

জানুয়ারিতে মিশর 'আরব গ্যাস পাইপলাইন'-এর মাধ্যমে সিরিয়ায় দৈনিক ২.৮ মিলিয়ন ঘনমিটার (৯.৮৯ কোটি ঘনফুট) গ্যাস সরবরাহ শুরু করে। এই পাইপলাইনটি মিশরের আল-আরিশ থেকে তাবা হয়ে জর্ডানের আকাবায় এবং সেখান থেকে উত্তরে আম্মান, এরপর সিরিয়ার দামেস্ক ও হোমস হয়ে লেবাননের ত্রিপোলি পর্যন্ত বিস্তৃত। লেবাননের সাথেও মিশর থেকে গ্যাস আমদানির জন্য একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, তবে খবর অনুযায়ী, প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জের কারণে এখনো গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়নি।

একইভাবে জানুয়ারিতে জর্ডানের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন 'ন্যাশনাল ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি' সিরিয়ার পেট্রোলিয়াম কোম্পানির সঙ্গে দৈনিক ৪ মিলিয়ন ঘনমিটার (১৪.১২ কোটি ঘনফুট) গ্যাস সরবরাহের চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির খবর প্রকাশিত হওয়ার মুহূর্ত থেকেই একটি মূল প্রশ্ন সামনে আসে: রপ্তানির জন্য মিশর ও জর্ডান এই গ্যাস কোথা থেকে পাবে?

মিশর গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ হলেও গত কয়েক বছরে তাদের স্থানীয় উৎপাদন কমে ২০২৪ সালে ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ৪৯.৩ বিলিয়ন ঘনমিটারে (১.৭ ট্রিলিয়ন ঘনফুট) নেমে এসেছে। একই বছর তাদের আমদানি রেকর্ড ১৪.৬ বিসিএম-এ (৫১৫.৬ বিলিয়ন ঘনফুট) পৌঁছেছে, যার মধ্যে প্রায় ১০ বিসিএম (৩৫৩ বিলিয়ন ঘনফুট) এসেছে ইসরায়েল থেকে। গত বছর কায়রো ২০৪০ সাল পর্যন্ত ইসরায়েল থেকে গ্যাস আমদানির জন্য ৩৫ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে, যা তাদের আগের সরবরাহের সাথে বছরে আরও ২ বিসিএম (৭০.৬ বিলিয়ন ঘনফুট) গ্যাস যুক্ত করেছে।

যদিও মিশর গ্যাস আমদানি করে, তবুও তারা গ্যাস রপ্তানিও করে। তবে সিরিয়ায় তারা ঠিক কোন গ্যাস বিক্রি করছে, তা নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য রয়েছে। কেউ কেউ বলছেন এটি ইসরায়েলি গ্যাস, আবার অন্যদের দাবি—এটি মূলত মিশরের জন্য আনা তরলীকৃত গ্যাস (এলএনজি), যা জর্ডানের আকাবা বন্দরে খালাস করে পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করা হয় এবং আরব গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে উত্তরে পাঠানো হয়।

মিশরের মতো জর্ডান কিন্তু প্রধান গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ নয়। তাদের স্থানীয় উৎপাদন চাহিদাও ৫ শতাংশের কম। বাকি গ্যাস, অর্থাৎ বছরে প্রায় ৩.৬ বিসিএম (১২৭ বিলিয়ন ঘনফুট), তারা আমদানি করে—যার অধিকাংশই আসে ইসরায়েল থেকে, কিছু অংশ মিশর এবং এলএনজি উৎস থেকে।

সিরিয়ায় জর্ডানের গ্যাস বিক্রির উৎস নিয়ে যখন প্রশ্ন ওঠে, তখন এক সিরিয়ান কর্মকর্তা দাবি করেন যে আমদানিকৃত গ্যাস "জর্ডানের নিজস্ব বা ইসরায়েলি নয়", বরং এটি বিশ্ববাজার থেকে কেনা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, যা আকাবায় গ্যাসে রূপান্তর করা হয়েছে।

ইসরায়েল-কেন্দ্রিক আঞ্চলিক জ্বালানি ব্যবস্থা

আরব গ্যাস পাইপলাইন—যা একসময় যৌথ আরব উন্নয়ন প্রকল্পের প্রতীক ছিল—এখন জর্ডান ও মিশরে ইসরায়েলি গ্যাস রপ্তানির প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। হাইফা উপকূলের 'লেভিয়াথান' ক্ষেত্র থেকে গ্যাস বহনকারী পাইপলাইনগুলো উত্তর জর্ডানের মাফরাক গভর্নরেটে পাইপলাইন নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত হয়, যেখান থেকে গ্যাস দক্ষিণে মিশরীয় সীমান্তের দিকে প্রবাহিত হয়।

আকাবা টার্মিনালে ট্যাংকারে করে আসা যেকোনো স্বাধীন এলএনজি চালানকে অবশ্যই আরব গ্যাস পাইপলাইন সিস্টেমে প্রবেশ করতে হয়, যেখানে এটি অনিবার্যভাবে নেটওয়ার্কের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ইসরায়েলি গ্যাসের সাথে মিশে যায়। একবার সিস্টেমে প্রবেশ করলেই এটি আন্তঃসংযুক্ত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিতরণ করা একটি মিশ্র বা "গ্যাস ব্লেন্ড"-এর অংশ হয়ে যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পাইপলাইনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী সরবরাহের মেরুদণ্ডই হলো ইসরায়েলি গ্যাস।

ফলে, এলএনজি চালানগুলো সম্ভবত একটি আঞ্চলিক বিনিময় বা 'ক্লিয়ারিং মেকানিজম'-এর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, আকাবা দিয়ে এলএনজি হিসেবে আমদানিকৃত গ্যাস হয়তো নেটওয়ার্কের নিকটতম পয়েন্ট মিশরে পাঠানো হয়, আর উত্তর জর্ডানে সিস্টেমে প্রবেশ করা সমপরিমাণ ইসরায়েলি গ্যাস সিরিয়ার দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। এই ব্যবস্থাটি পাইপলাইন প্রবাহ উল্টানো বা দীর্ঘ দূরত্বে গ্যাস পরিবহনের লজিস্টিক ও আর্থিক খরচ এড়াতে সাহায্য করে।

ইসরায়েলি গ্যাস বন্ধ হলে পুরো নেটওয়ার্ক থমকে যায়

যখন ইসরায়েল লেভিয়াথান ক্ষেত্রে গ্যাস উৎপাদন বন্ধ করে দেয়, তখন জর্ডান ও মিশরে গ্যাস প্রবাহ তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এতে উভয় দেশ সংকটে পড়ে এবং আকস্মিক ঘাটতি মোকাবিলায় জরুরি পরিকল্পনা সক্রিয় করতে বাধ্য হয়। এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে এটি ছিল দ্বিতীয় বড় ধরনের বিঘ্ন। এর আগের জুনে ইরানে ইসরায়েলের ১২ দিনের হামলার সময় একই গ্যাসক্ষেত্রটি ১৩ দিনের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছিল, যার ফলে জর্ডান ও মিশরে সরবরাহ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

এবার যখন এমনটি ঘটল, আম্মান ঘোষণা করে যে তারা সিরিয়ায় গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দিচ্ছে বা আংশিক স্থগিত করছে। কায়রোও সিরিয়ায় রপ্তানি স্থগিত করতে বাধ্য হয়। তাই বাস্তবিক পরিস্থিতি সরকারি ভাষ্যকে ভুল প্রমাণ করে: কার্যত সিরিয়ায় এবং ভবিষ্যতে লেবাননে যে গ্যাস পৌঁছাবে, তা মূলত ইসরায়েলি গ্যাস।

এমনকি কোনো নির্দিষ্ট লেনদেনে ইসরায়েল যদি প্রত্যক্ষ সরবরাহকারী নাও হয়, তবুও পুরো ব্যবস্থাটি কাঠামোগতভাবে ইসরায়েলি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। ইসরায়েলি রপ্তানি একবার বন্ধ হলে পুরো নেটওয়ার্ক ধসে পড়ে। ইসরায়েলি গ্যাস বন্ধের পর জর্ডানের নিজস্ব জরুরি পরিকল্পনায় আকাবা দিয়ে বিশ্ববাজার থেকে এলএনজি আমদানির কথা বলা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও এই বিকল্পটি স্পষ্টভাবে বিদ্যমান। যদি সেই পথ খোলাই থাকে, তবে সিরিয়ায় সরবরাহ কেন কমানো বা বন্ধ করা হলো?

ব্যাখ্যা যাই হোক না কেন, বাস্তব সত্য হলো—ইসরায়েল উদীয়মান আঞ্চলিক গ্যাস ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে বসে আছে। এই কেন্দ্রিকতা তাদের ব্যাপক রাজনৈতিক সুবিধা বা 'লিভারেজ' প্রদান করে। জ্বালানি সরবরাহকে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে—উদাহরণস্বরূপ, শান্তি চুক্তি লঙ্ঘনের অজুহাতে মিশরের সাথে গ্যাস চুক্তি পুনর্বিবেচনার হুমকি দিয়ে।

আরও স্পষ্টভাবে, ইসরায়েল দেখিয়ে দিয়েছে যে তারা প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও পরিষেবাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে কতটা প্রস্তুত। গাজায় গণহত্যার সময় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পানি—এবং এগুলো সচল রাখা অবকাঠামোকে—পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে এবং সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে, যা ছিল সামষ্টিক শাস্তি ও ধ্বংসযজ্ঞের হাতিয়ার।

পরনির্ভরতার খাঁচা

লেবানন ও সিরিয়ার বিদ্যুতের ভীষণ প্রয়োজন। এই জরুরি প্রয়োজনকে ইসরায়েল-কেন্দ্রিক আঞ্চলিক জ্বালানি নেটওয়ার্কে তাদের অন্তর্ভুক্ত করার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এমতাবস্থায়, গ্যাসের উৎস নিয়ে প্রশ্নগুলো সম্ভবত একপাশে সরিয়ে রাখা হবে এবং আঞ্চলিক জ্বালানি ব্যবস্থায় ইসরায়েলের কাঠামোগত আধিপত্যকে নীরবে উপেক্ষা করা হবে।

এর ফলে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি হবে যা এই দুটি দেশকে—মিশর ও জর্ডানের মতোই—এমন এক অবকাঠামোর মধ্যে বন্দি করবে যেখানে যেকোনো মুহূর্তে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে এবং যার চাবিকাঠি শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের হাতেই থাকবে। এটি একটি স্পষ্ট উদাহরণ যে কীভাবে জায়নবাদী সেটেলার-ঔপনিবেশিক প্রকল্প কেবল সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমেই নয়, বরং অর্থনৈতিক শক্তি ও জ্বালানি নেটওয়ার্কের মাধ্যমেও প্রসারিত হচ্ছে।

এটি এমন এক অবকাঠামোর মাধ্যমে অগ্রসর হয় যা দেখতে সাধারণ ও প্রযুক্তিগত মনে হলেও শেষ পর্যন্ত সমাজকে টুঁটি চেপে ধরে। একবার এর ভেতরে ঢুকে গেলে, এমন ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে আসা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ এগুলো দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য উপাদান—বিদ্যুৎ, পানি ও জ্বালানি—নিয়ন্ত্রণ করে।

সিরিয়া ও লেবাননের সামনে বিকল্প আছে—তাদের নিজস্ব জ্বালানি রিজার্ভ বা মজুদ গড়ে তোলা। সিরিয়ার স্থলভাগে ২৮০ বিসিএম (৯,৮৮৮ ট্রিলিয়ন ঘনফুট) এবং সমুদ্রে সম্ভাব্য ২৫০ বিসিএম (৮,৮২৯ ট্রিলিয়ন ঘনফুট) গ্যাস মজুদ রয়েছে; লেবাননের সমুদ্রসীমায় প্রায় ৭০০ বিসিএম (২৪,৭২০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট) রিজার্ভ থাকতে পারে। এই জ্বালানি সম্পদ উন্নয়নে কেবল সময় ও বিশাল অর্থায়নই নয়, বরং ইসরায়েলি গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বেছে নেওয়ার জন্য ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলায় প্রবল রাজনৈতিক সদিচ্ছারও প্রয়োজন।

আজ সিরিয়া ও লেবাননের রাজনৈতিক নেতারা হয়তো দ্রুত ও সহজ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং নিশ্চিত জীবনযাত্রার প্রতিশ্রুতিতে প্রলুব্ধ হতে পারেন। কিন্তু এই নিরাপত্তা হবে মরীচিকা মাত্র। চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ থাকবে এমন একটি রাষ্ট্রের হাতে, যাদের সরবরাহ বন্ধ করার ক্ষমতা—এবং সেই বিঘ্নকে ধ্বংস, রাজনৈতিক জবরদস্তি ও ঔপনিবেশিক বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার মানসিকতা—ইতিমধ্যেই সবার চোখের সামনে স্পষ্ট।